চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘করোনা, করোনা’ করতে করতেই সব করছে ‘করোনা’

চারদিকে একটিই শব্দ- করোনা! এতদিন পৃথিবীতে সবাই সবাইকে নিজ নিজ কাজ করার তাগিদ দিয়ে বলতো ‘করো করো’। আজ কী এক ঘোরলাগা পৃথিবীতে সবকিছু উল্টে গেলো। এখন সবাই বলছে ‘করোনা’। ‘করোনা করোনা’ করতেই যা করার সব ‘করছে’ সর্বগ্রাসী এক ভাইরাস। কী এক অদৃশ্য জীবাণু পুরো পৃথিবীকে স্থবির গলিত করে দিলো, তা বলা বাহুল্য। অথচ বেশ কিছু দিন আগেও পুরো পৃথিবী সরগরম ছিলো তার আপন চিত্তে। স্কুল-কলেজ এর ক্লাসরুম থাকতো চক-ডাস্টার আর লেকচারের শব্দে, ক্লাস শেষে বাজতো পিয়নের ঘণ্টার শব্দ, অফিস-আদালত তার নিজ নিজ শব্দে বিভোর, রাস্তায় ব্যস্ত পথিক আর যানবাহনের জোর হর্নের শব্দ। বাজারে ‘এই মাছ এই মাছ’ বলে হাঁক। খেলার মাঠে ‘ক্যাচটা ধর’ ‘বলটা দে’ শব্দ! চায়ের দোকানে কাপের ভেতর চামচ নাড়ানোর টুংটাং শব্দ থেকে শুরু করে মাথার ওপর বিমান উড়া; সবকিছুই স্থবির হয়ে গেলো।

কারণ, এক ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর অদৃশ্য শত্রু এসবের পেছনে তার কলকাঠি নেড়ে চলেছে। অবাক পৃথিবী স্থবির হয়ে আছে। যেন মরার আগে আইসিইউতে পড়ে আছে। মাঝে মধ্যে নড়ছে, পালস পড়ছে হালকা। দমবন্ধ পরিবেশ।

বিজ্ঞাপন

তবে এসব স্থবিরতার মধ্যেও আছে অনেক নতুনত্ব ও সৃজনশীলতা। দেখা মিলছে চিরচেনা অনেক নিয়মকে ভেঙেচুরে নতুন আকার দিতে। যেমন: ভাইরাসের আতংক আসার পূর্বে আমরা যারা ব্যাগ প্যাক নিয়ে ক্লাসে, অফিসে, ভ্রমণে বা নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে বের হতাম; তারা আজ সবাই ঘরে বসে আছি৷ বন্ধু, কলিগরা মিলে টংয়ের দোকানে বা রেস্টুরেন্টের যে জম্পেশ আড্ডা সেটি এখন সাড়ে ৫ ইঞ্চির মোবাইল কিংবা ল্যাপটপের স্ক্রিনের ভেতর দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় দিচ্ছি। সারা পৃথিবীর এই কারফিউর মতো পরিস্থিতিতে সোশ্যাল মিডিয়া এবার অনেক বেশি ভূমিকা রাখছে। কারফিউ নয় যেন- কেয়ার ফর ইউ! সবাই মিলেই অদ্ভুত ব্যাপার ঘটিয়ে চলেছে। একে অন্যকে হাত ধোঁয়ার ভিডিও চ্যালেঞ্জ করছে। কেউ আনুশকা শর্মার শাড়ি পড়া বা অন্য কারো একটি বিশেষ পোজ দিয়ে তোলা ছবি পোস্ট করে বলছে, যদি এতে ১০ হাজার কমেন্ট পড়ে তাহলে এরকম পোজে সেও তার নিজের ছবি পোস্ট করবে৷ অনেকে ছবি, ভিডিও মিম বানিয়ে শেয়ার করছে। অনেকে মুভি দেখে তা অন্য কয়েকজনকে দেখার চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে, অনেকে বই পড়ার চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে। কিছু স্কুল-কলেজ অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে। অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গরিব দুস্থদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছে। ঘরবন্দী মানুষেরা কোনো না কোনোভাবে সময়টাকে কাটাচ্ছেন। ইতালিতে নিজ নিজ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সকলে গান গাইছেন, নির্দিষ্ট সময়ে হাত তালি দিচ্ছে। আর এগুলো করছেন দেশের মানুষ যাতে ভেঙে না পড়ে। ল্যাটিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘মার্কেডো লিভ্রে’ তাদের হাত মেলানোর লোগোটাকে কনুই মেলানোতে পরিবর্তন করেছে। সেন ফ্রান্সিসকোর ‘ক্রাইম’ নামের একটি এজেন্সিও তাদের হ্যান্ড শেইকের লোগো পরিবর্তন করেন। ম্যাকডোনাল্ড তার এম কে আলাদা করেছেন, নাইকি লিখেছে “প্লে ইনসসাইড, পেল ফর দ্যা ওয়ার্ল্ড।” হার্শে তাদের সুপরিচিত হার্শে কিসে উল্লেখ করেছেন “স্প্রেড লাভ ফ্রম ডিসটেন্স”, অডি তার চারটি বৃত্তকে আলাদা করেছে। লাইফবয় তাদের প্রতিযোগী সাবান প্রতিষ্ঠানগুনোর সাবান ব্যবহার করার প্রচারণাও করেছে। কোকাকোলার মতো আরো অনেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের নিজেদের লোগো পরিবর্তন করেছে সামাজিক দুরত্বকে ফুটিয়ে তুলতে। সবাই যার যার অবস্থান থেকে ভিন্ন ভিন্ন ধরণের বার্তা কিন্তু একটাই স্লোগান (ভালো থাকতে হবে সবাইকে) দিচ্ছে তা হলো পরিবর্তনের।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা বিষয়ক অনলাইন মাধ্যমগুলো তারা ফ্রি কোর্স চালু করেছে সাবস্ক্রিপশন ফি ছাড়া। পোশাক কারখানাগুলো তাদের পণ্য প্রস্তুত বন্ধ করে ডাক্তার,স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য সুরক্ষা পোশাক তৈরি করছে এবং তা বিনামূল্যে বিতরণও করছে। এলকোহোল কোম্পানিগুলোও হ্যান্ড স্যানিটাইজারা প্রস্তুত করছে। গ্রামীণফোন দেশের কয়েকজন সঙ্গীত শিল্পীকে নিয়ে প্রত্যেকের নিজ নিজ ঘর থেকে ভিডিও ধারণ করে গান প্রযোজনা করেছে। বিদ্যানন্দ, জাগো ফাউন্ডেশনের মতো অসংখ্য সেচ্ছাসেবী সংগঠন এ দুর্যোগ সময়ে এগিয়ে এসেছে। সংবাদপত্র কিংবা সম্প্রচার মাধ্যমগুলোও তাদের পেইজ মেকাপ, অনুষ্ঠানগুলোতে এনেছে ভিন্নতা। ২৮শে মার্চ দেশের পত্রিকা সমকাল তাদের নেমপ্লেটের প্রতিটি বর্নের মাঝখানে জায়গা খালি রেখে বিশেষ কিছু তথ্য দিয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সংবাদ প্রতিদিনও তাদের নামফলকে পরিবর্তন এনেছে।

