চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনায় সামাজিক বাস্তবতা

প্রসঙ্গক্রমে একজন মহিলা গার্মেন্টস শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলি, করোনার ভয়াবহতা ও সামগ্রিকতা বিবেচনায় বিশেষ করে পরিবারের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুতে হলেও কিছুদিনের জন্য গার্মেন্টসে যাওয়া বন্ধ রাখার জন্য অনুরোধ করি। প্রতিউত্তরে তিনি বলেন; জান, জীবন ত্যাগ দিয়েই নেমেছি; করোনা আসলে আসুক তবুও গার্মেন্টসে যাওয়া বন্ধ করবো না। অর্থাৎ তাঁর কাছে জীবিকাই মুখ্য, জীবন সেখানে গৌণ কিন্তু এ কথাটি একবারের জন্যও ভাবেনি যে জীবন বিপন্ন হলে অর্থ দিয়ে কি হবে? পাশাপাশি তাঁর কারণেই পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবনও আশঙ্কার মধ্যে পড়বে সে বিষয়টি বেমালুম ভুলে গার্মেন্টসে নিয়মিত আসা যাওয়া করে। উল্লেখ্য যে, উক্ত পরিবারটি কৃষিভিত্তিক পরিবার এবং কয়েকমাস লকডাউন থাকলেও মোটামুটিভাবে সংসার চালিয়ে নিতে পারবে। তারপরেও করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে উক্ত পরিবারটির উদাসীনতা করোনার সামাজিক বাস্তবতা ও বাংলাদেশে করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে গ্রহণীয় পদক্ষেপগুলোর সার্বিক দিক তুলে ধরতে সক্ষম।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের অনুরোধ স্বত্ত্বেও ঈদের পূর্বে মফস্বল (ঢাকার বাইরে) এলাকায় কিছু কারখানা চালু ছিল এবং সেখানে শ্রমিকরা কাজে অংশগ্রহণ করেছে। এখনো বলা হয়, স্বাস্থ্য বিধি মেনে গার্মেন্টসে শ্রমিকেরা আসা যাওয়া করছে কিন্তু সেটা কতটুকু সত্য কিংবা সঠিকভাবে স্বাস্থ্য বিধি মানা হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে কিন্তু কেউই পরিষ্কার অবস্থান গ্রহণ করবে না। কেননা গার্মেন্টস শ্রমিক গার্মেন্টসে আসা যাওয়ার পথে অনেকের সঙ্গেই দেখাশোনা, কথাবার্তা হচ্ছে এবং বাড়ির অনেকের সঙ্গে উঠাবসার কারণেই গার্মেন্টস শ্রমিকের মাধ্যমে কিন্তু গার্মেন্টসের অন্যান্য শ্রমিকেরা করোনা মহামারীতে সংক্রমিত হতে পারে। সুনির্দিষ্ট এলাকাগুলো গার্মেন্টস শ্রমিকদের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত যানবাহনগুলোকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হচ্ছে, বিশেষ করে যে সব জায়গায় করোনায় আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত হয়েছে সেখান হতেও শ্রমিকেরা কারখানায় অফিস করা অব্যাহত রেখেছে। কাজেই প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই করোনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে উদাসীনতা ও শিথিলতা লক্ষ্য করা যায় এবং সেটির ভয়াবহ পরিণতি সকলকেই বহন করতে হচ্ছে এবং হবে।

