চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘কাঙালিনীকে সহায়তা করতে হবে না, শুধু একবার এসে দেখে যান’

মাটির গানের ফেরিওয়ালা তিনি। কালজয়ী লোকসংগীত রচয়িতা, সুরকার ও শিল্পী। টানা কয়েক দশক ধরে গান গেয়ে মানুষের মন জয় করলেও আর্থিক অনটনে কার্যতই তিনি এখন ‘কাঙাল’। বলছি কাঙালিনী সুফিয়ার (সুফিয়া খাতুন) কথা।

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সঞ্চয়পত্র থেকে মাসে ১০ হাজার টাকায় কোনোভাবে সংসার চলছে বটে, তবে মাথার উপর আছে ‘বিশাল ঋণের বোঝা’! সব মিলিয়ে ভালো নেই ‘বুড়ি হইলাম তোর কারণে’র এই শিল্পী।

বিজ্ঞাপন

মাটির গানের এই শিল্পীর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতেই রবিবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। কথা হয় শিল্পীর সঙ্গে। তার কণ্ঠে আবারও গানে ফেরার আকুলতা ঝরে পড়ে। কবে আবার গাইতে পারবেন, এটা নিয়ে উদগ্রীব তিনি। শরীর খুব একটা সুস্থ না থাকায় ফোন তুলে দেন বড় মেয়ে পুষ্প বেগমের কাছে। মেয়ে জানালেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা!

পুষ্প বলেন, ‘আমাদেরতো গান গাওয়া ছাড়া আর কোনো ইনকাম নাই, এই গানের উপরেই আমাদের জীবন। কিন্তু এখনতো কোনো গান বাজনাও নাই। করোনা করোনা কইরা ঘরে দিনের পর দিন বসে থাকতেছি। কেউ ডাকে না। তিনমাস আগে একটা টিভি চ্যানেল থেকে ডাকছিলো, কিছু টাকা পাইছিলাম। এরপরতো আর কেউ গান গাইতে ডাকে নাই। বসে বসে কতোদিন খাওয়া যায়?’

কাঙালিনী সুফিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থায় কি কোথাও গিয়ে গান করার পরিস্থিতিতে আছেন তিনি? মেয়ে বলেন, ‘গান গাইতে পারবে। তাছাড়া আমরাওতো সাথে থাকি, দোহারি টানি তার সাথে। আমরা তাকে চাপ দেই না, সে একটু সুর ধরে দেয় এরপর বাকি গানতো আমরাই গাই। মঞ্চেটঞ্চেও এভাবেই অনুষ্ঠান করি। কিন্তু এখনতো করোনার লাইগা দুনিয়ার কোথাও গান নাই। শিল্পীরা একেবারে না খেয়ে মরার অবস্থায় চলে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর সঞ্চয়পত্র থেকে মাসে যে দশ হাজার টাকা পাই, এটা না হলে তো এই সময়ে সত্যি সত্যিই আমরা না খেয়ে মরতাম সবাই। আমাদের কি আর চাকরি বাকরি আছে যে, মাস গেলে বেতন পাবো? এই টাকা না পাইলে কী হইতো আমাদের অবস্থা!’’ এরজন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বার বার কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন কাঙালিনী সুফিয়ার মেয়ে।

তবে মায়ের চিকিৎসা, ঔষুধপত্র কেনার পাশাপাশি সংসার টানতে এই টাকা যথেষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাছাড়া মাথার উপর আছে বেশ বড়সর ঋণের বোঝা!

কাঙালিনী সুফিয়া ব্রেন স্ট্রোক করেন ২০১৮ সালে। সেসময় প্রধানমন্ত্রী এই শিল্পীর চিকিৎসা ভার বহন করার আগে প্রায় তিন লাখ টাকার মতো চড়া মূল্যে সুদ নিয়ে মায়ের চিকিৎসা শুরু করেছিলেন পুষ্প। জানালেন সেই তিন লাখ টাকার সুদ বাড়তে বাড়তে গত দুই বছরে এখন সাড়ে নয় লাখ টাকার মতো হয়ে গেছে! প্রতিদিন সুদের টাকা পরিশোধের তাগাদা দিতে বাড়িতে লোক আসে। তার কথায়, ‘এসব আর ভালো লাগে না। পেটে ক্ষিদা রেখে লজ্জা করে লাভ নাই। তাই অভাবের কথাগুলো বললাম।’

কীভাবে এই ঋণ পরিশোধ করবেন, সেটাও এই মুহূর্তে জানা নেই তার। তবে এসবের চেয়ে বর্তমানে কীভাবে খেয়েপরে বাঁচবেন সেটা নিয়েই বিচলিত কাঙালিনী সুফিয়ার পরিবার।

কিছুটা বিকারহীন ভাবে পুষ্প বলেন, ‘কোন্ এক বাউল ফকির ছিলো না, নামটা মনে নাই। না খেয়ে মরছিলো। আপনাদের বাংলাদেশের শিল্পী কাঙালিনী সুফিয়া, পয়সার অভাবে সেও কি না খেয়ে মরবে নাকি? সেটাইতো দেখতেছি, যেভাবে করোনা আসছে- আমারতো মনে হয় এভাবে চললে আমার মায়েরও না খেয়ে মরতে হবে।’

‘আপনারা আমার মাকে দেখতে আসেন। কাঙালিনী কী অবস্থায় আছে, সবাই এসে নিজের চোখে দেখে যান। এসে নিজে কানে বিস্তারিত শুনে যান।’ বলছিলেন পুষ্প বেগম।

জনপ্রিয় এই শিল্পীর ভক্তদের প্রতি মাকে দেখেতে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুষ্প বেগম বলেন, ‘‘আগেতো প্রতিদিনই বাড়িতে মানুষ আসতো। খোঁজ খবর নিতো। ঘরে থাকলেও শিল্পীর একটা কদর ছিলো। এই লকডাউনের কারণে মানুষও তো দেখতে আসে না, আমার মা হাহুতাশ করে। তাকে সহায়তা করতে হবে না, শুধু একবার এসে দেখে যান। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে যান। তাতেও অন্তত একজন শিল্পীর মনের হাঁসফাঁসটা কমে।’’

মাত্র ১৪ বছর বয়সে গ্রাম্য একটি অনুষ্ঠানে গান গেয়ে শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান সুফিয়া। এরপর বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। পেয়েছেন ৩০টি জাতীয় ও ১০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। সুফিয়ার মোট রচিত গানের সংখ্যা প্রায় ৫০০। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে তিনি ‘রাজ সিংহাসন’ চলচ্চিত্রে প্রথম কণ্ঠ দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, ভারতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

তার গাওয়া জনপ্রিয়তা পাওয়া গানগুলোর মধ্যে কোনবা পথে নিতাইগঞ্জে যাই, পরাণের বান্ধব রে, বুড়ি হইলাম তোর কারণে, নারীর কাছে কেউ যায় না এবং আমার ভাঁটি গাঙের নাইয়া গানগুলো উল্লেখযোগ্য।

ছবি: আবু সুফিয়ান জুয়েল