বিজ্ঞাপন

মানুষের সাথে সাথে প্রকৃতি, প্রাণীকূলের জীবনযাত্রায়ও এসেছে অন্য এক রুপ যা বিশ্ববাসী কয়েক দশকে দেখেছে বলে মনে হয় না। দ্যা গার্ডিয়ানে প্রকাশিত (২৩শে মার্চ), ইএসএর সেন্টিনেল -৫ পি স্যাটেলাইটে দেখা গেছে যে গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে, এশিয়া ও ইউরোপের শহর ও শিল্পগোষ্ঠীগুলিতে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের (এনও টু) মাত্রা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। জাপান, ইতালি, থাইল্যান্ডের শহরের রাস্তায় হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতেও দল বেঁধে ডলফিনের বিরল মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখেছে দেশ। তবে এতসব কিছুর মধ্যে কিছু অনিয়মও হচ্ছে।

সুরক্ষাজনক মেডিসিন, খাবার সামগ্রীর অতি চাহিদার ফলে আকষ্মিকভাবে পন্যের দাম বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত মজুদ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। এটিকে পুঁজি করে মিথ্যা সংবাদ প্রচার, স্ক্যাম ছড়িয়ে দিচ্ছে অনেকেই। অনেক হাসপাতালে জ্বর-সর্দির রোগীদের চিকিৎসা দিতে অনীহা প্রকাশ করছে। তবে সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে ভালোর দিকেই পাল্লাটা ভারী করে তুলেছে এই করোনাকালীন সময়।

বিখ্যাত সুফি সাধক জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন ‘তোমার হৃদয়ে যদি আলো থাকে, তাহলে ঘরে ফেরার পথ তুমি অবশ্যই খুঁজে পাবে।’ সেই হৃদয়ের আলো নিয়েই আজ পৃথিবীবাসী ব্রত হয়েছে এই অদৃশ্যের সাথে লড়াই করতে। একটি প্রবল মানসিক শক্তি নিয়েই তারা লড়ছে। আর এই লড়াই শেষে মানুষ জিতবে এই আশা সকলের। কারণ, চারদিকে একটিই শব্দ- করোনা! এতদিন পৃথিবীতে সবাই সবাইকে নিজ নিজ কাজ করার তাগিদ দিয়ে বলতো ‘করো করো’। আজ কী এক ঘোরলাগা পৃথিবীতে সবকিছু উল্টে গেলো। আজ শুধু একটিই শব্দ- ‘করোনা করোনা’!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)