চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনার কারণে ঘরে ঢুকতে দেয়নি স্ত্রী-সন্তানরা!

করোনাভাইরাসের লক্ষণ ও উপসর্গ নিয়ে বাড়ি ফেরায় একজন গার্মেন্টস কর্মীকে ঘরে ঢুকতে দেননি তার স্ত্রী-সন্তানরা। বাধ্য হয়ে আশ্রয় নেন বোনের বাড়িতে। গত ৬ মে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এই ব্যক্তির নাম নজরুল ইসলাম (৫৫), বাড়ি দাউদকান্দি উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের মুদাফর্দি গ্রামে।

ওদিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় এক করোনা রোগীকে বাসা থেকে মারধর করে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাড়ির মালিকসহ এলাকার কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ৬ মে রাত সাড়ে এগারটার দিকে উপজেলার রূপসী বাগবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী তরুণ রূপসী বাগবাড়ি এলাকার নূর হোসেনের বাড়ির ভাড়াটিয়া। তিনি সিটি গ্রুপে চাকরি করেন।

বিজ্ঞাপন

গত ৩ মে উপজেলার স্বাস্থ্য বিভাগে নমুনা দিয়ে আসে। রিপোর্টে তার করোনা পজিটিভ আসে। চিকিৎসকের পরামর্শে সে বাসাতেই ছিল। কিন্তু বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বাড়ির মালিকসহ এলাকার কিছু লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে এসে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। বিষয়টি সে চিকিৎসককে জানায়। পরে ওই ডাক্তার বিষয়টি স্থানীয় পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে জানায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাকে উদ্ধার করে ওই বাড়িতে রেখে আসে।

বিজ্ঞাপন

উল্লিখিত ঘটনা দুটো বিশাল বরফখণ্ডের সামান্য দৃশ্যমান অংশ মাত্র। এমন ঘটনা দেশের বিভিন্ন স্থানে অহরহই ঘটছে। সাধারণ রোগী তো বটেই, ডাক্তার নার্সদের পর্যন্ত আক্রমণ করা হচ্ছে। নির্দয় আচরণ করা হচ্ছে। মানুষ এমন অমানবিক আচরণ কেন করছে? সে কি কেবলই ভয়? সচেতনতার অভাব? নাকি সঠিক তথ্যের অভাব? নাকি বহুযুগ লালিত অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার?

আমাদের দেশের মানুষ যে করোনা নিয়ে খুব বেশি আতঙ্কিত, ভীত, সেটাও কিন্তু বলা যাবে না। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, সমাবেশ এড়িয়ে চলা- এসব ব্যাপারে খুব অল্পসংখ্যক মানুষকেই নিয়মনিষ্ঠ হতে দেখা যায়। বেশিরভাগ মানুষই স্বাস্থ্যবিধি মানে না। কিন্তু তারা যদি খবর পায় যে, কেউ করোনা আক্রান্ত হয়েছে কিংবা করোনার চিকিৎসা করছে, তাহলে ঠিকই গর্জে ওঠে। সেই ব্যক্তিকে কীভাবে ঘর ছাড়া, বাড়ি ছাড়া এমনকি গ্রাম ছাড়া করা যায়, সেই চেষ্টার কোনো ত্রুটি থাকে না। অনেকে করোনা আক্রান্তদের প্রতি এতটাই উগ্র যে পারলে তাদের দুনিয়া ছাড়া করে। এ আমাদের দেশের মানুষের এক আশ্চর্য মানসিকতা! এত এত সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টিভি, সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব সবখানে গত প্রায় তিন মাস ধরে সারাক্ষণ ‘করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হবেন না, সতর্ক ও সচেতন হোন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন’ এই কথাটা অসংখ্যবার বলার পরও মানুষ কেন এমন হিংস্র অমানবিক আচরণ করছে? তাহলে কি যা বলা হচ্ছে তা মানুষ শুনছে না? বিশ্বাস করছে না? এ ব্যাপারে তাহলে করণীয় কী?

