চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তুলনাহীন আমজাদ হোসেন

তাকে নিয়ে অনেককিছু লেখার আছে। অনেক বিশেষণ তার জন্য প্রযোজ্য। অনেক কর্মের স্রোতে তিনি জীবন কাটিয়েছেন। বহু গুণে গুণান্বিত প্রতিভা। যেখানেই হাত দিয়েছেন সোনা ফলেছে। স্বর্ণপ্রসবা এই ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে যখনই এসেছি মুগ্ধ হয়েছি।

তিনি একক অপ্রতিরোধ্য। আমাদের প্রিয় আমজাদ হোসেন। বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার। দুর্দান্ত অভিনেতা। তুখোড় কথাসাহিত্যিক। শ্রেষ্ঠ গীতিকার। জনপ্রিয় নাট্যকার। আরও অনেক পরিচয়ের সিলমোহর তার ললাটে।

বিজ্ঞাপন

তিনি কিংবদন্তীতুল্য ব্যক্তি। খুব সরল সোজা তার চালচলন। পরনে হাওয়াই শার্ট। পায়ে চপ্পল। হাতা গুটানো শার্ট। সাধারণ প্যান্ট। চোখে চশমা। যখনই দেখা হতো আন্তরিক প্রশ্ন করতেন।

আমীরুল তোমাদের দেখতে আইলাম। কেমন আছ তুমি? আমরা চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ি।
বসো বসো, তোমাদের সঙ্গে সাহিত্য নিয়া একটু আড্ডা মারতে আইলাম। একটা কফি খাওয়াও।

তারপর আমজাদ ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা চলতে লাগল। ফিল্ম, কবিতা, সাহিত্য, নাটক, স্মৃতিকথা তার বিপুল অভিজ্ঞতার পৃথিবী যেন রঙিন হয়ে উঠতো আমাদের সামনে।

পঞ্চাশ বছরের অধিককাল ধরে তিনি খ্যাতিমান। সৌন্দর্য প্রতাপ। মিডিয়ার অলিখিত রাজা।

জহির রায়হানের বিখ্যাত ‘জীবন থেকে নেয়া’র কাহিনি ও চিত্রনাট্যকার তিনি। ধারাপাত, বেহুলা’র চিত্রনাট্য রচয়িতা। স্বাধীনতার পরে নিজে স্বউদ্যোগে চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। রক্তাক্ত বাংলা ছবিটা মুক্তি পায়নি।

৭৭-এ ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ দিয়ে তার যাত্রা শুরু। এক ছবিতেই বাজার মাত। দশের অধিক জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তি। কসাই, সুন্দরী, এক পয়সার আলতা, ভাত দে, নয়নমনি এইসব ফিল্ম এখন ইতিহাস হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের ফিল্মের ইতিহাস মানেই আমজাদ হোসেন। একক কৃতিত্ব তার। প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের নাম আমজাদ হোসেন।

তার আদিবাড়ি জামালপুরে। কঠোর জীবন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছেন। দিবারাত্র অমানবিক পরিশ্রম। শ্যুটিং, স্ক্রিপ্ট রচনা, গান রচনা, সুর সংযোজন, ক্যামেরা, লাইট, অভিনয়- সব করেছেন এক হাতে। ক্লান্তিহীন জীবন। বড় সংসারের উপার্জনক্ষম সন্তান ছিলেন তিনি। গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য তাকে অবিরত সংগ্রাম করতে হয়েছে।

ফিল্ম ব্যবসা সফল হবার পরই প্রথম সত্যিকার অর্থে টাকার মুখ দেখতে শুরু করেন। কিন্তু তার পোষ্য অনেক। ভাইবোনদেরও ভরণপোষণ করেছেন। ছোটবেলা কেটেছে তার নানারবাড়ি। অল্পবয়সে মাতৃবিয়োগ। প্রচণ্ড মাতৃভক্ত সন্তান, কাজের প্রেরণাশক্তি মা। মায়ের স্মৃতিকথা বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলতেন। আমাদের সামনেই অনেকবার কেঁদেছেন।

নানাবাড়ি থেকে পালিয়ে গেছেন দুচারবার। তারপর কিভাবে নানা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন, নাটকীয় সেই গল্প শুনে স্তম্ভিত হয়েছি। আমজাদ হোসেন অসাধারণ গল্প কথক। চোখের সামনে পুরো দৃশ্যকাব্য ভেসে ওঠে। আমজাদ হোসেনকে আড্ডাগুরু বলা যেতে পারে। বয়স ভেদ করেন না। তার কাছে কেউ ছোট বড় ছিলো না। এফডিসি, দৈনিক বাংলা, বিচিত্রা, ঢাকা ক্লাব কিংবা চ্যানেল আই কার্যালয়, সকলখানেই তিনি সমান স্বচ্ছন্দ। মন ভালো থাকলে আড্ডায় তার জুড়ি নাই।

বিজ্ঞাপন

তার হাতের লেখা অতি সুন্দর। মুক্তোর মতো ঝকঝকে যাকে বলে। গোটা গোটা স্পষ্ট অক্ষরে তিনি লিখতেন। রাবীন্দ্রিক টাইমোগ্রাফি। চলচ্চিত্র বিষয়ে কতোবার যে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন তার হিসাব তিনি নিজেও জানতেন না। তবে সাহিত্য চর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্তিকে তিনি বড় করে দেখেন। আসলেও তাই। উপন্যাস, ছোটগল্প ও শিশুসাহিত্যে তার অসামান্য অবদান আছে।

