চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা পরিস্থিতিতে মানুষ কেন ঘরে থাকতে চাইছে না?

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায়, ‘আহারসংগ্রহ ও আত্মরক্ষা করিয়া বাঁচিয়া থাকিতে শিখিলেই পশুপাখির শেখা সম্পূর্ণ হয়; সে জীবলীলা সম্পন্ন করিবার জন্যই প্রস্তুত হয়। মানুষ শুধু জীব নহে, মানুষ সামাজিক জীব।’ বাঙালি হয়তো একটু বেশিই সামাজিক! এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি, পাশাপাশি বসে মনের ভাব প্রকাশ আর গসিপ-আড্ডা না দিলে পেটের ভাত যেনো হজমই হয় না। আর এই জীবনাচরণ করোনা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য বিশেষ উপযোগী, এ বিষয়ে দরকার সচেতন হয়ে কার্যকর সতর্কতা। না হলে জাতির সামনে হয়তো অপেক্ষা করছে বড় কোনো বিপদ!

করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে দেশে ২৬ মার্চ থেকে জরুরি ভিত্তিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। করোনার প্রাথমিক ও অন্যতম কার্যকর পন্থা হিসেবে দেশের সর্বস্তরের জনগণকে ঘরে থাকার পরিবেশ তৈরি করতেই সরকারের এই সময়োচিত পদক্ষেপ। প্রথম এক-দুইদিন জনগণ নিয়ম মেনে ঘরে থাকলেও ধীরে ধীরে বাড়ির বাইরে বের হতে শুরু করেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহলের মধ্যেও এদিক সেদিক করে অনেকটা স্বাভাবিকভাবে চলাচলের ঘটনা লক্ষ করা গেছে।

বিজ্ঞাপন

 নিয়মিত টহল দেবার পাশাপাশি বের হয়ে আসা মানুষদের ঘরে যেতে বলছেন সেনাসদস্যরা
নিয়মিত টহল দেবার পাশাপাশি বের হয়ে আসা মানুষদের ঘরে যেতে বলছেন সেনাসদস্যরা

বিজ্ঞাপন

ইউরোপ-আমেরিকার মানুষ তাদের বাল্যকাল থেকেই নানা নিয়ম আর আচারের মধ্যে বেড়ে উঠেছে, সেখানেও ‘সামাজিক দূরত্ব’ বিধি কার্যকর হয়েছিল। তারপরেও তারা সেখানে করোনাকে থামাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। চীন থেকে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি হলেও ইউরোপ-আমেরিকার মৃত্যু চীনের চেয়ে কয়েকগুণ ছাড়িয়ে গেছে অল্প সময়ে। আমেরিকার পরিস্থিতি এতই খারাপ যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, লকডাউনের সময় আরও প্রায় এক মাস বাড়ানো হলো এবং করোনা ভাইরাসের কারণে মৃতের সংখ্যা এক লাখের বেশি বাড়তে না দিলেই তার প্রশাসন ‘খুব ভালো কাজ করেছে’ বলে প্রমাণ হবে।

আমেরিকায় এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪৩ হাজারেরও বেশি মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং মারা গেছেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। সারাবিশ্বে এখন পর্যন্ত (৩০ মার্চ দুপুর) মোট আক্রান্ত ৭ লাখ ২৩ হাজার ৭৪০ জন আর মৃত্যু হয়েছে ৩৪ হাজার ১৮ জনের। সবচেয়ে বেশি ইটালিতে মৃত্যু হয়েছে ১০ হাজার ৭৭৯ জনের, যা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

তবে উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীনসহ কিছু দেশ সংক্রমণ ছড়ানো বন্ধ করে দ্রুত সেসব দেশে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হচ্ছে এখন পর্যন্ত। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক দূরত্ব, ঘরে থাকা, দ্রুত পরীক্ষা করে কোয়েরেন্টাইন নয়তো আইসোলেশন করার মতো কিছু সাধারণ নিয়ম শক্তহাতে কার্যকরের মাধ্যমে এগুলো করা সম্ভব হচ্ছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

