চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দশ দিনেই শেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবির শুটিং, কী বলছেন নির্মাতারা?

‘সিনেমার নিজস্ব কিছু নির্মাণ পদ্ধতি আছে। সে পদ্ধতিগুলো পূরণ করতে গেলে সময় লাগবে এবং কারো কারো ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লাগে। কারো ছয় মাস লাগে, কারো এক বছর লাগে। আমাদের দেশে ১৮ দিনেও ছবি হয়েছে। জহির রায়হান সেটার পরিচালক ছিলেন। সেটাতে অবশ্য তার কয়েকজন কো-ডিরেক্টর ছিলেন। ২৪ ঘন্টাই কাজ হয়েছে। তিনি সুপারভাইজ করতেন। একইসঙ্গে বিভিন্ন সেটে কাজ হয়েছে। এক সেটে কাজ শেষ করে আরেক সেটে যেতেন আর্টিস্টরা। আমজাদ হোসেনের মতো এরকম কয়েকজন কো-ডিরেক্টর ছিলেন বলেই সম্ভব হয়েছে তখন।’

পূর্ণদৈর্ঘ্য একটি সিনেমা নির্মাণ করতে কতো সময় লাগে? এই প্রশ্নের জবাবে এমনটাই জানান রাঙা ভাবী, তোমাকে চাই, মন মানে না, নারীর মন, মাটির ফুল ও রং নাম্বারের মতো হিট সিনেমার পরিচালক মতিন রহমান।

বিজ্ঞাপন

তিনি নিজেও একটি সিনেমার শুটিং সম্পন্ন করতে নেন পর্যাপ্ত সময়। নির্মাতা জানান, ‘বিয়ের ফুল’ এর মতো সিনেমাটি পরিকল্পনা থেকে শুরু করে এক্সিকিউশন করতে সময় লেগেছে সব মিলিয়ে ছয় মাস।

কিন্তু সময় বদলেছে। শোনা যাচ্ছে, এই সময়ে অনেক নির্মাতা দশ দিন কিংবা দুই সপ্তাহের মধ্যে ছবির শুটিং সম্পন্ন করে করছেন! এ বিষয়ে মতিন রহমান বলেন, ‘এই সময়ে এসে একজন পরিচালক দশ দিনে একটা সিনেমা করে ফেলার ক্ষমতা কতোটুকু রাখেন, এটা একটা প্রশ্নেরও ব্যাপার।’

গুণী এই নির্মাতা বলেন, এক মাসে আমাদের এখানে কম্পিটিশন করে সিনেমা হয়েছে, ‘রাধাকৃষ্ণ’ হয়েছে- ‘রাই বিনোদিণী’ হয়েছে। কম্পিটিশন ছাড়াও হয়েছে, আজিজুর রহমান নির্মাণ করেছেন ‘অশিক্ষিত’, মাত্র আঠারো দিনের শুটিং ছিলো। দিনরাত শুটিং করে সেটা নির্মাণ করা হয়েছিলো। কিন্তু এরজন্য দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ছিলো। ছবির মতো ছবি বানাতে গেলে অবশ্যই এতো কম সময়ে বানানো খুব কঠিন।

শাকিব খানকে নিয়ে মনের জ্বালা ও পাসওয়ার্ড নামে দুটি সুপারহিট সিনেমা বানিয়েছেন মালেক আফসারী। এ দুটি সিনেমা তিনি যথাক্রমে ৯০ দিন ও ৬৪ দিন ধরে শুটিং করেছেন। আবার সালমান শাহকে নিয়ে ‘এই ঘর এই সংসার’ বানাতে আফসারীর সময় লেগেছিল ৩০ দিন! জায়েদ খান-পরীমনিকে নিয়ে ‘অন্তর জ্বালা’ বানিয়েছিলেন ৪৯ দিন ধরে!

