চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

লক্ষ্যে ‘স্থির’ আফিফ

সেই স্মৃতি এখনও পীড়া দেয়

চট্টগ্রাম থেকে: বোলিং দিয়ে বিপিএলের মঞ্চে আবির্ভাবেই আলো ছড়ানো আফিফ হোসেন ধ্রুব এবার দারুণ ব্যাটিং করে অলরাউন্ডার সত্ত্বার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। চলতি আসরে বাংলাদেশের মাত্র তিন ব্যাটসম্যান করতে পেরেছেন দুইশর বেশি রান। তাদের মধ্যে আফিফ একজন। ১৯ বছরের এ তরুণ বেশ কয়েকটি ম্যাচেই গড়ে দিয়েছেন সিলেট সিক্সার্সের জয়ের ভিত।

ডেভিড ওয়ার্নার, জেসন রয়, নিকোলাস পুরাণদের সঙ্গে ‍জুটি গড়ে খেলার পথে রেখেছেন সাবলীলতার ছাপ। ধারাবাহিকতার প্রতিফলন ঘটিয়ে তিন নম্বরে অপরিহার্য হয়ে ওঠা আফিফ ছোট ছোট কার্যকরী ইনিংসে রেখেছেন অবদান। এ বাঁহাতি ব্যাটসম্যান শুক্রবার নিজেদের দশম ম্যাচে খুলনা টাইটানসের বিপক্ষে নেমেছিলেন ওপেনিংয়ে। নতুন পজিশনেও ছিলেন সপ্রতিভ। করেছেন ৩৭ বলে ৪৯ রান। ইনিংস শুরু করেন শুভাশীষ রায়কে মিড উইকেট দিয়ে অসাধারণ এক ছক্কা মেরে।

বিজ্ঞাপন

দুটি ম্যাচে ফিফটির সম্ভাবনা জাগিয়েও ছুঁতে পারেননি। আফিফ কাটা পড়েন ৪৫ ও ৪৯ রানে। তবে এ তরুণ বিশ্বাস করেন বড় বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য তার আছে। মনোযোগ আরেকটু বাড়াতে পারলে দেখা যাবে প্রত্যাশিত ব্যাটিংটা।

যুব বিশ্বকাপে আইসিসি মনোনীত সেরা ‘উদীয়মান তারকা’ আফিফ চ্যানেল আই অনলাইনকে সাক্ষাতকারে জানালেন ক্রিকেট নিয়ে ভাবনা জগতের নানা কথাই। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিরপুরে বাংলাদেশের হয়ে টি-টুয়েন্টি অভিষেকে রানের খাতা খোলার আগেই আউট হওয়ার স্মৃতি যে এখনও পীড়া দেয়, জানালেন সেটিও।

বিপিএলে ব্যাটিং কতটা উপভোগ করছেন?
শুরুটা খুব ভালো হচ্ছে। ছোট ছোট ইনিংস হচ্ছে। আরেকটু বড় করতে পারলে ভালো হবে।

ইনিংস কেনো বড় হচ্ছে না?
নয় ম্যাচে তিনে ব্যাট করেছি। পাওয়ার-প্লে’তে প্রতি ম্যাচেই উইকেট পড়ে যাচ্ছে এক-দুইটা। যেহেতু উইকেট পড়ছে, একটু চাপও থাকছে। কিছু ম্যাচে তা পুষিয়ে দিতে পেরেছি। যখন দলের রানটা আরেকটু ভালোর দিকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছি, সেই সময়েই আউট হয়ে যাচ্ছি। ওই সময়ে আরেকটু মনোযোগ বাড়াতে হবে।

বিপিএল-অভিষেকে অফস্পিনে পাঁচ উইকেট নিয়ে রেকর্ড গড়েছিলেন। অথচ এখন বোলিং করতে কম দেখছি। ব্যাটিংয়ের দিকে বেশি ফোকাসড হওয়াতেই এমন?
গত বিপিএলে প্রতি ম্যাচেই বোলিং করেছি। আমি অলরাউন্ডার হিসেবে খেলতে চাই। খেলছিও ঘরোয়া লিগে। বিপিএলে এবার আমাদের টিম কম্বিনেশনের কারণে সেভাবে বোলিং করা লাগছে না। যদি দরকার পড়ে অবশ্যই করবো।

