চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নজরুল শুধু মুসলমানের কবি এই দাবী বন্ধ হোক

বাঙালির প্রাণের কবি, অস্থি মজ্জায় মিশে যাওয়া কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৫তম প্রয়াণদিনে কবির প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা জানাবার জন্য কলম না ধরে পারা গেল না। বাঙালির জাতীয় জীবনে নজরুলের সবচেয়ে বড় অবদান হলো- তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত এক জাতিকে গড়তে চেয়েছিলেন এবং সেই লক্ষ্যে অক্লান্ত কাজ করে গেছেনI তিনি সকল প্রকার সামাজিক বৈষম্য, বিভেদ, অন্যায়, অত্যাচার, ধর্মান্ধতা, নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে ছিলেন চিরবিদ্রোহী।

তিনি মানবতার জয়গান গেয়েছেন তার প্রতিটি রচনায় (গান, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, উপন্যাসে, নাটকে), তিনি বলে গেছেন সবার উপরে মানুষ/ মানবতা এবং নারী I “পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর”- নারী ও পুরুষকে এভাবেই দেখেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাকে আমরা একজন নারীবাদী কবি হিসেবেও পেয়েছি I তিনি কখনো আল্লাহ, ভগবান বা যীশুর জয়গান করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। তার লিখা “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান” গানটি গাইতে গেলে আজও চোখে জল আসেI আজকের পৃথিবীতে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটেছে যেন I

অসাম্প্রদায়িক চেতনার নজরুল একদিকে লিখেছেন ইসলামী গজল, অপরদিকে লিখেছেন শ্যামা সংগীত। তিনি এক অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত দেশ ও সমাজ গড়ার মানসে সাহিত্য ও সংগীতের বিভিন্ন শাখায় প্রতিনিয়ত লেখালেখি করে গেছেন এবং তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের এক বিদূষী নারীকেও বিয়ে করেছিলেন। তার ব্যক্তিগত যাপিত জীবন, দর্শন, লেখনি আমাদের জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে এবং এখনও করছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার গান ও কবিতা মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎস ছিল। তার যুগান্তকারী সৃষ্টি কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে চলছে। যে জাতির জীবনে একজন লালন, নজরুল এবং রবীন্দ্রনাথ থাকে সেই জাতি কেমন করে ধর্মান্ধতায় আচ্ছন্ন হয় সেটা আমি কিছুতেই বুঝি নাI নজরুল যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে আজকের বিশ্বের পথভ্রষ্ট, অন্ধকারাচ্ছন্ন, কূপমণ্ডূক ধর্মান্ধ জাতির দেখা পেলে নজরুল যে আরও কত কি লিখতে পারতেন সেটা ভাবলেই শিহরিত হই I কিন্তু আমরা এটাও জানি ওই বাংলায় আর কোনো নজরুল জন্মাবে না I

কারণ নজরুল পুনরায় জন্ম নিয়ে বর্তমান সময়ের আধুনিক মনুষ্য সৃষ্ট দূর্যোগ যার নাম তালিবান, আইসিস, বোকোহারাম, আরও নাম না জানা অসংখ ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠী, হিন্দু/বৌদ্ধ, খ্রিস্টান মৌলবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের সমর্থকদের চেহারা দেখে লজ্জা পেতে চান না এবং তাদের হাতে অভিনব পদ্ধতিতে নাজেহালও হতে চান না, যা তার জন্মের সময়েও ঘটেনি I

বিজ্ঞাপন

খুব দুঃখ হয় তিনি আমাদের এত সুন্দর একটা সাম্যর পথের ঠিকানা দিয়ে গেছেন কিন্তু আমরা জাতি হিসেবে দিকভ্রান্ত, যখন মানুষ মঙ্গল গ্রহে বসবাসের কথা ভাবছে ! তাকে আমরা অনেকেই মুসলমানের কবি বলে দাবী করি আজ I আর মসজিদের পাশে তাকে চির নিদ্রায় রেখেছি !

দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও শোষিত-বঞ্চিত মানুষের জন্য মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন আমাদের প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি লিখে গেছেন “গাহি সাম্যের গান/যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান/যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্লিম-ক্রীশ্চান।” “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নয়, নহে কিছু মহীয়ান” উচ্চারণকারী কাজী নজরুল ইসলাম আজীবন অন্তরে ধারণ করেছেন “এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কা’বা নাই।” অথচ আজকের বিশ্বের বিশেষ করে মুসলমানেরা/ বিভিন্ন ধর্মের ধার্মিকেরা এগুলো কী করছে? কী শিক্ষা নিলো নজরুলের কাছ থেকে? “আল্লাহর/ রাসূলের চেয়ে বড় কিছু নেই, মানুষ সেখানে নেই” / “মসজিদ-মন্দির এর চেয়ে বড় কিছু নাই,মানুষতো (বিশেষ করে নারী!!) ধর্তব্যে নাই” I এই মূর্খ, মূক, বধির মানুষগুলোকে কে বাঁচাবে? নজরুলকে পড়ে এটাই শিখেছি যে পৃথিবীর ধর্মীয় গ্রন্থগুলোকে পড়তে হবে বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল আর গণিতের মতোই আর একটি বিষয় হিসেবে! তাহলে যদি একটু সাম্প্রদায়িক মানসিকতার অবসান ঘটে! ধর্মের ধুম্রজাল থেকে বের না হলে আমাদের ইতিহাসের এবং বর্তমানের ধর্মীয় কলোনাইজেরদের আমরা চিনতে পারবো না I

জাতীয় কবি হিসেবে যাকে আমরা কাগজে-কলমে স্বীকৃতি দিলাম শুধুI তার অবিস্মরণীয় কিছু রচনাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার মতো করে দিনে পাঁচবার না হলেও একবার করে ফরজ ভেবে সকলের পড়া উচিৎ। তাহলে অন্তত তিনি যে জাতির জাতীয় কবি সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন জাতি একটু আলোর দেখা পেতI কবির জন্মদিন, মৃত্যু দিবস আমরা প্রতি বছর ঘটা করে পালন করি।

কিন্তু তার রচিত কিছু গান আর কবিতা মুখস্থ আওড়ালেই তাকে যথেষ্ট মর্যাদা দেওয়া হয় না। ‘সাম্যের কবি’, ‘প্রেমের কবি ‘ নামে তাকে যদি ডাকি আমরা, তবে আর কবে তার সাম্যের ডাকে সাড়া দেব? মানুষকে ভালোবাসবো ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে? আর কবে সাম্যের চর্চা করবো প্রতিদিনের জীবন ব্যবস্থায়? আর কবে তাকে আমরা ধারণ করতে পারবো মননে, চেতনায় এবং প্রাত্যহিক জীবনে? সেই দিন কি কোনো দিনও আসবে এই পৃথিবীতে? আহারে ধর্ম, আহারে নজরুল, আফসোসI

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন