চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পরকীয়ার বৈধতা!

পরকীয়া। বাঙালি মানসে এক আশ্চর্য অনুভূতি জাগানো সম্পর্কের নাম। পরকীয়া শব্দটি শুনলেই মনটা এক ভিন্ন অনুভূতিতে জেগে ওঠে। সবাই কান খাড়া করে, কার সঙ্গে কার? মনে মনে হয়তো ভাবে, ইস্, আমার যদি হতো! বাঙালি পুরুষরা অনেকেই ‘পরস্ত্রী কাতর’। পরকীয়ার গোপন বাসনা হৃদয়ে পোষণ করে না, এমন মানুষ হয়তো বিরল। কিন্তু মুখে পরকীয়া কথাটি শুনলেই আমরা দপ করে উঠি। সনাতন মূল্যবোধের সলতেটাকে মশালের মত তুলে ধরে বলি: ছিঃ ছিঃ, সমাজটা রসাতলে গেল! হ্যাঁ, পরকীয়া সংক্রান্ত আলোচনাটি আবারও উস্কে দিয়েছে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারকের একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করেছে পরকীয়া কোনো অপরাধ নয়। পরকীয়া বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হতে পারে, কিন্তু অপরাধ হতে পারে না কখনোই। অথচ ভারতবর্ষের সংবিধানের ৪৯৭ নং ধারায় ১৫৮ বছর ধরে পরকীয়া একটি অপরাধ ছিল। এই ধারা অনুযায়ী যদি কোনও পুরুষ অন্য কোনও পুরুষের স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হন তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া তাহলে এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এবং এই অপরাধে কেবলমাত্র এই বিবাহবহির্ভূত পুরুষটির শাস্তি হবে। সেই নারীর নয়। এই আইনে বলা হয়, “…a man who has consensual sexual intercourse with the wife of another man without his consent can be punished under this offense in India.” অর্থাৎ পরকীয়ার সংজ্ঞা সর্বভাবে নির্ধারিত হচ্ছে যৌনতা দিয়ে। যতক্ষণ না দুটি মানুষ বিবাহবহির্ভূত কোনও সম্পর্কে যৌনভাবে লিপ্ত হচ্ছেন ততক্ষণ তা পরকীয়া নয়, ব্যাভিচার তো নয়ই। ফলে এখানে মনের কোনও প্রশ্নই নেই। হরমোনেরও না। প্রশ্ন কেবল শরীরের। শরীরের প্রজনন অঙ্গের।

বিজ্ঞাপন

এরপরের গুরুত্বপূর্ণ দিক হল “consensual sex”। অর্থাৎ এই যৌন মিলন কিন্তু ধর্ষণ নয়, কারণ এখানে সেই নারীর কন্সেন্ট বা সম্মতি আছে, দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের সম্মতিতে এই যৌন মিলন। কিন্তু তাও যথেষ্ট হচ্ছে না সেই সম্মতি, কেন? কারণ সম্মতি মেলেনি সেই নারীর স্বামীর কাছ থেকে। অর্থাৎ কিনা একটি মেয়ের তার নিজের শরীরের প্রতি কোনো অধিকার নেই। বরং তার শরীরের প্রতি অধিকার আছে তার স্বামীর। এই ধারাটিই ভারতে ১৫৮ বছর ধরে বহাল ছিল। বাংলাদেশে তা এখনও টিকে আছে।

আইন আসলে এতদিন ধরে পরকীয়াকে ‘পুরুষের সঙ্গে পুরুষের যুদ্ধ’ বলে ভেবেছে। যেখানে একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষের সম্পত্তিকে ছিনিয়ে নিচ্ছে। আর সেই সম্পত্তি কে? তার স্ত্রী, একজন নারী। যেন তার কোনও ইচ্ছে নেই, যেন তার কোনো মত নেই, যেন তার কোনও সম্মতি নেই। অথচ আইনের ভাষা বলছে “consensual sex”. অর্থাৎ সেখানে কেবল পুরুষটির নয়, নারীটিরও মন এবং হরমোন দুইই সাড়া দিয়েছে, কিন্তু তাও তাকে ভাবা হবে নিষ্ক্রিয়।

তবে পরকীয়া বৈধতা পাওয়ায় যারা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন তারা মূলত চিন্তিত হয়ে পড়েছেন ‘বিবাহ’ নামক এক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে। যে প্রতিষ্ঠান অনেকখানি দাঁড়িয়ে আছে একজন নারীর ‘চরিত্রের’ ওপর। তার শরীরের উপর তার স্বামীর অধিকারের ভিত্তিতে, যে প্রতিষ্ঠান আসলে এক চুক্তি, যে চুক্তির প্রয়োজন পড়ে আক্ষরিক অর্থে সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারায়, যে চুক্তির প্রয়োজন পড়ে সন্তানের পিতৃ ও মাতৃপরিচয়ের কারণে, এবং যে চুক্তিতে আমরা পাকাপাকিভাবে এক পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোয় লিখিতভাবে প্রবেশ করি। তাহলে কি প্রয়োজন নেই বিবাহের?

