চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ক্যারিয়ার নিয়ে দশ বছরের স্ট্রাগল: বঙ্গবন্ধুতে যেভাবে সুযোগ পেলেন সোম

শেখ কামালের চরিত্রে ভারতীয় সোম

বাংলাদেশ-ভারতের যৌথপ্রযোজনায় নির্মিতব্য বিগ বাজেটের ছবি ‘বঙ্গবন্ধু’তে অভিনয় করার সুযোগটি ‘ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় ব্রেক’, বললেন সোম

শেখ কামাল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জেষ্ঠ্য পুত্র। বেঁচে থাকলে এখন যাঁর বয়স হতো ৭২ (প্রায়)! কিন্তু তিনি বেঁচে ছিলেন মাত্র ২৬ বছরের মতো! আর এই সময়ের মধ্যেই বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে প্রকৃত দেশপ্রেমিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিবাহিনীর সংগঠক এবং সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট থাকা অবস্থায় প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ক্রীড়াপ্রেমী, সংস্কৃতিমনা শেখ কামালের ক্রিকেট ছিলো মজ্জায়। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলাতেও অংশ গ্রহণ করেন তিনি। ফাস্ট বোলার ছিলেন কামাল। নিখুঁত লাইন-লেন্থ আর প্রচণ্ড গতির কাছে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যান ধরাশায়ী হয়ে যেতো। শুধুমাত্র বাঙালি ও মুজিবের পুত্র হওয়ার কারণে জুয়েল, রকিবুলদের মতো চরমভাবে অবহেলিত, উপেক্ষিত হয়েছেন। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই তিনি ক্রীড়াবিদ সুলতানা খুকিকে বিয়ে করেন। হাতের মেহেদি শুকানোর আগেই ১৫ আগস্ট সপরিবারে নৃশংসভাবে খুন হন কামাল!

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বহুল আলোচিত বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিতব্য চলচ্চিত্রটিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে থাকছে কামাল চরিত্রটি। আর এই চরিত্রের জন্য প্রথমে বাংলাদেশ থেকে প্রাথমিকভাবে মনোনীত করা হয় ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা রওনক হাসানকে। পরবর্তীতে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত এ অভিনেতাকে আনুষ্ঠানিক চুক্তির আগেই ‘বঙ্গবন্ধু’ থেকে বাদ দেয়া হয়। তার পরিবর্তে শেখ কামাল চরিত্রের জন্য বাছাই করা হয় ভারতীয় তরুণ অভিনেতা সোমকে (সোমনাথ চ্যাটার্জি)।

শেখ কামাল চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত বাঙালি এই তরুণ। বুধবার রাতে মুম্বাই থেকে চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে মুঠোফোনে কথা বলেছেন তিনি। জানিয়েছেন, শেখ কামাল চরিত্র নিয়ে তার প্রস্তুতি, ও তার অভিনয় জার্নি নিয়ে বিস্তারিত:

‘বঙ্গবন্ধু’র বায়োপিকে আপনি শেখ কামাল চরিত্রের জন্য কবে প্রস্তাব পেলেন? অডিশন কবে হলো?
শেখ কামাল চরিত্রটি যিনি কাস্ট করছেন, শ্যাম বেনেগাল স্যারের অ্যাসিস্ট্যান্ট, শ্যাম রাওয়াত। আমি যখন দিল্লীতে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামাতে (এনএসডি) পড়ি, তখনই তাকে আমার নাম্বার কেউ একজন দিয়েছিলেন। সেই সময় তার সাথে আমার প্রথম আলাপ। আমাদের এখানে কাস্টিং ডিরেক্টরদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়। তো আমি যখন দিল্লী থেকে পড়াশোনা শেষ করে মুম্বাইয়ে শিফট হব বলে ভাবছি, তখনই রাওয়াতজী আমার কাছে ছবি চান। পরে ফেসবুক থেকেই হয়তো তিনি ছবি পেয়েছেন, সেই সময়টায় আমার আবার একটু গোঁফ ছিল, এখনের তুলনায় একটু ওজনও কম ছিলো। তো শেখ কামাল সাহেবের যে অল্প বয়সের ছবি, আমার সেসময়ের ছবির সাথে ম্যাচ করে যায়! শ্যাম রাওয়াত সাহেব আমাকে জানান যে, বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক হতে যাচ্ছে- তুমি কাস্ট হতেও পারো। তো সেই সময়ে আমি শ্যাম বেনেগাল সাহেবের সাথে দেখাও করি, সেটা ২০১৯ সালে। তখন এই সিনেমার জন্য ইন্ডিয়ায় কিছু কিছু কাস্টিংয়ের কথা চলছিল, কিন্তু এরপর কোনো কারণে কাস্টিংটা পুরোপুরি বাংলাদেশে শিফট হয়ে যায়। শ্যাম রাওয়াত আমাকে জানান, ‘দুঃখিত, এবার হচ্ছে না।’ তখন ভেবেছি আমি হয়তো আর এই সিনেমায় কাজ করছি না, তবে রাওয়াত সাহেবের সাথে যোগাযোগটা ছিল। তো এরপর ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তিনি আমাকে জানান, কিছু কাস্টিং ভারতের শিফট হয়েছে। বিশেষ করে শেখ কামালের কাস্টিং নিয়ে সমস্যা হচ্ছে, বেনেগাল সাহেব তোমাকে দেখা করতে বলেছেন। আমি আবার যাই, গত বছরের ডিসেম্বরের শেষের দিকে। বেনেগাল স্যারের সাথে দেখা করি, তিনি আবার কথা বলে আমাকে পছন্দ করেন। কয়েকদিন কথা বলার পর আবার অডিশন শেষে কামাল সাহেবের চরিত্রে আমাকে চূড়ান্ত করা হয়।

বিজ্ঞাপন

একেতো বিখ্যাত পরিচালক শ্যাম বেনেগাল, তারউপর সিনেমাটার প্রেক্ষাপটও ঐতিহাসিক। এমন সিনেমায় অভিনয়ের বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
শ্যাম বেনেগাল অবশ্যই অনেক বিখ্যাত একজন পরিচালক, একইসঙ্গে  সিনেমাটাও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের। এমন সিনেমায় কাজের সুযোগ পাওয়ার অনুভূতি নিশ্চয় পরম প্রাপ্তির। গত দুই দিন আগে আমার যখন লুক টেস্ট হয়, তখন এক টেবিলে তার (শ্যাম বেনেগাল) সাথে আমি বসেছিলাম। আমরা দুজনেই বসে খাচ্ছিলাম, আমার নাম যেহেতু সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়- একই নামে লোকসভার স্পিকার ছিলেন এক সময়। এই নামটি ভারতবর্ষের লোকেদের কাছে বিখ্যাত। বেনেগাল স্যারের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল স্পিকার সোমনাথ চ্যাটার্জির সাথে। তো কথায় কথায় তিনি অনেক গল্প শুনাচ্ছিলেন তখন। বসে বসে তখন ভাবছিলাম, আমি তো কখনো ভাবিওনি এমন একজন সিনিয়র আর খ্যাতিমান নির্মাতার সাথে কাজ করতে পারব কখনো! এমন দারুণ একটা সুযোগ নিজে থেকেই আমার কাছে এলো! আসলে কখনো কখনো সুযোগ চলে আসে যে, সেটা অনুধাবন করতে অনেক সময় লেগে যায়! মনে হয় এটা কী সত্যি! এমন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সিনেমা এবং এমন বিখ্যাত নির্মাতার ছবিতে সুযোগ পাওয়ার পর তেমন অনুভূতিই এখন আমার। যখন এনএসডিতে চান্স পেয়েছিলাম, তখনও ব্যাপারটা আমার কাছে দিবাস্বপ্নের মতো ছিল।