ছোটদের জন্য তার অসাধারণ সব আবেগঘন মুক্তিযুদ্ধের গল্প আছে। জাদুর পায়রা ও জন্মদিনের বেলুন নামে তার অসাধারণ দুটো কিশোর উপন্যাসও বিচিত্রার প্রথম ঈদ সংখ্যার যাত্রা শুরু হয় আমজাদ হোসেনের উপন্যাস দিয়ে। মাধবী সংবাদ (তিনখণ্ড) ফিল্মের খুঁটিনাটি নিয়ে।

একসময় কবিতা লিখতেন। ষাটদশকের পত্রপত্রিকার সাহিত্য পাতায় সে সবের নমুনা ছড়িয়ে আছে। ছড়াও লিখতেন। রাজনৈতিক ছড়া। তৎকালীন খেলাঘর এর পাতায় প্রচুর লিখেছেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকায় ঘুরে ঘুরে ষাটদশকে লোকগান সংগ্রহ করেছিলেন। আজীবন চলচ্চিত্র ও গীতিনাটকে তিনি লোকগানকে ভেঙেচুরে ব্যবহার করেছেন। নিজেও কত যে বিখ্যাত গান লিখেছেন। জীবনের শুরু হয়েছিল মঞ্চ নাটক দিয়ে। ‘ধারাপাত’ নামের সেই মঞ্চনাটক পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়। সেই তার এফডিসিতে পদার্পণ। পুরো জীবনটা পরে এফডিসিতে উৎসর্গ করেছেন।

একদিন হাসতে হাসতে বললেন, জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে এফডিসি প্রাঙ্গণে। এফডিসির ভেতর- বাহির, কলাকুশলী, কর্মচারিদের তিনি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। যেন এক পরিবারের সদস্য। আমজাদ হোসেনের ব্যক্তিগত ব্যবহার অসম্ভব আন্তরিক। হাসিমুখে কথা বলেন। কাউকে পীড়িত করেন না। প্রচুর বই পড়েন। বাংলাসাহিত্যের আনাচে কানাচে সব খোঁজ খবর রাখেন। উপন্যাস, ছোটগল্প পড়তে খুব ভালোবাসেন। কবিতাও তার প্রিয়। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বুদ্ধদেব বসু তার খুব প্রিয় লেখক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের উপন্যাস গভীর মনোযোগ দিয়ে পাঠ করেছেন।

জীবনানন্দ দাশের কবিতা পংক্তির পর পংক্তি তার মুখস্ত। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরীর কবিতাও খুব পছন্দ করতেন আমজাদ হোসেন। তার পাঠের পৃথিবীও অনেক প্রশস্ত। যে কোনো আড্ডায়, সাহিত্য, আলোচনায় তার পঠন পাঠনের পরিচয় পাওয়া যায়। চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের চেয়েও কথাসাহিত্যিক আমজাদ হোসেন বড়মাপের কি? কখনো কখনো এই প্রশ্নের উদয় হয়। উত্তর পাই না।

তবে নানা আড্ডার প্রসঙ্গে টের পেয়েছি। আমজাদ হোসেন তার লেখক সত্তাকে খুব গুরুত্ব দেন। বই প্রকাশিত হলে শিশুর মতো আনন্দিত হতেন। এ আনন্দ উচ্চারণের আনন্দ।

আমজাদ হোসেন যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই পত্রপুষ্প পল্লবে উদ্যান রচিত হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাপ্তাহিক বিশেষ নাটকে বিশেষ অবদান আছে আমজাদ হোসেনের। জব্বর আলী চরিত্র নির্মাণ করে তিনি ঈদের বিশেষ নাটকের মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। একদা ঈদ মানে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের আনন্দমেলা আর আমজাদ হোসেনের জব্বর আলীকে বোঝাতো।

আমজাদ হোসেন নিজে জব্বর আলীর ভূমিকায় অভিনয় করতেন। প্রয়াত ফরিদ আলী, রওশন জামিল কিংবা টেলি সামাদের জমজমাট অভিনয়। নাটকটিকে জীবন্ত করে তুলতো। বিটিভিতে সেইসব নাটক দর্শকদের কাছে একশোভাগ গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। এমন হাসির নাটক আর কি হয়েছে বিটিভিতে?

উত্তর হবে না। আমজাদ হোসেনের সঙ্গে অনেক স্মৃতির মালা আমাদের। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমজাদ হোসেন ভাইয়ের গুণাগ্রহী ভক্ত।

তাই আমজাদ ভাই চ্যানেল আইতে এলেই আমরা তার প্রতি একশো-ভাগ মনোযোগী হয়ে উঠতাম। ফরিদুর রেজা সাগর তাকে চাচা সম্বোধন করতেন। কারণ সাগর ভাইয়ের পিতা এদেশের বিনোদন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ এবং ছোটদের ফিল্ম নির্মাতা ফজলুল হক। আমজাদ ভাই, ফজলুল হক এর সঙ্গেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।

সাগর ভাই তাকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতেন। শেষের দিকে আমজাদ হোসেনের শরীর ভালো যাচ্ছিলো না। ব্যাংকক- ঢাকায় চিকিৎসা হচ্ছিলো। কিন্তু তারুণ্যদীপ্ত আমজাদ হোসেন একটুখানি চুপচাপ হয়ে যাচ্ছিলেন। বয়সের ভারে আগেকার প্রাণশক্তি কি হারিয়ে যাচ্ছিলো?

আমজাদ হোসেনের কোনো তুলনা নাই।