সে কথা এই মুহূর্তে অপ্রাসঙ্গিক। তবু মানুষ আজও সেই চুক্তি পেরিয়ে কেবল ভালোবাসার কারণেও বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানে আবদ্ধ হন, সেক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব চুক্তির নিরিখে হয়ত পরকীয়া সেই ভালোবাসার অমর্যাদা করতে পারে, প্রশ্ন উঠতে পারে দায়িত্বের। আর সেক্ষেত্রে দাবিও করা যেতে পারে বিবাহ বিচ্ছেদের।

পরকীয়াকে যদি আমরা কেবলমাত্র বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে ‘যৌনভাবে’ লিপ্ত হওয়াকে বুঝি তাহলে আসলে ফাঁক রয়ে যাবে বড় এক জায়গায়। বাদ পড়ে যাবে ‘মন’, জিতে যাবে পিতৃতন্ত্র। কারণ পিতৃতন্ত্র কেবল মেয়েদেরই নয়, ছেলেদের মন নিয়েও কথা বলে না কক্ষণও। কিন্তু মনকে বিচ্ছিন্ন করে মানুষ নয়। আর মানুষের মন থাকলে সে ভালোবাসবেই। ভালোবাসার বয়স হয় না। সম্পর্ক মানে না কোনও পিছুটান। তাই তো স্বামী বা স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও আরও একবার মানুষ প্রেমে পড়ে। ভালোবাসে অন্য কাউকে। ভালোবাসার রথ ফের ধ্বজা উঁচিয়ে যাত্রা শুরু করে। একসময় যাকে সাত পাকে বেঁধেছিল, তাকেই দ্বিতীয় ভালোবাসার টানে ভুলতে বসে মানুষ। এটা কি অপরাধ?

বিজ্ঞাপন

সমাজ বলবে, অবশ্যই। বাড়িতে স্বামী বা স্ত্রী থাকলে অন্য কারওর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর মানে কী? একজন বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কি এসব সাজে? কিন্তু যারা এই পথের পথিক, তারাই জানে কী এর মাহাত্ম্য! কীসের টানে পরকীয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয় তারা। সংসারে নিত্য অশান্তি, ছেলেমেয়ের ঘ্যানঘ্যানে আবদার, চাকরিক্ষেত্রে রাজনীতি… সব নিয়ে ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক ত্যাক্তবিরক্ত হয়ে ওঠে। সে খোঁজে একটু শান্তি। সেখান থেকেই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া, তারপর বন্ধুত্ব, ধীরে ধীরে কখন যে ভালো লেগে যায়, মানুষ জানতেও পারে না। নিজের অজান্তেই সম্পর্কের সুতো তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। এই সম্পর্ক এতটাই একাত্ম যে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে মন চায় না। সমাজ এর একটা পোশাকি নাম দিয়েছে ‘পরকীয়া’।

আর এখানেই ঘটে গণ্ডগোল। পোশাকি নামের আড়ালে ঢেকে যায় ভালোলাগার মুহূর্তরা। কয়েকঘণ্টা শান্তিতে কাটানোর বদলে তিক্ততায় ভরে যায় দিনের বাকি ঘণ্টাগুলি। তার মধ্যে আবার রয়েছে আইনের চোখ রাঙানির ভয়। কিন্তু পরকীয়া কি অপরাধ হতে পারে? এর পক্ষে বিপক্ষে উভয় মতই রয়েছে। তবে স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। ভালোবাসাও তাই। মানুষ কাকে ভালোবাসবে, না বাসবে, সেটা তো সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সমাজ এখন অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। গোঁড়ামি ছাড়িয়ে মানুষ এখন আরও বেশি আধুনিক। এখনও যদি পরকীয়াকে মানুষের স্বাধীনতার খাতায় না ফেলা যায়, তাহলে তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
কিন্তু সমাজ? নীতি, আইন? তারা কি এসব মেনে নেবে? হয়তো নেবে না। কিন্তু এক সময় হয়তো আমাদের সমাজও এসব মেনে নেবে। কেননা সমাজ ক্রমাগত পরিবর্তনশীল। শিক্ষা এখন শুধু আর পুঁথিগত বিদ্যা নয়। মানুষের মজ্জায় ঢুকতে শুরু করেছে শিক্ষা। তার প্রভাব পড়ছে মানসিকতাতেও।