তারমানে আপনার কাছে ‘বঙ্গবন্ধু’তে কাজ পাওয়ার বিষয়টি দিবাস্বপ্নের মতোই মনে হচ্ছে?
তাতো অবশ্যই। দেখুন, আমি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার ছোট্ট একটা শহর বীরনগরের ছেলে। সেখান থেকে পড়াশোনা করতে কলকাতায় আসি, কলকাতায় এসে সিনেমা হলে সিনেমা দেখে সর্বপ্রথম সিনেমার প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সিনেমায় অভিনয় করার ইচ্ছে তৈরী হয়, অডিশন দিতে শুরু করি। তারপর থিয়েটার শুরু করি, টুকটাক কাজ করতে শুরু করেছিলাম সেইসময়। কাজ করতে করতেই দিল্লীতে এনএসডি সম্পর্কে জানতে পারি। সেখানে পরীক্ষা দিয়ে চান্স পাই, পড়াশোনা শেষে তারপর মুম্বাই আসা। আমি সবসময় মনে করি জীবনে একটা সুযোগ প্রত্যেকে পায়, শ্যাম বেনেগাল পরিচালনায় এতো বড় ক্যানভাসের একটি সিনেমায় কাজ করার স্পেস হয়তো সেই সুযোগটাই। এই কাজটা আমার ক্যারিয়ারকে হয়তো এগিয়ে দিবে, আমার প্যাশনের জায়গাটা আরো পোক্ত করবে। আমি মনে করছি, এটা আমার ক্যারিয়ারে একটা বড় ব্রেক। ফলে এই কাজটার জন্য অনেক দায়িত্ব রয়েছে আমার। যেহেতু সিনেমাটা এরকম না যে, আজকে করলাম কালকেই মানুষ ভুলে গেল! এই সিনেমাটা থেকে যাবে, যতদিন পৃথিবীর বুকে সিনেমা থাকবে।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সম্পর্কে আগে থেকে কতোটুকু জানাশোনা ছিলো আপনার?
আগেই বলেছি নদীয়ার বীরনগরে আমাদের বাড়ি, সেখান থেকে বাংলাদেশের বর্ডারের দূরত্ব চল্লিশ কিলোমিটার। স্কুলে পড়াকালীন বাইকে করে বহুবার বর্ডারের কাছে গিয়েছি বন্ধুরা মিলে। বলা যায় প্রথম বিদেশ দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। মানে একটা কাঁটাতারতো ‘বাংলাদেশ’কে আমাদের কাছে বিদেশ করে দিয়েছে, যেহেতু পাসপোর্ট লাগে যেতে। কাঁটাতারের ওপার থেকে দেখেছি, আমার দেশটা যেরকম, বাংলাদেশটাও একই রকম। কেউ আলাদা নয়, আমরাও বাংলা বলি, কাঁটাতারের ওপাড়ের মানুষরাও বাংলা বলে। তো এতো কাছ থেকে বাংলাদেশকে দেখলেও ইতিহাস পড়ে এখন যেভাবে জানছি, তখন সেই সময়ে ততোটা ধারণা ছিলো না। ছোটকাল থেকে বাবা-মা কিংবা পরিবার থেকে জেনেছি, বাংলাদেশ যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ডাকে। পরে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু কেন হত্যা করা হয়েছে- তা নিয়ে বিস্তারিত জানা ছিলো না। বাংলাদেশকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছি, ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারছি, বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন করে ধারণা তৈরী হচ্ছে।

