চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ: কীভাবে সচল রাখা যাবে অর্থনীতির চাকা?

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে

মহামারী করোনাভাইরাসের প্রথম পর্যায়ের আক্রমণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের অর্থনীতিও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে। নতুন করে দরিদ্রের তালিকায় নাম লিখেয়েছে বহু অসহায় মানুষ। এর মধ্যে আবারো শুরু হয়েছে করোনার দ্বিতীয় পর্যায়ের ঢেউ। এতে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা।

এমতাবস্থায় করোনার দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণের আঘাত কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে? শিল্প-কারখানায় কিভাবে উৎপাদন সচল রাখতে হবে? রপ্তানি অব্যাহত রাখতে কী কী উদ্যোগ হবে? তথা সার্বিকভাবে অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখতে করণীয় কী? এসব বিষয়ে চ্যানেল আই অনলাইন জানতে চেয়েছে কয়েকজন শীর্ষ অর্থনীতিবিদের কাছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

তারা বলছেন, বিশ্বব্যাপী করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার অনেক পরে বাংলাদেশে আক্রান্ত শুরু হয়েছে। শীত চলে যাওয়ার পর প্রকোপ শুরু হওয়ায় তুলনামূলক ক্ষতি কম হয়েছে। কিন্তু এবার শীতের শুরুতেই দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। এই ঢেউ মোকাবেলা করা কিছুটা কঠিন হবে। কারণ দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকোপ দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে।

তবে কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপ নিলে বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তারা।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিশ্ব অর্থনীতি লন্ডভন্ড হতে পারে এমন পূর্বাভাষ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ)। সম্প্রতি জি-২০ গোষ্ঠীর দেশগুলোর ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে সংস্থাটি বলেছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে আবার অর্থনীতির চাকা ভেঙ্গে পড়তে পারে। গত জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের জিডিপি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বাড়লেও সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে আবারও স্থবির হয়ে যেতে পারে বিশ্ব অর্থনীতি। ফলে এ বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।

বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে এর ধাক্কা পের পাওয়া গেছে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি আয়ের খাত তৈরি পোশাক শিল্পে।

পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ থেকে জানা গেছে, করোনার দ্বিতীয় সংক্রমণের ঢেউয়ের ধাক্কায় গত অক্টোবরে পণ্য রপ্তানি কম হয়েছে ৪ শতাংশ। নভেম্বরে রপ্তানি পরিস্থিতি আরও খারাপ। গত ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি কম হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ। কমছে রপ্তানি আদেশও।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, রপ্তানিখাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সবচেয়ে বেশি। দেশের প্রধান রপ্তানির গন্তব্যস্থল হচ্ছে আমেরিকা ও ইউরোপের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো। কিন্তু এসব দেশে করোনার প্রকোপ বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। তারা আবার লকডাউনে গেছে। কোনো কোনো দেশে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। ফলে সেসব দেশে মানুষের চলাচল সীমিত হয়ে গেছে। এতে শ্লথ হয়ে গেছে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। এ কারণে তাদের চাহিদা কমে গেছে। আর চাহিদা কমলে আমদানিও কমে যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যাচ্ছে।

ড. নাজনীন আরও বলেন, রপ্তানি কমে যাওয়া মানে হলো উৎপাদন কমে যাওয়া। কর্মসংস্থান কমে যাওয়া। এতে এক ধরনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দিবে। ইতিমধ্যে তৈরি পোশাক কারখানার মালিকেরাও সে ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তিনি বলেন, গত বছর হঠাৎ করে বায়াররা (আন্তর্জাতিক ক্রেতা) আমদানি ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত করেছে। কোনো কোনো বায়ার সময়মত পণ্যের দাম পরিশোধ করেনি। এবারও রপ্তানি আদেশ কমতে পারে। তাই এবার সেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

“করোনা সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রায় এক হাজার ৮শ ছোটবড় কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারেনি তাদের অনেকেই। এ কারণে চাকরি হারাতে হয়েছে হাজার হাজার শ্রমিককে। অনেকেই এখনও কর্মসংস্থান ফিরে পাননি। ভুগছেন অর্থনৈতিক সংকটে। এখন আবার সেই একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”

তিনি বলেন, এ ধরনের শ্রমজীবী মানুষদের কথা আগে থেকেই বিবেচনা করতে হবে। এছাড়া নতুন করে আবারও কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেলে পরিস্থিতি হবে আরো খারাপ।

গতবার সময়পোযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল তা ব্যবসায়ীদের মনে আশা যুগিয়েছে উল্লেখ করে এই গবেষক বলেন, তবে বাস্তবতা হলো- অতিক্ষুদ্র বা অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ীরা এই প্যাকেজ থেকে এখনো ঋণ পায়নি। অর্থাৎ ব্যবসার জন্য যাদের ১৫, ২০ বা ৩০ হাজার টাকা ঋণ দরকার তারা কিন্তু পায়নি। তাদের হয়তো বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য সহায়তা করা হয়েছে। কিন্তু জীবিকার ব্যবস্থা করা হয়নি। তাই করোনার চলমান দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংকটে যেন প্রান্তিক মানুষদের কাছে পৌঁছানো যায়, তাদের সহা্য়তা করা যায় সেদিকে নজর রাখতে হবে। এবারের প্রণোদনার কেন্দ্র বিন্দুতে তাদের রাখতেই হবে।