উল্লেখ্য, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ভারতীয় সংস্কৃতিতে কিন্তু বহুদিন ধরেই চলে আসছে। বিভিন্ন শাস্ত্র ও বইয়েও তার প্রমাণ রয়েছে। শাস্ত্রমতে, পরকীয়া (অ্যাডালটরি) হল ‘স্ত্রীসংগ্রহণ’। বিবাহিত স্ত্রী অন্য পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে আবদ্ধ হলে তা স্ত্রীসংগ্রহণ নামে বিবেচিত হয়। পরকীয়াকে কোথাও জঘন্য অপরাধ বলা হয়েছে, অন্য দিকে আবার স্ত্রীসংগ্রহণ বিষয়ে নমনীয়তার উদাহরণও আছে অনেক।

মনুসংহিতার একাদশ অধ্যায়ে পরকীয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ না বলে প্রায়শ্চিত্তযোগ্য পাপ বলা হচ্ছে। তবে মহাভারতে পরকীয়া অনিন্দিত নয়। কিন্তু সেখানেই আবার পরদারগমনের বহু নিদর্শন আছে। নররূপী ঋষি অর্জুন যখন ব্রহ্মচর্য ও বনবাসের শাস্তি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন, তখন তিনি পরস্ত্রী ঊলূপীর সঙ্গে অনেক দিন বসবাস করেন এবং তার গর্ভ থেকেই ‘ইরাবান’ নামক পুত্রের জন্ম। নাগকন্যা ঊলূপীর স্বামী তখন সূপর্ণ নামক নাগের কাছে বন্দী ছিলেন। ইন্দ্র ও অহল্যার কথা সর্বজনবিদিত।

সংস্কৃত সাহিত্যের প্রাচীন গ্রন্থ ‘কামসূত্র’তেও পরকীয়াকে অপরাধ বলা হয়নি। তবে সেই সব পুরুষের নিন্দা করা হয়েছে যারা প্রেমহীন পরকীয়াতে মত্ত হয়ে ওঠেন। কামসূত্রের রচয়িতা বাৎস্যায়ন বলছেন, যৌনতার একটি উদ্দেশ্য কখনও-সখনও সন্তান-উৎপাদন হতে পারে, কিন্তু সেটাই একমাত্র লক্ষ্য নয়। স্ত্রীলোক পশুদের থেকে আলাদা, কারণ সে সন্তানধারণের উপযুক্ত সময় ছাড়াও রমণে প্রবৃত্ত হয়। পুরুষের মতো নারীও আনন্দের জন্যই যৌনতা চায়। এমনকি, যদি কোনও স্ত্রীলোক বোঝেন যে তার স্বামী সন্তোষজনক যৌনসঙ্গী নন, তা হলে তিনি সেই যৌনসঙ্গীকে ত্যাগ করতে পারেন। বিধবারাও যৌনতৃপ্তির জন্য সঙ্গী খুঁজতে পারেন। প্রাচীন এই গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে বৈপ্লবিক!

নৈতিক পাপ ও ফৌজদারি অপরাধ এক নয়। সম্পর্কের বৃত্ত কোনো নিয়ম, ধর্মীয় বিধান কিংবা আদালতের রায় দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে না। আর প্রতারণা বা বিশ্বাসঘাতকতা নারী বা পুরুষ কারোর ক্ষেত্রেই কাম্য নয়। একজন স্বামী যেমন স্ত্রীর কাছে সততা দাবি করতে পারেন, স্ত্রীর ক্ষেত্রেও সেটাই প্রযোজ্য। নিজের অস্তিত্বের মর্যাদা কীভাবে রক্ষা করবেন সেটা স্বামী–স্ত্রী উভয়কেই ঠিক করে নিতে। কারণ এই একটি সম্পর্কের উপর ভিত্তি করেই দুনিয়া বেঁচে রয়েছে। কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ সেটা বেছে নেওয়ার দায়িত্ব উভয়েরই। আর এটাও মনে রাখা দরকার যে নাগরিকের শরীরের উপর অর্থাৎ নিজের নিভৃততম ক্ষেত্রটির উপর নিজের অধিকারকে কোনও মতেই খাটো করা চলবে না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Bellow Post-Green View