খ্রিস্টীয় কালপঞ্জি অনুযায়ী আমরা এখন ২০২০ সালে আছি! কিন্তু আমাদের মন-মানসিকতা সেই বাইবেলে বর্ণিত সময়েই যেন আটকে রয়েছে। সাড়ে তিন হাজার বছর আগের মতোই সংক্রামক অসুখে আক্রান্ত রোগীকে অস্পৃশ্য ভাবা, তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করার ঘৃণ্য আচরণ থেকে আমরা খুব একটা সরে এসেছি বলে মনে হয় না। একচুল সরিনি! প্রাচীন বাইবেলীয় আইন অনুযায়ী কুষ্ঠরোগীর সমাজ-সংসার ত্যাগ করাই ছিল নিয়ম। কুষ্ঠকে বলা হতো ব্যক্তিবিশেষের কৃতকর্মের ফল এবং সেই জন্য ঈশ্বরের দেওয়া কঠিন শাস্তি। রোগীকে জনপদের বাইরে, নির্জন এলাকায় চলে যাওয়ার আদেশ দিতেন যাজক। চিকিৎসা, খাদ্য, জলের অভাবে তিলে তিলে চরমতম যন্ত্রণা সহ্য করে মারা যেতেন। মিথ অনুযায়ী, এই ভ্রান্ত অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে, কঠোর আইন ও নিয়মকে অগ্রাহ্য করে এক মুমূর্ষু কুষ্ঠ রোগীকে শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তুলেছিলেন ঈশ্বরের সন্তান যীশু!

আগেকার দিনে ইসরাইলিরা যেমন কুষ্ঠরোগীকে পাপী ভেবে অস্পৃশ্য করে রাখত, তেমনই ব্ল্যাক ডেথ-এর মহামারীর সময়ে পানি সংক্রমণের অভিযোগে ইহুদিদের গণহত্যার শিকার হতে হয়েছিল স্রেফ সন্দেহের বশে। সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় এমন সব জঘন্য অপরাধের অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে, আমেরিকায় ‘ইয়েলো ফিভার’ বা পীতজ্বরের মহামারীর সময়ে দেশের দক্ষিণ অংশে অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতিও একই আচরণ করা হয়েছিল। আফ্রিকায় এইচআইভি সংক্রমণ, যক্ষ্মা এবং কলেরার রোগীদেরও একইভাবে অস্পৃশ্য হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

বিজ্ঞাপন

অস্পৃশ্যতার অভিশাপ থেকে ভারতবর্ষও মুক্ত ছিল না। চৈতন্যদেব সামাজিক বয়কটের শিকার এক কুষ্ঠরোগীকে সারিয়ে তুলেছিলেন স্পর্শের মাধ্যমেই। সেই ঘটনার পরে পাঁচশো বছর কেটে গিয়েছে! অথচ এখনও বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্তকে অবৈজ্ঞানিকভাবে কলঙ্কিত করার কুঅভ্যেস বহাল রয়েছে। এই ২০২০ সালেও যখন আমরা চাঁদে উপগ্রহ পাঠাচ্ছি, তখনও কুষ্ঠ, যক্ষ্মা, এইচআইভি, এসটিডি’তে আক্রান্তদের ঘৃণ্য এবং অস্পৃশ্য হিসেবে চিহ্নিত করার নারকীয় ট্র্যাডিশন সমানে চলছে!