বিপিএলে ব্যাটিং করা ধীরে ধীরে সহজ হয়ে আসছে কিনা?
বিপিএলের ম্যাচ সবসময় প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ হয়। এবারও বিপক্ষ টিমে অনেক ভালো ভালো বোলার। সে হিসেবে গতবারের চেয়ে এবার আরও কঠিন। আমার স্ট্রেন্থ অনুযায়ী খেলে যাচ্ছি। একদম নিজের মতো করে। সামনে যে কটা ম্যাচ আছে, ওভাবেই খেলতে চাই।

ওয়ার্নারের সঙ্গে ব্যাটিং করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
অমন গ্রেট একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে ব্যাটিং করা আসলে ভাগ্যের ব্যাপার। সবাই সুযোগটা পায় না। চেষ্টা করেছি তার কাছ থেকে কিছু জিনিস শেখার। পাওয়ার-প্লে’তে কীভাবে ব্যাটিং করে, পরে কীভাবে ব্যাটিং করে, কয়েকটা জিনিস শিখতে পেরেছি। বাউন্ডারি মারার পর ডট বল না দিয়ে কীভাবে স্ট্রাইক রোটেট করতে হয়, দেখে কিছু কিছু শিখেছি। এ জিনিসগুলো যদি আরও ভালভাবে আয়ত্ত্ব করতে পারি, আমার জন্য খুব ভাল হবে।

বিজ্ঞাপন

বিদেশিদের সঙ্গেই ক্রিজে বেশি সময় কাটিয়েছেন। রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে নিশ্চয়ই খুব তৎপর থাকতে হয়েছে?
আমি নিজেও রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে ফাস্ট থাকার চেষ্টা করি সবসময়। যখন এ জিনিসটা দুজনের (ওয়ার্নারের সঙ্গে) মিলেছে, তখন সহজ হয়ে গেছে। ওয়ার্নার রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে ভালো, কলও ভালো। আমরা হাফ রানকে এক রান করছি। যেটি দুই হয় না, সেটিও দুই করে ফেলেছি, বোঝাপড়ার কারণে।

আপনার ব্যাটিং নিয়ে ওয়ার্নারের মূল্যায়ন কী?
আমাকে বিশেষভাবে কিছু বলেনি। মাঠ ও মাঠের বাইরে সবসময় বলেছে তুমি তোমার স্ট্রেন্থের মধ্যে থাকো। তোমার সব শটস আছে, সবদিকে খেলতে পারো। তুমি ইতিবাচক থাকবা, নিজের মতো করে খেলবা, তাহলে আমাদের টিমের জন্য ভালো হবে।

ব্যাটিংয়ে নিজের স্ট্রেন্থ কোনটি বলে মনে হয়?
আমাকে সবাই বলে তুমি সবদিকে শটস খেলতে পারো। ডট বল হলে চাপ নেয়ার কিছু নেই। যদি ৫টা ডট বলও দাও, পরের ৫ বলে ১৫ রান নেয়ার ক্ষমতা তোমার আছে। আমার মাইন্ডসেটটা বড় জিনিস। এটা ঠিক থাকলে বড় স্কোর করতে পারব।

বিপিএলে ভালো খেলে স্বপ্ন দুয়ার কতটা প্রসারিত হচ্ছে? জাতীয় দল নিয়ে বলছি…
যখন অনূর্ধ্ব-১৫, ১৭, ১৯ দলে খেলি, তখন থেকেই ইচ্ছা বাংলাদেশের হয়ে খেলবো। বাংলাদেশের হয়ে ডমিনেট করে নিজেকে বিশ্বক্রিকেটেও প্রতিষ্ঠিত করবো। সেটি তিন ফরম্যাটেই। জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন তো সবারই থাকে, আমারও আছে। বিপিএলে বিশ্বের ভালো ভালো ক্রিকেটারদের সাথে খেলতে পারায় আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, অভিজ্ঞতা হচ্ছে। যা সামনে কাজে দেবে।

