চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ঢাকা অ্যাটাক: বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের ইতিবাচক কাণ্ডারী

প্রথমত, বাংলাদেশের ক্যাটাগরিক্যাল চলচ্চিত্র হতে পারে? তাও আবার পুলিশ থ্রিলার! দ্বিতীয়ত, টানটান উত্তেজনায় শেষ জানবার জন্য বসে থাকবে দর্শক! আড়াই ঘণ্টা ধরে!

এতো ভাবনারও অতীত। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়েছে।

বিষয় পুলিশের সাহসিকতা হলেও অহেতুক মহত্ব আরোপের চেষ্টা নেই। ছিপছিপে গল্পের শরীর। অনেকটাই যৌক্তিক দৃশ্য পরম্পরা। প্রায় প্রতিটি চরিত্রের চলচ্চিত্রে প্রয়োজনীয় অবস্থান। অতিশয়োক্তিহীন অভিনয়। গল্প অনুযায়ী লোকেশন। প্রাচ্যের চলচ্চিত্রের অন্যতম অনুসঙ্গ গান। নিয়ম মেনে সেটিও ছিল। আইটেম থেকে শুরু করে রোমাঞ্চ বা বিরহ ধারার গান সবই উপস্থিত। কিন্তু অবাক ব্যাপার, তাও অপ্রয়োজনীয় মনে হয়নি। ছিল জমাট ভিএফএক্স। যা চলচ্চিত্রের সঙ্গে মিলে গেছে। আলাদা মনে হয়নি। সব মিলিয়ে যেন মণিকাঞ্চনযোগ।

তার মানে কি কোন ঘাটতি নেই? অবশ্যই আছে। যে চলচ্চিত্র একজন পরিচালকের প্রথম পরিচালনা তাতে ঘাটতি থাকাই স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের সংলাপ তার কণ্ঠে ডাব না করে অন্যকে দিয়ে করানো। সাবটাইটেল এর বাংলা বানানে দৃষ্টিকটু কিছু ভুল। এগুলো পীড়া দিয়েছে। ছবিতে কন্টিনিউটিরও কিছু সমস্যা ছিল। ছবির কিছু লজিক্যাল ল্যাকিংস থাকলেও রুচিশীল আন্তরিক বাণিজ্যিক প্রচেষ্টা ঘাটতিগুলোকে গৌণ করে দিয়েছে। বিজিবি অডিটোরিয়ামের ডিসিতে ম্যাটিনি শো’য়ে তরুণ ও নারী দর্শকের প্রায় পূর্ণ উপস্থিতি প্রায় ম্রিয়মান করে দেয় সেই ঘাটতিকে।

ছবির গল্প একটি রাসায়নিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন স্থানে একাধিক খুন ও কয়েক প্রকার রাসায়নিক চুরি থেকে শুরু হয়। যার তদন্তের দায়িত্বে থাকেন ডিবির এসি আবিদ। লাশগুলোর কাছে থাকে স্মাইলি, ইংরেজী বর্ণ ও সংখ্যাসহ রহস্যময় কাগজ। চিবিয়ে রাখা চুইংগামও পাওয়া যায় লাশের পাশে। তদন্তে থাকে সোয়াট বাহিনী। এরই মাঝে ঘটে লোটাস নামের একটি স্কুলের সামনে বিস্ফোরণ। শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ মারা যায়। এ বিষয়ে প্রতিবেদন করতে করতে তদন্ত প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে যায় সাংবাদিক চৈতী। তদন্তে গাড়ি চোর চক্র প্রাাথমিক ভাবে অপরাধী হিসেবে উঠে এলেও ক্রমশই উঠে আসে যে স্কুলের সামনে বিস্ফোরণ হয়েছে সে স্কুলের মালিক হাসনাত করিমের নাম। নানা তদন্তে মূল অপরাধী উঠে আসে ভাঙ্গা পরিবারের সন্তান হিসেবে বিক্ষিপ্ত অপরাধী মানসিকতায় বেড়ে ওঠা তরুণ জিসানের নাম। এরই মধ্যে একটি হাসপাতালে বোমা পাতে অপরাধী। সেই বোমা নিস্ক্রিয় করা ও স্কুলে জাতীয় পতাকা সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে হাজার শিশুকে হত্যার পরিকল্পনা ভন্ডুলের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান দিয়ে শেষ হয় সিনেমা।

