চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ডিজিটাল বাংলাদেশে ভার্চুয়াল আদালতের জয়যাত্রা

প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়তে সরকারের যে অঙ্গীকার, তা পূরণে বিচার বিভাগীয় সফলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ভার্চুয়াল আদালত।

বৈশ্বিক মহামারী করোনায় বদলে যাওয়া বাস্তবতায় দেশের লাখো বিচার প্রার্থী মানুষ এই ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমেই পেয়েছেন ন্যায় বিচার। আর পৃথিবী দেখেছে ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রযুক্তি নির্ভর আদালত ব্যাবস্থার অদম্য জয়যাত্রা।

বিজ্ঞাপন

খুলল ভার্চুয়াল আদালতের দুয়ার: গত বছর দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তবে বিচার বিভাগকে সচল রাখার বহুমাত্রিক প্রয়োজনীয়তায় একপর্যায়ে ২০২০ সালের ৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে “আদালত কর্তৃক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ- ২০২০” এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।

তার দুই দিন পর ৯ মে ভার্চুয়াল উপস্থিতিকে স্বশরীরে উপস্থিতি হিসেবে গণ্য করে অধ্যাদেশটি জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ। এরপর গত বছরের ১০ মে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনা সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে ১১ মে থেকে সীমিত পরিসরে বিচারিক কার্যক্রম শুরুর মাধ্যমে দেশে ভার্চুয়াল আদালতের দুয়ার খুলে দেন সুপ্রিম কোর্ট।

এর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর মহামারীর এক দুঃসময়ে দেশের বিচার বিভাগ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করে।

মোবাইল-ল্যাপটপের স্ক্রিনে উন্মুক্ত আদালত: বিজ্ঞ বিচারক-আইনজীবী কিংবা বিচার প্রার্থীকে করোনার ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়নি জনাকীর্ণ আদালতগুলোতে। সুবিধাজনক স্থানে থেকেই মোবাইল কিংবা ল্যাপটপে ‘জুম’ অ্যাপের মাধ্যমে যুক্ত হতে পারছেন ভার্চুয়াল আদালতে। এক্ষেত্রে অডিও-ভিডিও সংযুক্ত এক একটি মোবাইল কিংবা ল্যাপটপের স্ক্রিনই হয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের জন্য উন্মুক্ত আদালত। আবার আদালতের দেয়া রায় বা আদেশের সংক্ষিপ্ত ফলাফল মুহূর্তেই প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে। মামলা সংশ্লিষ্টরা নিজ নিজ স্থান থেকেই জেনে নিতে পারছেন তার মামলার সর্বশেষ অবস্থা বা ফলাফল।

ভিডিও কনফারেন্সে রিমান্ড শুনানি: করোনাভাইরাসের প্রার্দুভাবজনিত উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিচারক ও আইনজীবীদের ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে যখন আদালত চলছে তখন আসামির আদালতে উপস্থিতি কিভাবে নিশ্চিত হবে? এমন প্রশ্নের সমাধানও খুঁজতে হয়েছে দেশের বিচার বিভাগকে। আর এক্ষেত্রেও ভরসা হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যম। দেশে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে কারাগার হতে হাজতি আসামিদের আদালতে হাজির করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের আদেশক্রমে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কারাগারে থাকা আসামির রিমান্ড শুনানি এবং হাজতি আসামিকে আদালত কক্ষে হাজির না করে কারাগারে রেখেই জামিন শুনানির ব্যাবস্থা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ডিজিটাল বিচারিক কার্যক্রমের অনন্য এক উদাহরণ তৈরি হয়।

ন্যায় বিচার পেলেন লাখো মানুষ: দেশের জনগণের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার্থে করোনাকালীন উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার মাধ্যমে গত ১ বছরে লাখো মানুষ ন্যায় বিচার পেয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র মোহাম্মদ সাইফুর রহমানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে প্রথম দফায় ২০২০ সালের ১১ মে হতে ৪ আগস্ট পর্যন্ত মোট ৫৮ কার্যদিবসে সারা দেশের অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৯ টি জামিন আবেদন নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ৭২ হাজার ২২৯ জন ব্যক্তি জামিনপ্রাপ্ত হয়ে কারামুক্ত হয়েছেন। আর দ্বিতীয় দফায় ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল হতে ০৯ মে পর্যন্ত মোট ১৯ কার্যদিবসে সারা দেশের অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে ৬৩ হাজার ১০৯ টি জামিন আবেদন নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ৩৩ হাজার ৮৫০ জন ব্যক্তি জামিনপ্রাপ্ত হয়ে কারামুক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ এপর্যন্ত দুই দফায় দেশের অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে ২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৮ টি জামিন আবেদন নিষ্পত্তির মাধ্যমে ১ লাখ ৬ হজার ৭৯ জন ব্যক্তি জামিনপ্রাপ্ত হয়ে কারামুক্ত হয়েছেন। এছাড়া ভার্চুয়াল মাধ্যমে চলা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ, চেম্বার আদালত ও হাইকোর্টে অসংখ্য জরুরি মামলার শুনানি, আদেশ ও রায় হচ্ছে।

ইংরেজিতে লেখা রায় হচ্ছে বাংলায়: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে আদালতের আদেশ ও রায় ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে ‘আমার ভাষা’ সফটওয়্যার চালু করেছে সুপ্রিম কোর্ট। মামলার পক্ষ এবং জনসাধারণের বোঝার সুবিধার্থে ইংরেজিতে লেখা রায় বাংলায় অনুবাদের এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুবাদ সফটওয়্যারটি উদ্বোধনের পর এরই মধ্যে উচ্চ আদালতের ৫ টি রায় বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

আইনি কাঠামোতে নতুন যুগে বিচার বিভাগ: দেশে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার ভিত্তিমূল হচ্ছে “আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার আইন- ২০২০”। এই আইনের ফলশ্রুতিতে বিচার বিভাগ আধুনিক ও গতিশীল হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে গত ৫ জুলাই আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন ‘যুগান্তকারী এই আইন দেশের বিচার বিভাগকে নতুন যুগে প্রবেশ করিয়েছে।’

এই আইনের প্রসঙ্গ টেনে গত ১৮ এপ্রিল প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন আপিল বিভাগে মামলার শুনানিকালে বলেছেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানে ভার্চুয়াল আদালত চললেও তাদের ওখানে এখনো কোন আইন হয়নি। আমাদের সরকারকে ধন্যবাদ জানাবেন যে, (আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার) আইনটি আমাদের করে দিয়েছে। এই আইন অনুযায়ী দেশে এখানে ভার্চুয়াল আদালত চলছে।’

বিজ্ঞাপন