এই নির্মাতা এখনও মনে করেন, ‘সিনেমার দৃশ্য ধারণ কতোদিনে শেষ হবে, তা নির্ভর করে কী ধরনের গল্প নিয়ে আমি কাজ করছি। কিন্তু সেটা যে ধরনের গল্পেই হোক, ত্রিশ দিনের নিচে কোনোভাবেই সিনেমা বানানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’

শুধু মালেক আফসারী নয়, এফডিসি কিংবা এফডিসি বলয়ের বাইরের এরকম বহু নির্মাতা আছেন যারা মনে করেন, গল্পের রকম ফের হিসেবে একটি সিনেমা ঠিকঠাক শেষ করতে অন্তত গড়ে ত্রিশ দিন শুটিং ছাড়া সম্ভব নয়! কম সময় নিয়ে তাড়াহুড়ো করে হয়তো দুই-আড়াই ঘন্টার জন্য দৃশ্য ধারণ করে ফেলা সম্ভব, কিন্তু সেটা দর্শককে খুব একটা আকর্ষণ করবে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নব্বই দশকের বেশকিছু জনপ্রিয় ছবির এক নির্মাতা বলেন, আমরা একটি সিনেমার প্রপার প্ল্যান ও সেটা এক্সিকিউট করতে কয়েক মাস লেগে যেত। একটি সিনেমার জন্য আমরা শুটিং ই করেছি অন্তত ৫৫ থেকে ৬০ দিনের মতো। কিন্তু এখন দেখছি, ছবির নাম ঘোষণা করেই দিন পনেরোর মধ্যে সিনেমার শুটিং শেষ! প্রযুক্তির ক্যাপাসিটির কারণে হয়তো কিছুটা সুবিধা সবাই পাচ্ছে, তাই বলে এতো কম সময়ে একটা সিনেমার শুটিং শেষ করা কীভাবে সম্ভব?

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে সব ধরনের গল্পে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার শুটিং শেষ করতে অনেক পরিচালক সময় নিচ্ছেন মাত্র দু-সপ্তাহ! এরমধ্যে কোনো কোনো পরিচালক ১০ দিনের মধ্যেই শুটিং শেষ করছেন বলেও শোনা যায়! গত ঈদুল আযহার পর থেকে এভাবে কমপক্ষে ১০টি সিনেমার শুটিং শেষ হয়েছে। যেসব সিনেমার পরিচালক শামীম আহমেদ রনী, মনতাজুর রহমান আকবরের মতো সুপরিচিত চিত্রপরিচালকরা।

সম্প্রতি শামীম আহমেদ রনী মাত্র আট দিনেই শাপলা মিডিয়ার প্রযোজনার ‘লাইভ’ নামে সিনেমার শুটিং শেষ করেছেন। যে সিনেমার নায়ক সাইমন সাদিক ও নায়িকা মাহিয়া মাহি।

নায়ক সাইমনের সুপারহিট সিনেমা ‘পোড়ামন’-এর শুটিং করতে সময় লেগেছিল ৩৪ দিন। তিনি বলেন, ‘লাইভ’ সিনেমার গল্প বাড়ির মধ্যে। বিভিন্ন লোকেশনে যেতে হচ্ছে না। একটি টিম দৈনিক ১৮ ঘণ্টা করে শুটিং করছি। বেশিরভাগ শুটিং শেষ। আরও ৪-৫দিন লাগবে। সবমিলিয়ে ১২-১৫ দিনে পুরো কাজ শেষ হবে। প্রত্যেকেই যেভাবে অ্যাফোর্ড দিচ্ছি এটা ৩০ দিনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

‘কম সময়ে বেশি অ্যাফোর্ড’ দিয়ে গত দুই মাসে অন্তত তিনটি সিনেমার শুটিং শেষ করেছেন ‘কুলি’ খ্যাত নির্মাতা মনতাজুর রহমান আকবর। গত দুইমাসে অমানুষ কেন মানুষ, আয়না, কাজের ছেলের শুটিং শেষ করে এই নির্মাতা মঙ্গলবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) ডিপজলকে নিয়ে ‘বাংলার হারকিউলিস’ নামে আরও এক সিনেমার শুটিং শুরু করেছেন।মনতাজুর রহমান আকবর বলেন, ১৩ থেকে ১৫ দিনেই শুটিং শেষ করছি। নিজের বানানো টেকনিক অবলম্বন করেছিলাম তাতে সফল হয়েছি বলে কম সময়ে শুটিং করতে পারছি। আগে দুপুর ১২ টার পর শুটিং শুরু হতো। কিন্তু এখন সকাল ৯ টার মধ্যে শুরু করি। শিল্পীদেরও সহযোগিতা পাচ্ছি।