শেখ কামাল চরিত্রে অভিনয় করতে যেয়ে আপনার প্রস্তুতি কেমন? মানে নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করছেন?
শেখ কামাল চরিত্রে আমি অভিনয় করছি, যেদিন থেকে জানতে পারলাম সেদিন থেকেই মূলত প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছি। মুম্বাইতে যেদিন মহরত হলো, তারপর থেকে আপাতত আর অন্যকিছু ভাবছি না। নিজেকে প্রস্তুত করছি। যেভাবে আমি ক্যারেক্টারাইজেশন করে অভ্যস্ত, মানে একটা অভ্যন্তরীণ আরেকটা বাহ্যিক। বাইরের দিক থেকে শেখ কামাল সাহেবের সাথে আমার লুক প্রায় ম্যাচ করে। যদিও এই লকডাউনে বাড়িতে থাকায় একটু হেলদি হয়ে গেছি। ফলে আমাকে ওজন কমানোর জন্য পরিশ্রম করতে হচ্ছে এখন, প্রতিনিয়ত ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। লুক পুরোপুরি সেট করার চেষ্টা করছি। শেখ কামাল সাহেবের চোখের রং, চশমা, জামা কাপড়- এগুলো তো প্রোডাকশনই প্রস্তুত রেখেছেন। অভ্যন্তরীণ যে প্রস্তুতি সেটা একটু কঠিনই হচ্ছে, কারণ বঙ্গবন্ধুর প্রচুর ভিডিও ক্লিপ থাকলেও শেখ কামাল সাহেবের খুব একটা ক্লিপ কিংবা ভিডিও পাইনি। তবে উনি কেমন জামা কাপড় পরতেন, কী রঙের জামা কাপড় পরতেন- সেগুলো প্রোডাকশন থেকে কস্টিউম টিম থেকে জেনে নিয়েছি। আমার এনএসডির সিনিয়র অতুল তেওয়ারি, তিনি আবার এই সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন- তিনি আমাকে বসে শেখ কামাল সম্পর্কে অনেক গল্প বলেছেন। দুর্লভ যে ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ আছে, সেখান থেকে উনার হাসি, চলন এগুলি আত্মস্থ করার চেষ্টা করছি। প্রাণোচ্ছল একজন মানুষ ছিলেন, থিয়েটারের প্রতি তার টান ছিল, খুব ভালো ক্রিকেট খেলতেন, দারুণ সেতার বাদক ছিলেন- পজিটিভ একজন মানুষ ছিলেন, তরুণদের জন্য ভাবতেন- লিডারশিপ উনার চোখে মুখে ছিল- এসব জেনেছি। সেগুলো অনেকটা আইডিয়া করে রিলেট করে নিজেকে তৈরী করার চেষ্টা করছি। অনেকটা স্থিরচিত্র কিংবা একটু ভিডিও ক্লিপ দেখে ওই ক্যারেক্টারকে রিড করা, এটা করছি। যদিও একটু কঠিন ব্যাপার। এছাড়া ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক, পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের যুদ্ধ, ১৯৭১ সাল, স্বাধীনতা লাভ, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট- এসব আমি বই থেকেই পড়ছি। বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটিও পড়ছি। মানে বাইরের দিক থেকে এবং ভেতরের দিক থেকে একটা ক্যারেক্টারকে স্ক্রিনে তুলে ধরতে নিজের সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আমি জানি, এই চরিত্রটি খুব বেশি আগের নয়। এখনও তার (শেখ কামাল) অনেক বন্ধু রয়েছেন, ফলে এমন একটি বাস্তব চরিত্র পর্দায় তুলে ধরা কঠিন চ্যালেঞ্জ যে কোনো অভিনেতার জন্য। কারণ দেশের মানুষের যে আবেগ রয়েছে, বন্ধুদের যে অনুভূতি রয়েছে এই চরিত্রটি কে নিয়ে- এটা ঠিকভাবে করতে পারা অবশ্যই বড় চ্যালেঞ্জ। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি সত্যের কাছাকাছি থেকে যতটা তার কাছে পৌঁছানো যায়।

নির্মাতা শ্যাম বেনেগালের সাথে অভিনেতা সোম

আপনার শুটিং কবে থেকে শুরু? চলবে কতোদিন?
আমার অংশের শুটিং শুরু হচ্ছে ফেব্রুয়ারিতে। মার্চ পর্যন্ত আমার শুট। এখন পর্যন্ত জেনেছি, মুম্বাইতেই হবে আমার প্রথম পর্বে আমার অংশের শুটিং। বাকি অংশের শুটিং হবে বাংলাদেশে, এ বছরের শেষের দিকে।

সহঅভিনেতা হিসেবে বাংলাদেশ থেকে যারা মুম্বাইয়ে গেছেন, তাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে?
বাংলাদেশ থেকে যারা এসেছেন তাদের মধ্যে বাহা উদ্দিন খেলন স্যার আছেন, তিনিও আমার এনএসডির সিনিয়র। দুই দিন আগে আমি সেখানে গিয়েছিলাম, আমার লুক সেট ছিল। সেখানে অনেক সময় লেগে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশ থেকে আসা অভিনেতাদের সাথে আমার সাক্ষাত হয়নি। তবে আগামি দুই এক দিনের মধ্যে আমি আবার সেখানে যাবো, সবার সাথে পরিচিত হবো। আমি এই ফাঁকে একটু বলি, বাংলাদেশে আমার একজন অভিনেতা কিন্তু খুব প্রিয়।

