চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ডিপ্রেশন কোনো জোকস নয়, এটা একটা সিরিয়াস বিষয়: তাসকিন

অবসাদ, বিষণ্ণতা শিল্পী জীবনের নিত্য সঙ্গী যেন! অতীতে দেশে দেশে অসংখ্য শিল্পী, সৃষ্টিশীল মানুষ ঝরে গেছেন অবসাদে ভুগে। সম্প্রতি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলিউড তারকা অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুত। পুলিশ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে অবসাদে ভুগছিলেন এই অভিনেতা। বিষণ্ণতায় শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি।

সুশান্তের মৃত্যুর রেশ ধরেই অবসাদ নিয়ে কথা বলছেন তারকারা। সোচ্চার হওয়ার কথা বলছেন। সেই কাতারে দেশের বড়পর্দার তারকা মুখ তাসকিন রহমান। ঘরবন্দী সময়ে তার অভিজ্ঞতা, অবসাদ ও করোনা পরবর্তীকালে সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে:

কী অবস্থা কেমন আছেন?
মার্চেই সেই লকডাউনের আগ থেকে ঘরে আছি। সেই অবস্থাতেই আছি। এরমধ্যে দু-তিনদিন জরুরী প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছিলাম। আর কয়েকদিন আগে করোনা টেস্ট করিয়েছি, রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। আমার এলার্জির সমস্যা আছে। সামান্য কিছু সিনড্রোম দেখছিলাম।চিন্তামুক্ত ও পরিবারের সুরক্ষার জন্য টেস্ট করাই। নেগেটিভ আসে। সবকিছু মিলিয়ে ভালোই আছি, সুস্থ আছি।

বিজ্ঞাপন

করোনার আগে বেশকিছু ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন। বলছিলেন, অবসর মিলছে না। এখন তো লম্বা সময়ে ঘরে থাকছেন, আপনার উপলব্ধি কী?
ব্যক্তিগতভাবে আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিচ্ছে ভবিষ্যতে সিনেমা, অর্থনীতি, উৎপাদন, স্বাভাবিক জীবনযাপন, জাতীয় সংকট থেকে গ্লোবাল সংকট সবকিছু কাটিয়ে ওঠা নিয়ে একটা বিষণ্ণতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এই মহামারী ১০০ বছর পরপর পৃথিবীতে আসে। একেবারেই চলে যায় না। মানুষ এটা থেকে সুরক্ষার উপায় খুঁজে বের করে। যেমন: মহামারী কলেরাকে এখন কেউ পাত্তাই দেয় না। কারণ, মানুষ সুরক্ষার উপায় বের করে নিয়েছে।

করোনার কারণে আমরা সাইকোলজিক্যাল শিফটিংয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। কিছু মানুষ করোনা সার্ভাইভ করতে পারবে না। যারা সার্ভাইভ করতে পারবে, তারা করোনার পর অন্য এক জীবন ও পৃথিবী দেখতে পাবে। কারণ অনেককিছু শেষ হয়ে যাবে; অনেক সম্পর্ক ভেঙে যাবে, অনেককিছু নতুন করে আবার সৃষ্টি হবে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মানসিক শক্তি খুব দরকার। এখন এমন একটা সময় যে নিজের প্রতি সচেতন না হলে কোনো ভাগ্য কাজ করবে না। প্রত্যেককেই সোলজার (সৈনিক) হতে হবে। একে অন্যের উপর ইমোশনালি নির্ভরশীল থাকলেও সত্যিকার অর্থে নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। তাই এখন থেকেই আমাদের এ ব্যাপারে প্রস্তুত থাকা জরুরী। আগামির জন্য এও মনে রাখতে হবে, যে কোনো সময় পৃথিবীতে যে কোনোকিছু আসতে পারে। আমরা যেন সর্বদাই তৈরি থাকি।