এই যখন বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বাংলাদেশে আমরা কী করছি? ঘরে থাকার জন্য জরুরি ছুটি ঘোষণাকে আমরা আরেকটি উৎসবের ছুটি বানিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছি। আবার ছড়িয়ে পড়লেও ঘরে থাকার বদলে স্বাভাবিক জীবনযাপনের মতো নিয়ম ভেঙে বাইরে বের হবার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছি অহরহ।  এছাড়া অনেকে হয়তো অসচেতনতার কারণে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঝুঁকির বিষয়টি পাত্তা দিচ্ছে না।  এভাবে চলতে থাকলে করোনা নিয়ন্ত্রণ খুবই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে বলে বারবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে আইইডিসিআর থেকে সতর্ক করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এখন প্রশ্ন হলো, কেন মানুষ নিয়ম না মেনে বাইরে বের হয়ে আসছে? প্রথমেই হয়তো বাঙালির অতি সামাজিক গুণকে দায়ী করা যাবে।  বহুদিনের অভ্যাসের একঘুয়েমি কাটাতে হয়তো অনেকেই বের হয়ে যাচ্ছেন। এরপরে যে কারণ সামনে আসবে, তা হলো মানুষের জীবিকা ও নিত্য প্রয়োজন। ঘরে থাকতে বললেই অনেকের ঘরে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। রিক্সাচালক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র দোকানিসহ নানা প্রান্তিক ও দৈনিক কর্মভিত্তিক জনগণের জন্য আসলেই এটা সমস্যার।

করোনার প্রকোপের মধ্যে গ্রাম্যবাজারে মানুষের ভিড়
করোনার প্রকোপের মধ্যে গ্রাম্যবাজারে মানুষের ভিড়

ইউরোপ-আমেরিকাসহ পাশের দেশ ভারতেও ওইসব মানুষদের ‘ঘরে থাকা দিনগুলো’ বিষয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরণের কর্মসূচি খুবই কম। ২৬ তারিখ থেকে সব স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধের পর থেকেই নানা দূর্ভোগের খবর আসতে শুরু করে।

সেসময়গুলোতে ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের কিছু কিছু উদ্যোগ থাকলেও তা ছিল খুবই অপ্রতুল। তবে আশার কথা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার উদ্যোগে ৩০ মার্চ এক সার্কুলার জারি হয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাসহ বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস সংকটকালে দেশে কর্মহীন মানুষের অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করে ত্রাণ বিতরণ করতে হবে। গতকাল (২৯ মার্চ) রোববার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শাহ কামাল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সারাদেশে করোনাভাইরাসের কারণে শহর ও গ্রামে কর্মজীবী মানুষ কর্মহীন অবস্থায় আছে। যে সকল মানুষ কর্মহীন হয়ে খাদ্য সমস্যায় আছে প্রধানমন্ত্রী সে সকল কর্মহীন লোক (যেমন: ভিক্ষুক, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানগাড়ি চালক, পরিবহন শ্রমিক, রেস্টুরেন্ট শ্রমিক, ফেরিওয়ালা, চায়ের দোকানদার) যারা দৈনিক ভিত্তিতে সংসার চালায়, তাদের তালিকা প্রস্তুত করে খাদ্য সহায়তা প্রদানের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।

এই বিষয়গুলো আসলে কোনো জরুরি ঘোষণার আগেই সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে পরিকল্পনা উচিত ছিল। তাহলে হয়তো বাধ্য হয়ে নিরুপায় জনগণকে ঘরের বাইরে বের হতে হতো না। করোনা পরীক্ষার কিট ও চিকিৎসাকর্মীদের পিপিইসহ নানা সঙ্কটের কথাও আলোচিত হচ্ছে। এই অবস্থার মধ্যে এখন পর্যন্ত দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৪৯ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান কিছুদিন আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘করোনা মোকাবেলার একমাত্র অস্ত্র হচ্ছে, করোনা পরীক্ষা, করোনা পরীক্ষা এবং করোনা পরীক্ষা।’ অনেক দেশ এই পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন, তারা পরীক্ষা সামগ্রী আমদানি নয়তো প্রস্তুতের দিকে মনোযোগী হয়েছে। আমাদেরও উচিত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের বিষয়টি মাথায় রাখার পাশাপাশি করোনা পরীক্ষার কিটসহ যাবতীয় সরঞ্জাম সংগ্রহে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারিভাবে মনোযোগী হওয়া। তাহলেই হয়তো আমরা এই মহামারীর প্রকোপ থেকে নিজেদের বাঁচাতে সক্ষম হবো।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)