কে?
তিনি মোশাররফ করিম সাহেব। উনি আমার খুব ফেভারিট একজন অভিনেতা। আমি যখন কলকাতায় থিয়েটার করতাম বহুরূপী নাট্য গোষ্ঠীর সাথে, শম্ভু মিত্রের। সেই দলে থাকাকালীন আমরা অনেকেই বাংলাদেশের প্রচুর নাটক দেখতাম ইউটিউবে, তারমধ্যে নুসরাত ইমরোজ তিশাকেও দেখেছিলাম। আমি যখন বঙ্গবন্ধু বায়োপিকে যুক্ত হলাম, তখন জানলাম যে তিনিও এই সিনেমায় কাজ করছেন। সেটা জেনে খুবই খুশি হয়েছিলাম। প্রিয় অভিনেত্রীর সাথেও এবার দেখা করবো। উনাকে বলবো, বাংলাদেশে গেলে আমি মোশাররফ ভাইয়ের সাথে দেখা করতে চাই।

মুম্বাইয়ে চলতি মাসেই হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু’ সিনেমার মহরত

শুরুতে বলছিলেন, কলকাতায় কলেজে পড়তে গিয়ে সিনেমা দেখার প্রতি ঝোঁক তৈরী হয়, পরবর্তীতে সিনেমা দেখতে দেখতে অভিনয়ে ঝুঁকলেন। অভিনয়ে আসার জার্নিটা কেমন ছিলো?
মধ্যবিত্ত পরিবারে যে অবস্থা থাকে সাধারণত, আমারও তাই। কোনরকমে একটা সরকারি চাকরি যোগাড় করে নিলেই হতো, আমার পরিবারও এরকমই চাইতো। কিন্তু কলকাতায় গিয়ে আমার মাথায় কি জানি একটা ভূত চেপে বসে, বাবার এত পয়সা ছিলনা- আমার জার্নালিজম পড়ার ইচ্ছা ছিল, পরে এনিমেশন পড়তে ইচ্ছা হল, এগুলোর কোনটাই হয়নি। তো কলকাতায় পড়াকালীন টুকটাক অডিশন দিতে শুরু করি, একটা অ্যাক্টিং ক্লাসেও যোগ দেই। মাসে ৫০০ দিতে হয় আমায়। এরপর সুযোগ হয় টুকটাক কাজের, ছোটখাটো চরিত্রে কাজ করি। তো টুকটাক কাজের সুবাদে একসময় বাবা-মাকে নিয়ে নদীয়ার সেই ছোট্ট গ্রাম থেকে কলকাতায় শিফট করি। টুকটাক কাজ করি কখনো বিজ্ঞাপনে, কখনো কখনো টুকটাক মডেলিং, কোন সিরিয়ালে একদিনের কাজ, কিংবা কলকাতার বড় তারকাদের পেছনে ব্যাকগ্রাউন্ড আর্টিস্ট হিসেবে, কলকাতার অনেক সিনেমায় কাজ করেছি এভাবে। সেই সময় আমার পরিচিত একজন বললেন তুমি থিয়েটার কেন করছ না, ২০১১ সালের শেষের দিকে আমি থিয়েটারে যুক্ত হই। কিন্তু এগুলো করে তো আর হয়না, বাড়ির একটা প্রেসার ছিল। বলছিল এখন বড় হচ্ছো, কাজ করো। ফ্যামিলির অবস্থা যেহেতু এতো ভালো না, তাই থিয়েটার করার পাশাপাশি একটা সিনেমা হলে চাকরি নেই- বাড়িতে সাপোর্ট দেয়ার জন্য। কলকাতার প্রিয়া সিনেমা হল ছিলো সেটা, বছর দেড়েক সেখানে চাকরি করি। সন্ধ্যাবেলা বহুরূপী নাট্যগোষ্ঠীতে নাটক করতাম, আর সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত চাকরি করি করতাম সিনেমা হলে। সন্ধ্যার পর রাত দশটা পর্যন্ত রিহার্সাল করতাম। ২০১৪ সালে নাট্য দলের পক্ষ থেকে নাটক নিয়ে দিল্লী যাওয়ার সুযোগ হয়। সেখানে গিয়েই আমি এনএসডি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। সেখানে পড়লে টাকাও দিবে, আবার পড়তেও পারা যাবে। কিন্তু তারজন্য কী প্রক্রিয়া, তখন আমি কিছুই জানি না। ফিরে আসি কলকাতায়। ঠিক আবার পরের বছর আমরা দিল্লীতে ডাক পাই। এবার এনএসডিতে ‘ভারত রং মহোৎসব’ এ। সেখানে যাওয়ার পর এনএসডিতে ঢুকতে পারি, সেই ফাঁকে এডমিশনের প্রস্তুতি কী- এসব সম্পর্কে জেনে আসি। এরপর কলকাতায় ফিরে গিয়ে সিনেমাহলের চাকরিটা ছেড়ে দেই, মানসিকভাবে এনএসডিতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করি। সেই সময়ে আবার ‘জি বাংলা’ টেলিভিশনে একটা সিরিয়ালে কাজ করার সুযোগ পায়, এখানে কাজ করার ফলে কিছু টাকা-পয়সা হয়। কিছু টাকা জমিয়ে ২০১৬ সালে আমি এনএসডিতে ভর্তি পরীক্ষা দেই। প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষা দিয়েই আমি সেখানে চান্স পেয়ে যাই। ভাগ্যিস সেটা হয়েছিলো, না হলে হয়তো পরিবারের দিকে তাকিয়ে অন্য চাকরিতে এতোদিনে ব্যস্ত হয়ে যেতে হতো আমাকে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত আমি এনএসডিতে ছিলাম। এরপর কলকাতায় ফিরে একটা সিনেমা করি, লিড কাস্ট হিসেবে। সিনেমাটার নাম ‘ডিয়ার ঘোস্ট’, এটি বাংলা ছবি। ছবিটি এখনো রিলিজ হয়নি, অপেক্ষায় আছে। সে বছরই আমি মুম্বাই শিফট করি। একটা অভিনয় শেখানোর ক্লাসে যুক্ত ছিলাম, এরমধ্যে করোনা চলে আসায় আবার কলকাতায় ফিরে আসি। তিন চার মাস পর ফিরে গিয়ে মুম্বাইতে একতা কাপুরের ‘নাগিন’ নামে একটা সিরিয়াল আছে সেটাতে অ্যাসিস্ট শুরু করি। সেটাও শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছি। অনলাইনে ক্লাস নিয়ে কোনো রকমে সার্ভাইভ করে নিচ্ছিলাম। আমার একটি ইউটিউব চ্যানেলও আছে ‘ব্রেড বাটার টোস্ট’ নামে, সেখানে আমি তরুণ অভিনেতা এবং অভিনেত্রী দের জন্যে ফ্রি এক্টিং টিপস ও শেয়ার করি। এরমধ্যে দুটো হিন্দি ওয়েব সিরিজেও কাজ করেছি, সেগুলি এখনো আসেনি সামনে আসবে। অভিনয় নিয়ে বছর-দশেকের একটা জার্নি আমার।

