চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কালো মেঘের গর্জনে হাওরে আতংক

জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ): এই ভালো, এই মন্দ। ক্ষণিকের মধ্যেই রূপ বদলায় আবহাওয়া। চৈত্র মাস শেষ হয়নি। যে বৈশাখ মাসকে ঘিরে হাওরপাড়ের কৃষকরা সোনালি স্বপ্ন নিয়ে বিভোর থাকে সেই মাস হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

কিন্তু এই মাস এখন কৃষকের কষ্টের ফলানো বোরো ধানের স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়ে দুঃস্বপ্নে পরিণত হবার উপক্রম হতে যাচ্ছে। মেঘে ঢাকা আকাশে কালো মেঘ, বজ্রপাত আর মেঘের গর্জন শুনে এখন আঁতকে ওঠে কৃষকের বুক। প্রকৃতির বৈরী আচরণে হাওর রক্ষা বাঁধ ভাঙা, কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রপাত আর পাকা ধান কাটার শ্রমিক না পাওয়ায় উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় রয়েছে সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার হাওরাঞ্চলে কৃষক, নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ।

বিজ্ঞাপন

প্রতি বছরই একের পর এক দুর্যোগ হানা দেয় এই জেলায়। এবারও এই আতংক নিয়েই হাওরে কষ্টের ফলানো বোরো ধান কাটছে কৃষকেরা। বজ্রপাতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৪ জন মারা গেছে। ফলে রাত নামলেই নিজের ও পরিবারের জীবন রক্ষায় আতংকের মাঝে ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রাত্রি যাপন করছে কৃষকরা নিজ বাড়িতেই। হাওরে প্রকৃতির এই বিরূপ নির্মমতায় হতবাক হাওরবাসী।

সুনামগঞ্জ জেলার ১১টি উপজেলার বিভিন্ন হাওরে প্রায় অর্ধশত বাঁধে ফাটল ও ৩০টি হাওর রক্ষা বাঁধ দেবে গেছে বলে জানা গেছে। কৃষকদের দাবি, বাঁধে ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করা এবং নিম্নমানের কাজের জন্যই এমন হয়েছে। এই সব কিছুর আড়াল থেকে নেতৃত্ব দেন স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। সেই সুযোগ কাজে লাগান পাউবো’র কর্মকর্তারাও। রাজনৈতিক ফায়দায় তাদেরও থাকে নিজস্ব সিন্ডিকেট। যার ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ড পাউবো’র যোগসাজসে ৯৮ ভাগ কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করার চেষ্টায় লিপ্ত দুর্নীতিবাজরা।

তবে জেলা প্রশাসন এই বিষয়ে তৎপর থাকলেও উপজেলা পর্যায়ে তেমন তৎপরতা নেই। যার ফলে জেলায় গত ২০১৬ ও ২০১৭ সালে হাওর রক্ষা বাঁধে পুকুর চুরি করায় একফসলী বোরো ধান অকাল বন্যায় ৯০ শতাংশ পানিতে তলিয়ে যায়।

দুটি বছর কৃষকদের অপূরণীয় ক্ষতির সেই শোক কিছুটা লাঘব হয়েছে গত বছর ও চলতি বছরে ভালো ফসল হওয়ায়। কিন্তু হাওরপাড়ের অসহায় মানুষগুলোর মাঝে সারাক্ষণই এখন হাওর রক্ষা বাঁধ ভাঙা, কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাতের আতংক বিরাজ করছে। বিদ্যুৎ ও লোডশেডিংয়ের চোর-পুলিশ খেলা আর ভেলকিবাজির মধ্যে দিয়ে ভ্যাপসা গরমে গত দিনগুলো ভালো গেলেও এখন অতিষ্ঠ হাওরবাসী।

বিজ্ঞাপন

এ আতংক শুধু সুনামগঞ্জ নয়; হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলায় হাওরাঞ্চলেও একই অবস্থা বিরাজ করছে বলে জানা গেছে। হাওরপাড়ে বসবাসকারী অসহায় জনসাধারণের টিন, গাছ-পালা, মাটি ও ছনের তৈরি ঘর ও ফসলী জমিগুলো শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে।

জেলার শনির হাওর পাড়ের কৃষক সাদেক আলী, সবুজ মিয়াসহ দ্বীপসদৃশ গ্রামের কৃষকরা বলেন, ‘এবার জেলার প্রতিটি হাওরেই বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে আবহাওয়ার বৈরী আচরণে আমরা আবারও চিন্তার মধ্যে আছি। আকাশে মেঘ, পরে বৃষ্টি আতংকের মধ্যে থাকি পাহাঢ়ি ঢলে বাঁধ ভাঙার ভয়ে। কারণ এবারও বাঁধে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। আর বজ্রপাতের ভয়ে শ্রমিকরা ধান কাটতে হাওরে যেতে চায় না। এদিকে আবার ধান কাটার শ্রমিক তো নেই। আর যে কিছু শ্রমিক পাই তারা আবার মজুরী বেশি দাবি করছে।’সুনামগঞ্জ-কালো মেঘ-হাওর-হাওরে আতংক

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল জানান, এই উপজেলায় প্রকৃতির বৈরী আচরণে হাওরপাড়ে শ্রমিক সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে। তারপরও কৃষকেরা নিজেদের মতো করে পরিবারে লোকজন নিয়েই পাকা বোরো ধান কেটে শেষ করার চেষ্টা করে। বজ্রপাত প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া খুবই প্রয়োজন।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বশির আহমদ জানান, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড, উফশি ও স্থানীয় জাতের বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এতে ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হওয়ার কথা, যার বাজারমূল্য হবে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা।

‘আশা করি সুন্দরভাবেই এবার কৃষকরা তাদের কষ্টের ফলানো ধান গোলায় তুলতে পারবে।’

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, চলতি বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে কাবিটা কর্মসূচির আওতায় সুনামগঞ্জের ৪২টি হাওরে ৫৭২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে ৪৫০কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করেছে। এসব বাঁধের মধ্যে সুনামগঞ্জ পওর (পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ)-১ এর অধীনে ১৯৮ কিলোমিটার ও পওর-২ এর অধীনে ২৫২ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয়েছে ৯৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি হাওরের বাঁধ রক্ষায়। প্রতিটি বাঁধ নজরদারিতে রেখেছি,’ বলেন তিনি।