বিজ্ঞাপন

মৃত্যু অনিবার্য, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, মৃত্যুর হাত থেকে কারোর কোন রেহাই নেই, জগতের সকল প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে-এ অমোঘ সত্য প্রত্যেক সৃষ্টিকূলের জন্য প্রযোজ্য। মৃত্যুকে ভয় পায় না এমন মানুষ পৃথিবীতে একজনও খোঁজে পাওয়া যাবে না। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, মৃত্যু ভয় জেনেও আমরা কেন খারাপ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছি? কারণ হলো, মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ জানা নাই আমাদের, অনেকেই মনে করে পরিণত কিংবা বার্ধক্যে উপনীত হলে মৃত্যুর উপলব্ধি খারাপ কাজ থেকে মানুষকে কিছুটা হলেও নিবৃত করার উপলক্ষ্য মাত্র। কিন্তু বর্তমানে করোনা মহামারীতে চোখের সামনে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু বিবেকের তাড়নাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না আমাদের, বিষয়টি অত্যন্ত পীড়াদায়ক ও সকলের জন্যই বেদনাদায়ক। করোনার শিক্ষা আমাদেরকে প্রতিনিয়ত মানবিক, সামাজিক, ধার্মিক, পরোপকারী অর্থাৎ আদর্শ সমাজের যে চরিত্র বিরাজ করার কথা সেদিকে ধাবমান হতে উদ্বুদ্ধ করবে। কিন্তু আসলেই কি করোনার সে শিক্ষা আমরা আমাদের সমাজে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি? করোনার মধ্যেও আমরা কিন্তু হরিলুটের চিত্র দেখেছি, দেখেছি ধর্ষণের চিত্র, ঠিক তেমনিভাবে দেখেছি হতাশায় পর্যদুস্ত হয়ে আত্নহত্যার চিত্রও।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে এবং সরকার কিন্তু কমিউনিটির সুরক্ষার্থে রেড জোন চিহ্নিত করে উক্ত এলাকাটিতে লকডাউন ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতি অনুকূলে রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সরকার যতই লকডাউন কার্যকর করতে উদ্বুদ্ধ হোক না কেন সেটি কখনোই আলোর ‍মুখ দেখবে না যতক্ষণ না পর্যন্ত কমিউনিটির প্রত্যেকটি মানুষ স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলাফেরা করবে এবং ঘরে থাকার অভ্যাসকে আয়ত্বে আনতে বদ্ধপরিকর হবে। কমিউনিটিতে যারা বিত্তশালী তাঁদের উচিত হবে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের সহায়তায় এগিয়ে এসে করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে যথার্থ ভূমিকা পালন করার। কারণ, সংকট যেভাবে ঘনীভূত হচ্ছে সেটিকে সঠিকভাবে দমন করতে ব্যর্থ হলে কেউই আমরা করোনার ভয়াল থাবার বাইরে নয়। এলাকার বাইরে থেকে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া যেমন কেউ প্রবেশ করতে পারবে না আবার কমিউনিটি থেকে কাউকে বের হতে দেওয়া হবে না মর্মে লকডাউনের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ডাক্তার সমাজ, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের ক্ষেত্রে মাস্ক ব্যবহারের কারণ ও মাস্ক ব্যবহার না করার অপকার দিকসমূহ সম্বন্ধে জানার পরেও এখনো মাস্ক ছাড়াই বাজার ঘাটে ভিড় করছে মানুষ। করোনা ভাইরাস সংক্রমনের শুরুর দিকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে মানুষকে সচেতন ও স্বাস্থ্য বিধি মানানোর ক্ষেত্রে পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা অনেকটাই ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে। প্রকৃত অর্থে জনগণ নিজে সচেতন না হলে জোর জবরদস্তি করে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো প্রায় অসম্ভব। শারীরিক দূরত্ব, সামাজিক দূরত্ব এই স্লোগানগুলোর ব্যবহারও তেমন দেখা যায় না, উপাসনালয়ে স্বাস্থ্য বিধি মানা হচ্ছে না, হাট-বাজারে পর্যাপ্ত দূরত্ব রেখে কেউই দোকান বসানোর কাজটি আর করছে না। অর্থাৎ আমরা একটি ভয়াবহ ও শোচনীয় অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছি কেননা করোনার ভ্যাকসিন না আসার পূর্ব পর্যন্ত প্রতিরোধের দিকে খুব বেশি নজর দিতে হবে। কারণ, ভ্যাকসিন আসার পরে সংক্রমিত হয়ে গেলেও প্রতিকার করা সম্ভব হবে কিন্তু বর্তমানে সেটি প্রায় অসম্ভব।

প্রকৃত কথা হলো, সমাজকে ঢেলে সাজাতে হবে-কিংবা ঢেলে সাজানোর জন্য সমাজ সংস্কারে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কেননা, প্রকৃতির উপর আমরা যে পরিমাণ অত্যাচার করেছি প্রকৃতি সেটা সুদে আসলে পরিশোধ করার চেষ্টা করছে এবং ফলশ্রুতিতে মানবজীবন অনেকটা শঙ্কটাপন্ন। তদুপরি প্রকৃতির শিক্ষা থেকে আমরা নিজেরা পরিবর্তিত হতে পারছি না-পারছি না নতুন করে সমাজ বিনির্মাণে উদ্যোগ গ্রহণে ভূমিকা রাখতে। করোনা পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থায় নানা রকমের বিপত্তি, অভাব-অনটন, অপরাধ সর্বোপরী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির আশংকা পোষণ করেছেন বিশেষজ্ঞরা, সে শ্বাপদসংকুল পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করে সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন এবং সেখানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে। বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে পারস্পারিক বিদ্বেষ, হিংসা, ক্লেশ, পরনিন্দা, পরচর্চার নমুনায়ন এখনো প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে। করোনার প্রভাবে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন অবস্থা ধারণ করার সময় উল্লেখিত বিষয়গুলো যদি সমাজে বিদ্যমান থাকে তাহলে সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ হিসেবে কাজ করবে। কাজেই, জনপ্রতিনিধি ও নীতি নির্ধারকদের সার্বিক দিক বিবেচনা করে পলিসি প্রণয়ন ও বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থের সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকল্পে নিরপেক্ষভাবে কাজ করে যেতে হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)