চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যেভাবে লেখা হলো ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’

বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদক স্বাধীনতা পুরস্কারের তালিকায় এবার নাম এসেছে বাংলা সংগীত জগতের অন্যতম সেরা কিংবদন্তী গাজী মাজহারুল আনোয়ারের। বহু কালজয়ী গানের স্রষ্টা তিনি। সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য গান রচনা করেছেন এবং বহু গানের সুর করেছেন। সে সবের মধ্যে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রেরণাদায়ক গান হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। ‘বিবিসি বাংলা’র শ্রেষ্ঠ ২০ বাংলা গানের তালিকায়ও এটি ১৩তম স্থানে রয়েছে।

স্বাধীনতা পুরস্কার ঘোষণার পর গুণী এই ব্যক্তিত্ব এসেছিলেন চ্যানেল আইয়ের কার্যালয়ে। কথা বলেছেন তার অনন্য সৃষ্টি ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটির প্রেক্ষাপট নিয়ে:

যে কোনো প্রাপ্তিই মানুষকে ভালো লাগার পরিণতিতে পৌঁছে দেয়। আর এই ক্ষেত্রে আমি কিছুটা অশ্রুসজলও হয়ে উঠতে চাই এই কারণে যে, একজন জাতির পিতাই নন শুধু- ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধার সঙ্গে যাকে আমি নিজস্ব পিতা বলেও স্মরণ করে এসেছি। সেই বঙ্গবন্ধু। আমি তাকে কখনো কখনো মনে করি, তিনি ছিলেন দয়ার সিন্ধু। এবং সেই বিন্দু যে হঠাৎ করে বিশাল আকার ধারণ করে সমস্ত বিশ্বকে তাক লাগিয়ে আমাদের মতো একটা রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র বানিয়ে দিয়ে জনগণের জন্য এতো সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করে গেছেন, তার ঋণ শোধ করার মতো ক্ষমতা আমাদের নেই।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

যদি তার স্মৃতিচারণ করে তৃপ্ত হতে চাই, আমরা হতে পারবো। এবং মানুষকেও আমরা তৃপ্ত করতে পারবো। তিনি একজন, তিনি শত জন। তিনি হাজার লক্ষ কোটি জন। তিনি পরাধীন রাজনীতিতে বিদ্রোহী কবি নজরুলের চেয়েও বিদ্রোহী একজন। একক শক্তিকে প্রস্ফুটিত করে তিনি প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন আমরা যে অঞ্চলে বসত করছি এই অঞ্চলটার নাম দেশ। সেই দেশটার সামনে বাংলা যোগ করতে হলে যে শক্তিতে করা দরকার, যে আদর্শটা প্রয়োগ করা দরকার- সে প্রয়োগটাই তিনি করতে চেয়েছিলেন। এবং সেটা করেছেন। আমাদেরকে একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষে পৌঁছে দিয়েছেন এবং একটা দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। এই স্বাধীন দেশটাকে নির্মাণ করার সময় সামন্যতম ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে আমিও তার পাশে এসে দাঁড়াতে পেরেছিলাম, এই সৌভাগ্য নিয়ে আমি আজীবন জ্বলবো। অত্যন্ত সৎ সাহসের সাথে মৃত্যুর সময়েও এ কথাটা বলে যাবো, তিনি শুধু দেশের বাবা নন, তিনি আমারও বাবা।

বঙ্গবন্ধু যেদিন ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ সেদিন আমার মনেও অত্যন্ত পুলক এসেছিলো এই কারণে- ভাষা আন্দোলনের সময়ে আমার বয়সের স্বল্পতার কারণে আমি সার্বিকভাবে অংশ নিতে পারিনি। তথাপি ছোট্ট করে সেসময় লিখেছিলাম, ‘ছেলেটি ক্ষেপেছে রে ক্ষেপেছে, সে নাকি শহীদ মিনার দেখতে যাবে। সে নাকি কলাপাতায় ক খ গ ঘ লিখতে যাবে।’- সে প্রেরণা ধীরে ধীরে দানা বেঁধেছে। ১৯৭১ সালে তাই যখন বঙ্গবন্ধু সেই ঘোষণাটা দিলেন, আমি আর অপেক্ষা করিনি। আমি সন্ধ্যার সময় ফার্মগেটের একটা স্টুডিওতে বসে গেলাম। নিজস্ব চিন্তা থেকে আমি কাগজ কলম নিয়ে বসে লিখতে গেলাম, ভাবলাম ‘স্বাধীনতা’টা আসলে কী! তখন মনে হলো স্বাধীনতা মানে হচ্ছে ‘‘জয় বাংলা, বাংলার জয়। হবে হবে হবে নিশ্চয়। কোটি প্রাণ এক সাথে জেগেছে অন্ধ রাতে। নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়।’’

আবার ভাবলাম, ‘বার বার ঘুঘু এসে খেয়ে যেতে দেবো নাকো আর ধান। বাংলার দুশমন তোষামোদী-চাটুকার সাবধান সাবধান সাবধান।’- এরকম করে লিখতে লিখতে স্বাধীনতার অনেকগুলো সংজ্ঞা আমি তৈরী করলাম ‘জয় বাংলা’ গানটিতে। যাতে গানটি বিশ্লেষণ করলে শিক্ষিত, অশিক্ষিত- সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন, স্বাধীনতার মানে কী! বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, তার অভ্যন্তরীণ সত্যগুলো কী কী।