একটু আগেই বলছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনার বাবার কাছ থেকে শুনেছেন, ধারণা পেয়েছেন। এরকম ঐতিহাসিক সিনেমায় কাজের সুযোগ পাওয়ায় আপনার বাবা বিষয়টি নিয়ে কী ভাবছেন? খুশি হয়েছেন তো?
বাবা একেবারে সাধারণ মানুষ। তবে তিনি অবশ্যই খুশি হয়েছেন। তার খুশি হওয়ার কারণ, করোনার সময় আমি যখন শুধুমাত্র অনলাইন ক্লাস করিয়ে সার্ভাইব করছিলাম, তখন বাবাকে বলেছিলাম এসব আর ভালো লাগছে না। তখন বাবা আমাকে বলেছিলেন, ‘তোকে বলেছিলাম রেলের ফর্ম কিনে চাকরির জন্য আবেদন কর, চাকরি করলে আরামে থাকতে পারতি এতোদিন’। তো এই সময়ে এরকম বিশাল প্রেক্ষাপটে নির্মিত সিনেমায় কাজ পাওয়া এবং সেটা বানাচ্ছেন শ্যাম বেনেগাল স্যার, আর সিনেমাটা বঙ্গবন্ধুর উপর- এটা শুনে বাবা খুবই খুশি হয়েছেন। এই করোনা পরিস্থিতিতে অসম্ভব আর্থিক টানাপোড়েনে ছিলাম, বাবা নিজের ব্যবসা নিয়েও সমস্যায়, যা এখনো বন্ধ প্রায়। ফলে এজন্য আরো বেশি খুশি হয়েছেন যে, একটা কাজ পাওয়ার বদৌলতে কিছু টাকাও হাতে আসবে। বাবার কাছে এটা নিশ্চয়ই আরও বেশি আনন্দের ব্যাপার যে ছেলের স্বপ্ন ধীরে ধীরে সফল হচ্ছে।