বস্তির রানী সুরিয়া, শান্ত কেন মাস্তানসহ একাধিক আলোচিত সিনেমার এ পরিচালক বলেন, সকাল থেকে টানা শুটিং শুরু করলে ৭দিন পর আর সিকোয়েন্স থাকেনা। আগে ১০টা ফাইট, ৪ টা গানে ৫০/৬০ লাখ খরচ হতো। এখন সর্বোচ্চ দুটি ফাইট রাছি, দুটি গান থাকছে। গল্পের উপর জোর দিচ্ছি। ঈদের পর থেকে রিলিজ হতে থাকবে সিনেমাগুলো। এই ফরম্যাটে আমি কমপক্ষে ২০টি সিনেমা বানাচ্ছি।

গত জানুয়ারিতে রকিবুল আলম রকিবের পরিচালনায় ‘বিয়ে আমি করবো না’ নামে দুই সপ্তাহে একটি সিনেমার কাজ শেষ করেছেন চিত্রনায়ক ইমন। এত কম সময়ে তার এবারই প্রথম কাজের অভিজ্ঞতা। বললেন, কতটা ভালো করলাম বুঝতে পারবো রিলিজের পর। তবে কাজ করতে কষ্ট হয়েছে। কাজে ফিরছি বলে টিমে আরও কিছু মানুষ বসে না থেকে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। ছোট পরিসরে হলেও ইন্ডাস্ট্রিটা কিছুটা চাঙ্গা হচ্ছে। বেশিরভাগ সিনেমাই এমন হচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থে মেনে নিচ্ছি।

অল্প সময়ে সিনেমা নির্মাণের পক্ষে নন কেয়ামত থেকে কেয়ামত, কথা দাও সাথী হবে’র মতো সুপারহিট সিনেমার পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান। তিনি শুরুতে এ ব্যাপারে বলেন, ‘নো কমেন্টস’। পরে সোহানুর রহমান সোহান বলেন, সিনেমার প্রয়োজনে যতদিন লাগে। নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। তবে আমার কাজগুলো ভালো করার জন্য বেশি সময় লাগতো। তবে যে কাজ করতে মিনিমাম একঘণ্টা লাগে সেটা ৫ মিনিটে কীভাবে করা সম্ভব আমার মাথায় আসেনা!

এদিকে মালেক আফসারী মনে করেন, বাজেটের ঝক্কির কারণেই নির্মাতারা বাধ্য হয়ে তাড়াহুড়ো করে সিনেমার শুটিং শেষ করছেন। তিনি বলেন একদিনে অনেককিছু বানানো সম্ভব। কিন্তু প্রপার সিনেমা কম বাজেটে বানানো সম্ভব নয়! এমনকি অ্যাকশান ঘরানার সিনেমা কম সময়ে বানানো সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আলু পেঁয়াজের দাম পর্যন্ত বাড়ছে। কমেছে শুধু সিনেমার দাম। দশ দিনে বা কম সময়ে এখন যেসব সিনেমা তৈরি হচ্ছে সেগুলো সিনেমা হলে যাবে কিনা সন্দেহ! সেন্সর না হওয়া পর্যন্ত আমি সেগুলোকে সিনেমা বলতে রাজি নই। নবাব এলএলবি দুই খণ্ডে অ্যাপে রিলিজ হয়েছে। দুই খণ্ড রিলিজ হলে সেটা সিনেমা না!

এই নির্মাতা মনে করেন, আমি শতভাগ নিশ্চিত, এখন যারা সিনেমা বানাচ্ছেন তারা কেউ সিনেমা হল টার্গেট করে বানাচ্ছেন না। বললেন, শুনলাম ১০০ সিনেমা তৈরি হচ্ছে। প্রতি সিনেমার বাজেট ২০ লাখ টাকা। এই টাকায় সিনেমা হয় নাকি? আমার পারিশ্রমিকই তো ১০ লাখ টাকা। কেউ ৫০ লাখ টাকা বাজেট দিলেও তো আমি বানাতে পারবো না। কারণ আমি ইন্ডাস্ট্রি নষ্ট করতে পারবো না। এই খারাপ সময়ে আমার কাছে সিনেমা বানাতে হলে এক কোটি টাকা দিতে হবে। কম বাজেটে কম সময়ে যেসব সিনেমা হচ্ছে এগুলো যদি সিনেমা হলে মুক্তির পর দর্শক টানে তবে আমি মালেক আফসারী শাড়ি চুড়ি পরে এফডিসি ঢুকবো। গ্যারান্টি।