স্বপ্নের পথে এখন কোন জায়গায় অবস্থান করছেন?
আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমনকিছু ভাবি না। সবসময় বর্তমান নিয়ে চিন্তা করি। এখন যে কাজটা করছি, যে খেলা আছে, তাতে সেরা পারফর্ম করতে পারলে ভালো কিছুই হবে আমার জন্য।

বাংলাদেশ দলে একটা টি-টুয়েন্টি খেলার অভিজ্ঞতা তো হয়েছে। এভাবে নিশ্চয়ই ভাবেননি শূন্য রানে আউট হবেন এবং আর বিবেচিত হবেন না?
সবাই চায় জাতীয় দলে এসে কয়েকটা সিরিজ খেলে নিজেকে প্রমাণ করতে। দুর্ভাগ্য, আমার হয়নি। এটা নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। সামনে সুযোগ আসবে ভালো করতে থাকলে। তখন কাজে লাগাতে পারলে আরও বেশি সুযোগ পাবো।

সেই ম্যাচটা নিয়ে কি কোনো আক্ষেপ হয়?
জাতীয় দলে খেলা নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই। কারণ সুযোগ আমি পেয়েছি। একটা ম্যাচও অনেক। আমার দুর্ভাগ্য, বাজেভাবে আউট হয়েছিলাম (শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে)। যেটা মনে পড়লে এখনও খারাপ লাগে। ভবিষ্যতে অনেক সময় আছে। এখন ভালো করতে থাকলে অবশ্যই ভালো জায়গায় যেতে পারব।

বিপিএল খেলে তরুণদের শেখার সুযোগ কতটা?
আসলে বিপিএলে অনেক সিনিয়র খেলোয়াড় থাকে, যাদের কাছে অনেককিছুই শেখার থাকে। এটা অনেক বড় সুযোগ। শর্ট টাইমে বড় জায়গায় খেলার সুযোগ মিলছে। কাজে লাগাতে পারলে ভবিষ্যতের জন্য ভালো। ঘরোয়া অন্যান্য লিগে দর্শক থাকে না। এখানে থাকে। নতুন একজন খেলোয়াড়ের জন্য বেশ চাপ থাকে। বিদেশি বড় বড় ক্রিকেটার থাকে। তাদের সঙ্গে এখানে অভ্যস্ত হয়ে যখন কেউ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলবে, তার কাছে তখন সব স্বাভাবিক মনে হবে। আমার যে অভিজ্ঞতা হচ্ছে তা কাজে লাগাতে থাকলে খুব সহজ হয়ে যাবে।

পঞ্চম বিপিএলে বল হাতে অভিষেকে আলো ছড়ানোর দিন

ওয়ার্নারের নেতৃত্বে খেলে বিশেষ কোনো উপলব্ধি হয়েছে কি? যেটি খুব কাজে দিতে পারে।
সিলেটে রংপুরের বিপক্ষে ম্যাচে ওদের মনে হয় এক ওভারে ৩৪ রান লাগবে। যেটাতে আমরা জিতেছিলাম। মিডঅফের দিকে বল যাচ্ছে, ওয়ার্নার ইনজুরি নিয়েও ডাইভ দিয়ে চার বাঁচিয়েছে। সে একজন গ্রেট খেলোয়াড়, খুবই প্রফেশনাল। ওই সময়ে একটা বাউন্ডারি হলে কিছুই হয়ত হতো না, টেলএন্ডার ব্যাট করছিল। ওয়ার্নার একটা কথাই বলে, যখন খেলবা মাঠের ভেতর থেকে বাইরে গিয়ে নিজের কাছে যেন বলতে পারো, শতভাগ দিয়েছ। আমি যেখানেই খেলি নিজের সেরাটা দিতে চাই বলে-ব্যাটে, ফিল্ডিংয়ে। বাংলাদেশ দলে খেলা নিয়ে তাড়াহুড়ো নেই। এখনও অনেক সময় পড়ে আছে।