তিনি বলেন, যেহেতু প্রান্তিক মানুষের ঋণের চাহিদার পরিমাণ কম। তাই ব্যাংকগুলো হয়তো ঋণ দিতে চাইবে না। এক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংক, বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন পল্লী সঞ্চয়ব্যাংক, একটি বাড়ি একটি খামার পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও এনজিওগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখার বিষয়ে নাজনীন আহমেদ বলেন, খাদ্যের মৌসুম আসবে এপ্রিল-মে’তে। সেসময় হয়তো করোনা সংকট আরো বেশি থাকবে। তখন মানুষের কর্মকান্ড কমে যেতে পারে। সীমিত হতে পারে যান চলাচল। এই পরিস্থিতিতে খাদ্যের সংকট বা উচ্চ মূল্য দেখা দিতে পারে। তাই আগে থেকেই খাদ্যের সরবরাহ ‍ও ফসল উৎপাদন সচল রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় ধাক্কা সামলাতে হবে।

তবে মাস্ক ব্যবহারে বাধতামূলক করার পাশাপাশি জনসাধারণকে সরকারিভাবে মাস্ক বিতরণ করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ওয়ানটাইম মাস্ক না দিয়ে কাপড়ের তৈরি মাস্ক দেয়া জরুরি। এতে নিম্ন আয়ের মানুষেরা ধুরে বার বার একই মাস্ক বেশি সময় ধরে ব্যবহার করতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রকোপ আমাদের দুই ভাবে ক্ষতি করতে পারে বলেন মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, এর একটি হলো- বর্হিবিশ্বের করোনা পরিস্থিতি। অন্যটি হলো- দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। আমাদের রপ্তানি আয়ের প্রধান দেশগুলোতে যদি পণ্যের চাহিদা কমে যায়, সেক্ষেত্রে রপ্তানিতে ধস নামতে পারে। ইতিমধ্যে ইউরোপের কয়েকটি দেশে লকডাউন শুরু হয়ে গেছে। সেসব দেশে রপ্তানি কমে যাবে।

তিনি আরও বলেন, আর দেশের অভ্যন্তরে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে মানুষের মধ্যেও সচেতনতা কমে গেছে। এতে হয়তো বাংলাদেশকেও বিভিন্ন বিধি নিষেধ আরোপ করতে হবে। কলকারখানা সাময়িক বন্ধ রাখা লাগতে পারে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে হয়তো লকডাউনের মত সিদ্ধান্তও নেয়া লাগতে পারে। তখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান কমে যাবে। দরিদ্রের হার বাড়বে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে অবশ্যই স্থবিরতা দেখা দিবে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, করোনার প্রথম ধাক্কায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত আমাদেরও অনেক ক্ষতি হয়েছে। সেটা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারো আরেকটি ধাক্কা আসছে। এটা অবশ্যই কৌশলে দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা করতে হবে।

তিনি বলেন, যেসব দেশে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি করে সেই দেশগুলোকে করোনা লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। দূর্বল করে দিচ্ছে তাদের অর্থনীতিকে। এ কারণে তাদের চাহিদা অনেকাংশে কমছে। দেশের অভ্যন্তরেও নানা কারণে অর্থনীতি থমকে যাচ্ছে। সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে (যেমন- সেলুন, হোটেল) কাজকাম কমে যাচ্ছে। তাদের আয় রোজগার হুমকির মুখে রয়েছে।

ভ্যাক্সিন কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি উল্লেখ করে সেলিম রায়হান বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো ভ্যাক্সিন কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করে ফেলছে। বাংলাদেশ যেন দ্রুত ভ্যাক্সিন পায় সেই লক্ষ্যে কূটনৈতিকভাবে যোগাযোগ বাড়াতে হবে।

এছাড়া ভ্যাক্সিন আনার পর তা সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বণ্টণের বিষয়গুলো কিভাবে পরিচালনা করা হবে সে বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রান্তিক মানুষের জন্য ভ্যাক্সিন নিশ্চিত করাসহ স্বজনপ্রীতি এড়ানোর জন্য সরকারকে আগেই বন্টণ প্রক্রিয়ার ব্যবস্থাপনা প্রস্তুত রাখতে হবে।

প্রণোদনা প্যাকেজের বিষয়ে তিনি বলেন, এই ঋণ যথাসময়ে যথাযথ ব্যক্তির কাছে পৌঁছাতে হবে। এই অর্থ যাতে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করে পুনরায় ব্যবসা পরিচালনা করা যায় সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে অর্থনীতির খুব ক্ষতি হবে বলে মনে করেন না বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

তিনি বলেন, প্রথম দফায়ও বাংলাদেশ করোনার প্রকোপের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করেছে। মানুষও এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। অনেকের ভয় কেটে গেছে। কেউ জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিকে নিজের সাথে মানিয়ে নিয়েছে।

এখনও সেইভাবেই এগুতে হবে। তবে সংক্রমণ যাতে কম হয় সেই উদ্যোগ নিতে হবে। ঝুঁকি নিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সচল রাখতে হলে জনগণকে আর্থিক সহায়তা দেয়ার মত সক্ষমতা সরকারের কম। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আনতে হবে।

ঝুঁকির মাত্রা সীমিত রেখে যেভাবে অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখা যায় সেদিকে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে ড. গোলাম মোয়াজ্জেম। বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজ পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। বিভিন্ন খাতে যে অর্থ ঋণ হিসাবে বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে তা গ্রাহকের কাছে পৌঁছায়নি। এর যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি।

পোশাক খাত বিষয়ে তিনি বলেন, আন্তার্জাতিক ব্র্যান্ড ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে ক্রয়াদেশ ঠিক রাখতে হবে। সরকার কূটনৈতিকভাবে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিলে তা সফল হতে পারে। বায়রদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে।

এছাড়া কারখানায় উৎপাদনের পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়ে তাগিদ দেন তিনি।