‘Size don’t matter, chopping wood’ —কথাটি মারজরি কিনান রলিংসয়ের ছোটগল্প ‘মাদার ইন ম্যানভিল’র কিশোর চরিত্র জেরির, জেরি লেখককে কথাটি বলে। যখন কাঠ কাটার জন্য লেখক একজন শক্ত-সামর্থ্য লোকের প্রত্যাশা করেন, তখন জেরি হাজির হলে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। প্রেক্ষিতে আসে ‘আকার বা আকৃতি বিষয় না’ —কথাটি।
কথাটি ভীষণভাবে খাটে অলীন বাসার-এর ক্ষেত্রে। সবে ১০ বছর বয়স তার, উচ্চতাও বয়সের নিরিখেই, কিন্তু ভাবনাটা অগ্রণী। তার বয়সী ছেলে-মেয়েরা যখন চোখ বড় বড় করে ছবিওয়ালা বই পড়ায় ব্যস্ত; তখন প্রকাশিত হয়ে গেল অলীনের নিজের লেখা চতুর্থ এবং পঞ্চম বইটি।
অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৮ এর দ্বিতীয় দিন শুক্রবার শিশু প্রহরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সিসিমপুর মঞ্চে হয়ে গেল অলীনের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন। ‘পালোয়ানের হার’ ও ‘ভূতের টিউশনি’ নামের চাররঙা বই দুটির উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসে গুণীজনরা বলে গেলেন, ওহ! এ এক বিস্ময়বালকের গল্প!

বলবেনই না-বা কেন। ২০১৫ সালে ৭ বছর বয়সে ‘অন্ধকারে ভূতের ছায়া’ নামে প্রথম বইটি যখন প্রকাশিত হয়, অলীন সবে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। এবছর আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া সেই বালকটিই হাতের পাঁচ আঙুলের সমানসংখ্যক বইয়ের লেখক বনে গেল। সে তো বিস্ময়বালকের গল্পই!
খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক তো বলেই দিলেন, অলীনের নামটা এখন বিশ্বরেকর্ডের পাতায় তোলার মত অবস্থায় পৌঁছে গেছে! ‘কি সাংঘাতিক ব্যাপার, অলীন বাসারের পাঁচ নম্বর বইটিও বেরিয়ে গেল। অলীন তোমার নাম এবার বিশ্বরেকর্ডের জন্য পাঠিয়ে দাও।’ কনিষ্ঠতম লেখককে এভাবেই উৎসাহ দিলেন অগ্রজ লেখক।

অলীন অনেক বড় লেখক হোক, বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক মানের লেখক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলুক, বিশ্বের সেরা লেখক হোক বলে কায়মন প্রত্যাশা করলেন আনিসুল হক। তার সঙ্গে সুর মেলালেন উপস্থিত অন্য গুণীজনরাও।
এদিন অলীনকে উৎসাহ দিতে যে সিসিমপুর মঞ্চ উপচে পড়েছিল গুণীজনদের পদচারণায়। গবেষক-লেখক আফজালুর বাসার, সাংবাদিক শাহনাজ বেগম, শিশু সাহিত্যিক মোস্তাফা কামাল, সাংবাদিক-লেখক হালিম আজাদ; সকলেই উৎসাহ জুগিয়ে গেলেন অলীনকে। লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া, বিষয়বস্তুর বিচিত্রতায় পদচারণা বাড়ানো আর আলোকিত ভবিষ্যতের প্রত্যাশা করে গেলেন তারা।
যার জন্য এত আয়োজন, সেই অলীন অবশ্য গোপনই রাখল মনের সব উচ্ছ্বাস। ‘খুব ভাল লাগছে’ -এমন গুটিকয় শব্দে জানিয়ে রেখেছে মনের কথা। হয়ত মনে মনে ভাবছিল তার বেশি কথা বলার দরকার কি! আজ কথা হোক কেবল তার বই নিয়েই!
সেজন্য বইয়ের খুঁটিনাটি পরিচিতি উপস্থাপিকাকেই জানিয়ে দিতে হল। ঘাস ফড়িং থেকে বেরিয়েছে ‘পালোয়ানের হার’, দাম ১৬০ টাকা, প্রচ্ছদ করেছেন প্রদীপ ভঞ্জন। আর ‘ভূতের টিউশনি’ বের হয়েছে জ্ঞান বিতান থেকে। একই দামে। প্রচ্ছদ শিরীন আক্তারের।

তথ্যে যোগ হল আগের বইগুলোর কথাও। অন্ধকারে ভূতের ছায়া (সাঁকোবাড়ি, ২০১৫), ভুতুড়ে (সাঁকোবাড়ি, ২০১৬), ভুতুম (সাঁকোবাড়ি, ২০১৭)। উপস্থাপিকা অবশ্য প্রথম বইটি নিয়ে বলার সময় ‘অন্ধকারে’ শব্দটি বলতে ভুলে গেলেন। অলীনের তাতে চোখেমুখে বিস্ময়! চোখ বড় বড় করে বাবার দিকে তাকানোর পর অভিব্যক্তির ভাষায় ফুটে উঠল ‘নিখুঁত উপস্থাপনা’ না হওয়ার আক্ষেপ!
আগামী দিনগুলোতে অলীনের মাঝে এই ‘নিখুঁত’ হয়ে ওঠার ইচ্ছেটা বাড়ুক, খানিক আগে তো সেটাই বলে গেলেন অগ্রজ লেখকরা। অলীন যেন মুহূর্তেই সেটা মগজে গেঁথে নিয়েছে!

অবশ্য লেখক হওয়ার বিষয়টি অলীন মনে গেঁথে নিয়ে থাকতে পারে সেদিনই, যেদিন নিজের নাম রাখা ব্যক্তিটির পরিচয় সে জেনেছে। কে তিনি? লেখকের বাবা সাংবাদিক রফিকুল বাসার জানালেন, সদ্য প্রয়াত প্রজ্ঞাবান কথাসাহিত্যিক শওকত আলী রেখেছিলেন ‘অলীন বাসার’ নামটি। কে জানে, বাংলা সাহিত্যের প্রাকৃতপুরুষ হয়ত সেদিনই চিনে নিয়েছিলেন উত্তরসূরিকে! অলীনের অর্থই যে, যা বিলীন হয়ে যাবে না।
ছবি: সাকিব উল ইসলাম