ঘরবন্দি জীবনে আপনি ইতিবাচক দিক খুঁজে পেয়েছেন?
ব্যস্ত থাকার কারণে আমার একেবারে ব্যক্তিগত কিছু কাজ জমে ছিল। তার মধ্যে একটি হচ্ছে আমার রিসার্স। শুটিং ব্যস্ততার কারণে রিসার্সের অনেক কাজ আমি করতে পারছিলাম না। এখন কাজটি আমি অনেক দূর এগিয়েছি। এটা আমার পিএইচডি-তে অনেক উপকারে আসবে। নিউরো সাইন্সে আমি পিএইচডি করছি। এটার কাজ হিউম্যান ব্রেইন নিয়ে। এছাড়া নিজেকে নিয়ে চিন্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার অনেক সময় পেয়েছি। আমার বন্ধুবান্ধব মিডিয়া কেন্দ্রিক। তাদের সাথে কথা বলে বুঝতে পেরেছি কেউ মন থেকে ভালো নেই। সুতরাং বুঝতেই পারছি, আগামিতে মিডিয়াতে একটা বড় পরিবর্তন আসবে।

আগামিতে চলচ্চিত্রের অবস্থা কেমন হতে পারে, কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
চলচ্চিত্র হচ্ছে সংস্কৃতি বড় মাধ্যম। আর সংস্কৃতি হচ্ছে একটু সৌখিন ব্যাপার। মানুষের জীবনে শান্তি থাকলে তারপর সে মনের সৌখিনতা খোঁজে। আমার কাছে মনে হয় আরও বছরখানেক পরে ছাড়া চলচ্চিত্রের অবস্থা ভালো হবে না। আর হলে হাউজফুল শো আমরা কবে দেখবো তাও ঠিক জানিনা। শিল্পী ও নির্মাতারা প্রত্যেকেই এটা নিয়ে খুবই ডিস্টার্ব অবস্থায় আছেন। লাইফ রিস্ক নিয়ে তো আমরা এখন কাজে যাবো না। কবে নাগাদ শুটিংয়ে যাবো এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের কারও কাছে নেই। ঈদের সময় সবকিছু খুলে দেয়ার ফলটা আমরা ভোগ করছি। তাহলে কীভাবে আমরা এখন শুটিংয়ে যাওয়ার চিন্তা করবো? আমার যেটা মনে হয়, করোনায় সিনেমা মরে যাবে না। শুধু বিপর্যয়ের স্বীকার হয়েছে। সিনেমা হল সংখ্যায় কম থাকলেও আমাদের কাজগুলো অনেকটা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মুখী হবে।

