চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নানা পাটেকর, আপনিও?

Nagod
Bkash July

মানুষের কোনটা যে মুখ আর কোনটা মুখোশ তা বোঝা খুব মুশকিলের ব্যাপার। কোনো প্রিয় মানুষ, বিখ্যাত মানুষ যদি আমাদের চোখে নেতিবাচক কোনো পরিচয়ে আবির্ভূত হন, তখন তার সেই রূপটা আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হয়। আমরা ধাক্কা খাই, কষ্ট পাই। যেমন মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে বিখ্যাত অভিনেতা নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ! আমরা যৌবনে যাদের সিনেমা দেখে মুগ্ধ হয়েছি, তাদের মধ্যে নানা পাটেকর একজন। তার ‘প্রহার’ দেখে তো তার রীতিমত ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম!

Reneta June

নব্বইয়ের শুরুর দিক থেকে তিনি একের পর এক অভিনয় করেন ‘দিশা’, ‘দীক্ষা’,‘তিরাঙ্গা’, ‘রাজু বান গায়া জেন্টলম্যান’ ‘অংগার’ ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি’, ‘গুলাম-ই-মুস্তাফা’, ‘ওয়াজুদ’, ‘হুতুতু’, ‘কোহরা’, ‘গ্যাং’, ‘তারকিব’, ‘ভূত’, ‘ডরনা মানা হ্যায়’, ‘আবতাক ছাপ্পান’, ‘অপহরণ’ ইত্যাদি সিনেমায়। তাঁর সংলাপ প্রক্ষেপণ, অভিব্যক্তি, শরীরি অভিনয় সবকিছুই তুলনাহীন।

সাদাসিধে জীবন যাপন ও দানশীলতার জন্য নানা পাটেকার বহুল খ্যাত। একাধিক সমাজসেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত তিনি। মহারাষ্ট্রের খরাপীড়িত দরিদ্র কৃষকদের উন্নয়নের জন্য তিনি ‘নাম ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। বিহারের বন্যাদুর্গত গ্রামে প্রচুর অর্থ দান করেছেন তিনি। ‘পাঠশালা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রাপ্ত সমস্ত অর্থ তিনি দান করেছেন। দশ লাখ রুপি মূল্যের রাজকাপুর অ্যাওয়ার্ডের পুরো অর্থই তিনি মহারাষ্ট্রের খরাপীড়িত কৃষকদের সেবায় দান করেছেন। বলা হয়ে থাকে গত ৩০ বছর ধরে প্রতি মাসে নিজের উপার্জনের ৯০ শতাংশ মহারাষ্ট্রের গরিব মানুষদের দান করে চলেছেন তিনি!

সেই নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। যথারীতি ‘পুরুষ’ অভিনেতারা নানা পাটেকরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আর নারীদের কেউ কেউ তনুশ্রীর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। গর্জে উঠেছেন নানা পাটেকরও। তিনি এই ঘটনাকে অস্বীকার করে আইনি লড়াই চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

তনুশ্রী

‘উদার’, ‘মানবিক’, ‘পরোপকারী’, ‘গরীবের পাশে থাকা’, ‘ট্যালেন্টেড অভিনেতা’-নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে এত বড় অভিযোগ! যৌন হয়রানি কোনো সাধারণ অভিযোগ নয়! কোনো নারীকে হয়রানি বা ‘এবিউজ’ করাটা নিঃসন্দেহে বড় একটা অপরাধ। এই অপরাধ করে কেউ পার পেতে পারে না। সে যত বড় সেলিব্রেটিই হোন না কেন। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম যৌন হয়রানির অভিযোগের পর ‘পুরুষকুল’ একাট্টা হয়ে নেমে পরেছেন নানার সমর্থনে! আমির খান প্রকাশ্যেই বলেছেন, ‘আদৌ এরকম কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না সেটা মানুষ বলবে। আমি না।’ অথচ এই আমির খানই টেলিভিশনে সামাজিক অন্যায় নিয়ে গলা ফাটান। দঙ্গলে মেয়েদের লড়াই দেখান। ইন্ডাস্ট্রির লড়াইয়ে তিনি প্রথা মেনে পুরুষ শিবিরে! কম যান না জন অ্যাব্রাহাম। ‘নানা পাটেকরের মতো মানুষের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠতেই পারে না’ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

