চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নেতাদের ধান কাটা নাকি ফটোসেশন

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ছাত্রলীগ কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছে। কৃষকের ধান কেটে ঘরে তুলে দেওয়ার জন্য অনেকেরই বাহবা পেয়েছে ছাত্রলীগ। হঠাৎ করে ছাত্রলীগ ছাড়াও কৃষকলীগ, শ্রমিকলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধান কাটার হিড়িক লেগে গেছে। পাশাপশি কয়েকজন মন্ত্রী-এমপিকেও দেখা গেছে ধান কাটতে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে সারাদেশে যখন শ্রমিক সংকট তখন আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারাকর্মীরা কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিষয়টি অনেক সুখকর। কিন্তু তারা কি আসলেই ধান কাটারা জন্য মাঠে নেমেছে না ফটোসেশনের জন্য তা নিয়ে সারাদেশে সমালোচনা শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কৃষি নির্ভর আমাদের এই দেশ। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বারবার কৃষির উন্নয়নে নানা নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যাভাবের মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে, এমন সতর্কতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো জমি অনাবাদি না রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিদের জন্য ৫ শতাংশ সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশে ব্যাংক থেকে কৃষকদের ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী যখন নানাভাবে কৃষকদের উন্নয়নে কাজ করছেন ঠিক তখনি কিছু নেতাকর্মী কৃষকের পাশে থাকার নামে ফটোশেসন করে আওয়ামী লীগের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। আমি নিজেও একজন কৃষকের সন্তান। ছোটবেলা থেকে দেখেছি কীভাবে ধান কাটতে হয়। আমি নিজেও অনেকবার ধান কেটেছি। এখনও গ্রামে গেলে বাবাকে ধান কাটতে সহায়তা করি।

বর্তমান নেতারা ধান কাটছেন পাঞ্জাবি, স্যুট, টাই, নতুন শার্ট, প্যান্ট, বেল্ট পরে। অফিসের পোশোকেও অনেকে ধান কেটে বা ২-১ আটি ধান মাথায় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছবি প্রকাশ করছে। পুরষের পাশাপাশি কিছু নারী নেত্রীও ধান কাটতে মাঠে নেমেছেন। আমাদের গ্রামাঞ্চলে পুরুষের পাশাপশি নারীরাও কৃষি কাজে সহায়তা করে। ধানের বীজ বপন থেকে শুরু করে ধান কাটা সব কাজেই নারীরা করে থাকেন। বর্তমানে যেসব নেতা ও নেত্রী ধান কেটে সারাদেশে জনপ্রিয়তা কুঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তারা একটু কৃষকদের সম্পর্কে ভালো করে জানবেন। কৃষকদের পোশাক সম্পর্কে জানবেন। আপনারা যে পোশাকে ধান কাটছেন তা আসলে কৃষকের জন্য অবমাননাকর। আপনারা হয়তোবা ভাবতে পারেন পোশাকের সাথে আবার কৃষকের সম্পর্ক কী? আপনারা সারাদেশের কৃষকের পোশাক নিয়ে ভালো করে গবেষণা করবেন তারপর বুঝতে পারবেন আপনাদের এই পোশাক কৃষি কাজের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন পোশাক পরে কোথাও কৃষককে কৃষি কাজে করতে দেখেছেন কি? আপনারা তো আবার উঁচুতলার মানুষ। ফেসবুকে ছবি প্রকাশ করবেন তাই ভালো কাপড় না হলে কি আর হয়? না হলে তো আবার আপনাদের মানসম্মান নষ্ট হয়ে যাবে। তাই সবচেয়ে দামী পোশাকটি পড়েই ধান কাটতে হয় আপনাদের।

পোশাকের কথাও যদি বাদ দেই, আপনারা এই যে একজন ধান কাটেন আর ১০ জন ছবি তুলতে নিয়োজিত করেন সেটা কতটা সমীচীন? ধানকাটার নামে যে ফটোসেশন চলে তা কি আপনাদের লজ্জার মুখে ফেলে না? যখন আপনাদের নিয়োজিত ব্যক্তিদের দিয়ে ফেসবুকে লাইভ করান তখন কি আপানাদের লজ্জা লাগে না? আপনারা যদি কৃষকের প্রকৃত উপকারেই করেবন তাহলে এত ফটোসেশনের কিসের প্রয়োজন? এত মিছিল করে ধান কাটতে যাওয়ার মানেটা কী? 

পরের কথায় আসি, নেতানেত্রীরা যে কৃষকের ধানকাটার নামে প্রহসন শুরু করেছে তাতে কৃষককেরা অনেকটাই বিরক্ত। কয়েকজন নেতানেত্রী ভাড়া করা কিছু লোক নিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে কয়েক মিনিট ধান কেটে চলে আসেন। ফটোসেশন প্রক্রিয়া শেষ হলে কৃষকের সেই ধান ঠিক করতে কতটা কষ্ট পেতে হয় তা কি একবার ভেবে দেখেছেন? এলোমেলো করে দিয়ে আসা ধান গুছাতেই কৃষকের অনেক সময় চলে যায়। এতে অনেক ধান নষ্টও হয়ে যায়। কখনও কৃষি কাজ করে থাকলে কৃষকদের কষ্টটা ভালো করে বুঝতেন।

কৃষকের সন্তান হিসেবে বলতে চাই, ধান কাটার নামে ফটোসেশন বাদ দেন। মিথ্যে সহানুভূতি দেখিয়ে লাভ নেই। পারলে সহানূভূতি দেখান। কৃষককে কৃষি বীজ, কীটনাশক, সার, তেল দিয়ে সহায়তা করুন। কৃষকের ধান কাটার জন্য অনেক লোক রয়েছে। মূলত লকডাউনের কারণেই শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে সারা দেশে।

এই সংকট দূর করারা জন্য সরকারিভাবে বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। কৃষকদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ধান কাটার ব্যবস্থা করতে পারলে এই ফটোসেশন প্রক্রিয়া আর দেখতে হবে না। সুতরাং মূল সমস্যার সমাধান করে এই ফটোসেশন প্রক্রিয়া বন্ধ করুন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)