এই রীতির প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। রোগী সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়ে লুকিয়ে রাখছেন অসুখ! বিশেষত গ্রামেগঞ্জে এই প্রবণতা বেশি করে চোখে পড়ে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও। পরিজন এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়, ঘৃণিত হওয়ার ভয়, অস্পৃশ্য হিসেবে নিগৃহীত হওয়ার ভয় ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে করোনা সংক্রমিতের রোগ লুকোনোর প্রবণতা। দেশের নানা প্রান্তে করোনা আক্রান্তের প্রতি এই নির্দয় আচরণ দেশকে এক ভয়বাহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ইতিহাস সাক্ষী প্রতিটি দেশে, প্রতিটি শতকে এই ধরনের সামাজিক বয়কট, অস্পৃশ্য হিসেবে চিহ্নিতকরণ, মহামারীর পাশাপাশি সমান্তরাল ক্ষতি করেছে সাধারণ মানুষের। এই ধরনের অমানবিক প্রথার প্রথম বড় ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া হলো, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবল চূর্ণ হওয়া। মনে রাখতে হবে চিকিৎসক ও নার্স নিজের এবং তার পরিবারের সদস্যদের সংক্রামিত হওয়ার আশঙ্কা নিয়েই করোনার বিরুদ্ধে লড়ছেন। তারা যদি আর রোগী দেখতে না চান তখন কী হবে?

এই সামাজিক ঘৃণার উপসর্গ দেখা দিলে রোগীও চাইবেন অসুখ লুকিয়ে রাখতে। কারণ তার মনের ভিতর ভয় ঢুকে গিয়েছে, একবার রোগী হিসেবে সন্দেহের আওতায় চলে এলে তাকে ও তার পরিবারকে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। নিজের ঘরের স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে দীর্ঘ কোয়ারেন্টাইনের মেয়াদ শেষ করে ফিরে আসার পরেও বহু পরিবারকে একঘরে করে রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে সমাজে। ফলে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এমন রোগী থেকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অসুখ। ক্রমাগত জটিলতর হচ্ছে মহামারী।

মনে রাখতে হবে যে, এখনও এই মহামারীর কোনও প্রতিষেধক নেই। তাই আপাতত চেষ্টাচরিত্র চলছে একে ঠেকিয়ে রাখার। তাপরপরও প্রতিদিন সংক্রমণের সংখ্যা আগের দিনকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। বাড়ছে মৃত্যুও। সোজা কথায়, রোগ ঠেকানোর দাবি রয়েছে। কার্যকারিতা শূন্য। এদিকে লকডাউন একটু একটু করে শিথিল হচ্ছে। অন্য দিকে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। আর তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হাসপাতালে। কেউ ফিরছেন। কেউ না। কতদিন চলবে এটা? কেউ বলতে পারছেন না। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এই করোনা নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে।

হ্যাঁ, করোনা নিয়ে আমাদের হয়তো আরও অনেকদিন বাঁচতে হবে। দেখতে হবে আরও অনেক স্বজনের মৃত্যু। কাজেই করোনা নিয়ে আমাদের এখন আরও অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। করোনা-আতঙ্কে কিছুতেই অমানবিক হয়ে ওঠা চলবে না। ভাইরাস-আক্রান্ত সন্দেহে কোনও মানুষকে এবং তার পরিবারকে একঘরে করা চলবে না। যারা প্রাণ বাঁচাচ্ছেন, তাদের প্রতিও কোনো ধরনের বিরূপ মনোভাব পোষণ করা যাবে না। এ রকম চলতে থাকলে, বাড়ির লোকেরা রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাবেন না, জানাজানির ভয়ে। তা হলে বাড়ির অন্যান্য সদস্যও আক্রান্ত হয়ে পড়বেন। ওই সদস্যরা নিজের প্রয়োজনে বাইরে গিয়ে নিজের অজান্তেই ভাইরাস ছড়িয়ে দেবেন। এটা যে কত বড় ক্ষতি, সে বিষয়ে ভাবতে হবে। মানুষজনের মনোভাব বদলাতে হবে। যারা চড়াও হচ্ছেন, তাদের বোঝাতে হবে: আপনারা এই মানসিকতা ত্যাগ করুন, নিজেদের বদলান। না হলে আপনারা নিজেরাও এই ভাইরাসের থেকে রক্ষা পাবেন না!

এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। নাগরিক সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। নাগরিক সমাজের কুম্ভকর্ণের ঘুম কবে ভাঙবে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)