ঘরবন্দী থাকতে থাকতে মানুষ ডিপ্রেশনে পড়ছে। আপনি যেহেতু নিউরো সায়েন্স নিয়ে গবেষণা করছেন, আপনার কাছে ডিপ্রেশন নিয়ে ব্যাখ্যা জানতে চাই?
খুবই প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন। একজন মানুষ দুইভাবে ডিপ্রেশনের পড়ে। প্রথমটা হচ্ছে কী কারণে ডিপ্রেশন, সেটা সে জানে। অন্যটি কী কারণে ডিপ্রেশন, সে জানে না। কারণ বুঝতে না পারাটা হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ ডিপ্রেশন। এই ডিপ্রেশনে বেশি পড়ে ইয়াং এবং ধনী পরিবারের টিনএজ থেকে ইয়াং বয়সের ছেলেমেয়েরা। বাবা-মা, অর্থবিত্ত সবকিছু থাকার পরও তারা ডিপ্রেশনে পড়ে; কিন্তু জানে না কেন ডিপ্রেশন। আমি মনে করি ডিপ্রেশন কোনো জোকস নয়, এটা একটা সিরিয়াস বিষয়। আর এই করোনার সময়ে প্রত্যেকটা বয়সের প্রত্যেকটা স্তরের মানুষকে ডিপ্রেশন কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত করেছে। ডিপ্রেশন জিনিসটা জ্বরের মতো। এটা যায় আসে। ডিপ্রেশন নিয়ন্ত্রণ করতে হলে নিজের সাথে নিজেকে ডিল করতে হয়। ডিপ্রেশন যখন এক্সট্রিম লেভেলে চলে যায় তখন মানুষ একা থাকতে পছন্দ করে। অন্য কিছু ভালো লাগেনা। করোনার সময় যেমন আইসোলেশন বিষয়টা সামনে এসেছে। আইসোলেশন মানেই কিন্তু শুধু আইসোলেশন না, পরিবারের মধ্যে থেকেও আমরা আইসোলেশনের জন্য পরিবার থেকে দূরে থাকছি। এটা একটা অন্যতম ডিপ্রেশনের কারণ। আবার ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিভিন্ন পিল আছে কিন্তু এই পিলগুলো খাওয়া একেবারেই খারাপ। কারণটা স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর। এটা মানুষকে একটা জেলিফিশের মতো বানিয়ে দেয়। এতে করে কোনো ক্রিয়েটিভিটি থাকে না। এটি থেকে মুক্তি পাওয়ার একটাই উপায় হলো সব সময় ইতিবাচক চিন্তা ভাবনার মধ্যে বসবাস করা। যেসব জিনিসগুলো মানুষকে পীড়া দেয়, যন্ত্রণা দেয়, সহ্য করার মত থাকে না সেগুলো এড়িয়ে যেতে হবে। ডিপ্রেশনের না পড়ার আর একটা উপায় হচ্ছে প্রিয়জনের সঙ্গে বেশি বেশি কথা বলতে হবে। সে আমার সাথে কেন বলে না, আমি কেন আগে বলবো এইসব মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এখানে ইগো কাজ করালে হবে না। ৩০ সেকেন্ড বা এক মিনিটের দুই মিনিটের জন্য অনেক সময় দরকারে ফোন করি। এই কথা বলার মাঝে আরও কিছু পজিটিভ কথা নিজেদের মধ্যে শেয়ার করলে ইতিবাচক তথ্য শেয়ার করলে এটাও মস্তিষ্ককে পরিস্কার রাখে। আমি মনে করি এটাও ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি দিতে পারে। মেডিটেশন এবং নামাজ পড়াও ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পেতে অনেক উপকারে আসে। পৃথিবীর সবকিছু যদি একঘেয়ে লাগে, কোনোকিছুই যদি তার ভালো না লাগে, তখন বুঝতে হবে সে ডিপ্রেশনে আছে। ভয় পাওয়া, জেলাসি হওয়া, উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকার স্বপ্ন দেখা, রাগ হওয়া যখনই এই জিনিসগুলো মানুষের মধ্য থেকে উঠে যায় এবং কোন কিছুই ভালো লাগেনা; তখনই সে ডিপ্রেশনে পড়ে। আর ইমোশনাল সাপোর্ট ডিপ্রেশন থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়।

ছবি: তানভীর আশিক

আপনার ব্যক্তিজীবনে ডিপ্রেশন নিয়ে এরকম ভয়াবহ কোনো অভিজ্ঞতা আছে?
দুইহাজার সালের পর যখন সিডনি চলে যাই তখন ৪ বছর পরিবারের সাথে তেমন যোগাযোগ ছিল না। তখন চরমভাবে ডিপ্রেশনে পড়ি। পরিবারের সাথে ও তখন আমার ইমোশনাল গ্যাপ তৈরি হয়। তখন শুধু মনে হতো পরিবার থেকে এত দূরে একা বসবাস করছি কবে আবার দেশে ফিরব তার কোন ঠিক নেই। এসব নিয়ে চরমভাবে হতাশ ছিলাম। একা থাকতাম বলে কারও সাথে কিছু শেয়ার করতে পারতাম না। ৭ বছর পর দেশে ফিরে আসার পর আসতে আসতে ডিপ্রেশন কাটতে থাকে।

আমার আরেকটা ডিপ্রেশন আছে। নিজের অজান্তে অনেক কাছের মানুষকে কষ্ট দিয়েছি। জীবনে ভালোবাসা কয়েকবার এসেছে। ভালোবাসা জিনিসটার ভ্যালু দিতে পারিনি। কাউকে মন থেকে ভালোবাসলেই ভেতরে মৃত্যুভয় চলে আসতো। সেজন্য কাউকে মনখুলে ভালোবাসতে পারিনি। সেজন্য জীবনে সত্যিকারের ভালোবাসা হয়তো না বুঝেই সরিয়ে দিয়েছি এখন হয়তো ভালোবাসতে পারি। বুঝি, ভালোবাসতে হবে রিস্ক নিয়ে। ভালোবাসা হচ্ছে সাঁতার না জেনে পানিতে ঝাঁপ দেয়ার মতো। ডান বাম চিন্তা করে ভালোবাসলে সেটা ভালোবাসা হয়না, হয়ে যায় ড্রাইভিং করা। অতীতের এসব মনে হলে আমার মন খারাপ করে দেয়।