Advertisement

একজন পুলিশ কর্মকর্তার হাত দিয়ে বের হওয়া গল্পের চিত্রনাট্যেও গাঁথুনি সত্যিই চমকপ্রদ। পুলিশের জানবাজি রেখে জনগণকে নিরাপদ রাখার দৃশ্য চেনা পুলিশের বাইরে ভিন্ন রকম পুলিশকে দর্শকের সামনে উপস্থিত করে। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে রেখে সোয়াট টিমের প্রধানের অপরাধী ধরার অভিযানে অংশ নেয়া তার পেশার প্রতি সম্মান বাড়ায় দর্শকের মনে। কিংবা সহকর্মীদের বিপদেও মধ্যে না ফেলে বোম ডিসপোজাল ইউনিট প্রধান নিজেই বোম নিস্ক্রিয় করেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তা পুলিশের প্রতি দর্শকের শ্রদ্ধাবোধ বাড়িয়েছে।

পরিচালক দীপঙ্কর দীপনকে অভিনন্দন জানাতেই হয় পূর্ণ বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য। যেখানে রুচিশীলতাও ছিল পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমাণ। তথাকথিত বিকল্প ধারার চক্করে তিনি পড়েননি। তিনি যে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের পরিচালনায় বদল ঘটাবেন তা হলফ করে বলা যায়। ‘টিকাটুলি মোড়ে একটা সিনেমা হল রয়েছে’ গানটির চিত্রায়ণে অশ্লীলতার সুযোগ থাকলেও তিনি যে পরিমিতিবোধ দেখিয়েছেন তা প্রশংসনীয়। মালয়শিয়ার বারেও সে সুযোগ ছিল তাও তিনি পরিহার করেছেন। অভিনয়ে এসি আবিদ চরিত্রে শুভ চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে যথার্থ মানিয়ে নিয়েছিলেন। তবে সংলাপ মডিউলেশনে আরো বৈচিত্র আনার সুযোগ রয়েছে তার। সাংবাদিক চৈতীর চরিত্রে মাহিয়া মাহি চরিত্রের দাবী মিটিয়েছেন। তবে বাংলা সিনেমার ফর্মুলা মানতে গিয়ে চরিত্রটি কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল মনে হয়েছে। যা চিত্রনাট্যেরই ঘাটতি।

সোয়াত প্রধান আশফাকের চরত্রে এবিএম সুমন ও তার স্ত্রীর চরিত্রে নওশাবা ভালো অভিনয় করেছেন। শতাব্দী ওয়াদুদ আবারো তার অভিনয়ের গভীরতার প্রমাণ দিয়েছেন। পুলিশ কমিশনার চরিত্রে আফজাল হেসেনের কণ্ঠে অন্যকে দিয়ে ডাবিং না করালে কি চলতই না! আইটেম নাচে মিমো জমিয়ে দিয়েছেন। তবে চলচ্চিত্রটির কোন প্রচারণাতেই না থাকা খল চরিত্রে ‘জিসান’ চরিত্রে তাসকিন তার হিমশীতল অভিব্যক্তি, অন্যরকম ম্যানারিজম ও লাউড অভিনয় না করেও দুর্দান্ত অভিনয়ের মাধ্যমে চমকে দিয়েছেন। তানিম রহমান অংশুর ছোট ভাই তাসকিন চলচ্চিত্রে নিয়মিত হলে দেশীয় চলচ্চিত্রই উপকৃত হবে। ছোট চরিত্রে ‘দেশা’ নায়ক শিপনকে খারাপ লাগেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চরিত্রে হাসান ইমাম অল্প সময়ের জন্য এলেও অভিনেতার জাত চিনিয়েছেন। মালয়শিয়ার রয়েল পুলিশ ফোর্সের নারী এবং পুলিশ চরিত্রও পূর্ণ নম্বর পাবেন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্রথম গাইলেন বলিউডের খ্যাতিমান বাঙালি গায়ক অরিজিৎ সিং। দারুণ দৃশ্যায়ণে গানটি দারুণ লেগেছে। গানটিতে তার সঙ্গে নারী কণ্ঠে ছিলেন সোমলতা। ‘ভাবছি তোকে’ শিরোনামের স্যাড রোমান্টিক গানটিও ভালোলাগার আবেশ তৈরী করে। বাসে শিশুদের দৃশ্যেও গানটির কথাগুলো সুন্দর ছিল।

চলচ্চিত্রটির অন্যতম মুন্সিয়ানা ছিল সিনেমাটোগ্রাফিতে। সব মিলিয়ে ‘ঢাকা অ্যাটাক’ দর্শক খরার এই সময়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে ইতিবাচক পথ দেখাবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তাছাড়া শেষে জানানো হয় ২০১৯ সালে ‘ঢাকা অ্যাটাক-২’ আসবে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সিক্যুয়েল ভাবতেই ভালো লাগা তৈরী হয়। প্রথমটির সাফল্য দ্বিতীয়টির জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করাই যায়।

ফিল্ম রিভিউ: হাসান আহমেদ