হিন্দি সিনেমা জগতের ‘জীবন্ত কিংবদন্তি’ অমিতাভ বচ্চন বিষয়টিকে এড়িয়ে গেছেন। তনুশ্রীর অভিযোগ নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমি তনুশ্রী দত্ত নই, নানা পাটেকরও নই। আমাকে এ বিষয় প্রশ্ন করা হচ্ছে কেন?’

একজন নারী যখন তার যৌন হয়রানির কথা ‘পাবলিক’ করেন তখন বোঝা যায় তিনি কতটা সাহসী এবং একইসঙ্গে সৎ। নারীদের কেউ কেউ তার সাহসকে সম্মান জানিয়েছেন। কেননা যৌন হয়রানির অভিযোগ করার জন্য সাহস লাগে। একপেশে পুরুষালি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন অনেক নায়িকা। প্রায় দশ বছর আগের এক ঘটনা টেনে এনে নানা পাটেকরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পর বেশ কয়েকজন নায়িকা এ ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছেন।

কিন্তু পুরুষরা সবাই নানা পাটেকরের পক্ষে ভূমিকা পালন করছেন। নানা পাটেকর নিজেও পক্ষে দল ভারী করার চেষ্টা করছেন। তিনি আইনের পাশাপাশি জড় করছেন সে সময়ের কোরিওগ্রাফার গণেশ আচারিয়া এবং রাকেশ সরং-সহ অনেককে। বেশ বড়সড় দল তৈরি করছেন তার পক্ষে। তারা সমস্বরে বলেছেন, ‘‘নানা খুব উদার মানুষ। তিনি এ কাজ করতে পারেন না।’’ অর্থাৎ উদার হলে দান করলে যেন যৌন হয়রানি কেউ করতে পারে না! অথবা একজন উদার মানুষ নোংরামিও করতে পারে!

যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে তনুশ্রী প্রায় একা হয়ে পড়েছেন। কেবল প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, টুইঙ্কল খান্না এগিয়ে এসেছেন তার সমর্থনে। তনুশ্রীর পক্ষে টুইট করেছেন তারা। নানা পাটেকরের কালো দিকগুলো নিয়ে এর আগে কথা বলেছিলেন তার এক সময়ের সহকর্মীদের ডিম্পল কাপাডিয়া। তিনি বলেছেন, ‘‘অসম্ভব ট্যালেন্টেড অভিনেতা কিন্তু ওর কালো দিকগুলো আমি জানি।’’ ডিম্পলের কথার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, নানা পাটেকরের অনেক ‘কালো’ দিকও আছে!

নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ যেন আবারও ভদ্রবেশী পুরুষতন্ত্রের মুখোশ খুলে দিয়েছে। কথায়, বার্তায়, বাগাড়ম্বরে আমাদের সমাজের অনেক পুরুষই যেন রোল মডেল। কিন্তু সংকটকাল উপস্থিত হলেই অধিকাংশের আসল চেহারাটা ফুটে বেরোয়। বলিউডের ছবি মূলত হিরো কেন্দ্রিক, হিরোইনরা দ্বিতীয় পছন্দের—এমন তত্ত্বও অভিযোগের সুরে বহুবার উঠে এসেছে। তবু কাহিনীতে, চিত্রনাট্যে, সংলাপে হিরোর দাপট বরাবরই হিরোইনের তুলনায় বেশি থেকেছে বলিউডে। অধিকাংশ বলিউডি ছবিতেই হিরো বা নায়ককে রক্ষাকর্তার ভূমিকায় দেখানো হয়েছে, যে চরিত্রটি একাধারে রোমান্টিক, বীর, উদার এবং মহান। হিরোইন বা নায়িকাকে বারবারই দেখানো হয়েছে হিরোর উপর নির্ভরশীল চরিত্র হিসেবে। পরবর্তীকালে ছক ভাঙার চেষ্টা হয়েছে, নায়িকাকেন্দ্রিক ছবিও বলিউড থেকে বেরিয়েছে একের পর এক। সেসব ছবি হাততালিও কুড়িয়েছে। কিন্তু সে হাততালি বলিউডের হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে এসেছিল, নাকি পুরুষতন্ত্রের লোক দেখানো বিরোধিতার মাধ্যমে প্রগতিশীলতার গৌরব অর্জনের লক্ষ্যে, তা নিয়ে এখন বিস্তর সংশয় তৈরি হচ্ছে। যতই বলিউড ‘কুইন’ বা ‘গুলাব গ্যাং’ এর ছবি তৈরি করে মেয়েদের প্রাধান্যকে প্রতিষ্ঠা করুক, আসলে পুরোটা ‘আই ওয়াশ।’ নায়কের পারিশ্রমিক আজও একই ছবিতে নায়িকার তুলনায় বেশি। মুখে ‘উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট’ কাজে ‘জেন্ডার হায়ারার্কি। আগে নায়ক পরে নায়িকা। এক্ষেত্রে হলিউড-বলিউড-টালিউড-ঢালিউডের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই।

তনুশ্রী দত্ত যা করেছেন, নিঃসন্দেহে তা একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো যত কম লুকিয়ে রাখা যায় সমাজের জন্য ততই মঙ্গল। হ্যাঁ, নারীদের আরও বেশি বেশি এ ধরনের ঘটনার সামনাসামনি হবার হিম্মত অর্জন করতে হবে। লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতায়নের নিয়ম যতদিন না পালটায়, পুরুষরা যতদিন মেয়েদের নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে ভাবা বন্ধ না করে, ততদিন সমাজে নারীদের এই ভয়ংকর অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পাবার কোনো উপায় আছে বলে মনে হয় না।
পুরুষতান্ত্রিকে এই সমাজে অধিকাংশ পুরুষের ভেতরে যেন একটা করে হয়রানিকারী বা ধর্ষক লুকিয়ে আছে। সময় এবং সুযোগে কারওটা বেরিয়ে আসে। অনেকের সে সুযোগ মেলে না। আরেক দল আছে, যৌন হয়রানির প্রতিবাদ না করে পরোক্ষে সেও হয়রানিকারী সেজে সমাজে জায়গা করে দেয়।

মনে রাখা দরকার, নারী-পুরুষের আদিতম বিনিময় সম্পর্ক হল যৌনসম্পর্ক। সেই বিনিময়ে শোষণ-নির্যাতনও গোড়া থেকেই আছে। আবার একই সঙ্গে আধিপত্যহীন যৌনসম্পর্ক জীবনেরই উপহার। কিন্তু যৌন নিপীড়নের সংস্কৃতি থেকে বেরোতে না পারলে এই ‘উপহার’ থেকে আমরা বঞ্চিত থেকে যাব।

যৌন হয়রানি, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ইত্যাদি আসলে একটি পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া। যার উচ্ছেদ চাইতে হলে পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। নারীর ব্যক্তিত্বের মর্যাদা দিতে হবে। মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তার ইচ্ছে-অনিচ্ছে ভালোলাগা-মন্দলাগায় সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হবে।

আর পুরুষকুলকেও সাবধান হতে হবে। ‘ভালোমানুষি’র নামে রাগের নামে ক্ষমতার নামে যথেচ্ছাচার আর বোধ হয় চলবে না। নারীরা এখন গলা চড়িয়ে নিজেদের স্বরে প্রতিবাদ করতে শিখেছেন। যে কেউ নিজেদের কৃতকর্মের জন্য সাব্যস্ত হতে পারেন। পুরুষকুল বা ‘পুরুষতন্ত্র’ সবাইকে সব সময় বাঁচাতে পারবে বলে মনে হয় না!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

BSH
Bellow Post-Green View