চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘কবি গল্পকার’

বিংশ শতকের মাঝামাঝি কাল পরে, একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্মলগ্নের সমান্তরালে জন্মগ্রহণ করা প্রজন্মের কথাকোবিদ কবি গল্পকার মাহবুবুল হক শাকিল (১৯৬৮-২০১৬)। গত শতকের সাহিত্য ধারাকে পেছনে ফেলে নতুন সাহিত্যধারায় তারুণ্যকালে বাংলাদেশের স্বল্পায়ু সাহিত্যনক্ষত্র পথিক তিনি। স্বপ্রণোদিত বোধচর্চার ক্ষেত্র থেকেই তিনি সাহিত্যচর্চা শুরু করেন, আর এ যাত্রাপথে ভূমিচারণ ছিল কবিতায়; সতত একজন অন্তরাত্মার জগতের কবি শাকিল।

নিয়ত যাপনের ক্ষণকাল, কবিতায় বোধের সন্নিবেশ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনাচরণ, রাজনীতির পালাবদল, ছাত্ররাজনীতির উত্তাল অবুঝ দিনকাল, উঠে আসা মধ্যবিত্তের ক্ষয়িষ্ণু জীবনচিত্র, ক্ষমতা আর ক্ষমতাহীনতার তুলনামূলক বোধিচিত্র, আর প্রেম ছিল তার কবিতার অনুষঙ্গ। লিখতেন আদোপ্রান্ত গদ্যছন্দে; “জন্মলগ্ন থেকেই গদ্য কবিতার উদ্দেশ্য ছিলো প্রথাগত নিরূপিত ছন্দের নিয়ম শৃঙ্খলা ভেঙ্গে স্বাধীন বা মুক্তছন্দের শিল্পসিদ্ধ রূপায়ণ। আর তাকেই বলা হলো ‘Verse Libre…..’ গদ্য কবিতার সাথে নিরূপিত কবিতার ছন্দের আদল ভাঙে ঠিকই, তবে তার আত্মাজুড়ে বিরাজমান থাকে শব্দালঙ্কারের ঝনঝনানি”।

কখনো কখনো এ ধারার কবিরা গদ্যরচনায় হাত দিলে গদ্যও হয়ে ওঠে কাব্যঅমৃতের মতো। কবি মাহবুবুল হক শাকিলের গদ্যযাত্রার উপাখ্যান এমনি এক পথরেখায়। এডগার এলান পো’র হাত ধরে সাহিত্যের যে সৃজনীগদ্যের শাখা যাত্রা করে, তা ছোটগল্প। এর বীজ রূপায়িত ছিল উপকথা, রূপকথা, ফোকটেল, ফেয়ারিটেল, ফেবলো বা কখনো কখনো উপন্যাসের আখ্যানে। বাংলা সাহিত্যের গল্পস্বাদকে শৈল্পিকতার মোড়কে উপস্থাপনের যে যাত্রা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুরু করেছিলেন প্রায় একশ বছর বা তার কাছাকাছি সময়ের পরবর্তীতে তার চর্চার ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে নানা বাকভঙ্গিতে।

বিশেষত বাংলাদেশের ছোটগল্পের ধারাবাহিকতায় প্রতিশ্রুতিশীল গল্পকারদের আবির্ভাবের ফলে সাহিত্যের এই শাখাটি উৎকৃষ্টের স্থান দখল করে নেয়। পরিশীলিত মান আর সময়ের স্বল্পপরিসরে নির্ধারিত হবে তাই মাহবুবুল হক শাকিলের গল্পগ্রন্থ ‘ফেরা না ফেরার গল্প’। ২০১৭ সালে অন্যপ্রকাশ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘ফেরা না ফেরার গল্প’ গ্রন্থে গল্পসংখ্যা মোট ছয়টি। সংখ্যার এ তত্ত্বটি সীমাবদ্ধতার এক ভিন্ন মাত্রায় আটকে গেছে; যেখানে গল্পকার নিজেই গল্প হয়ে উঠেছেন। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন- ‘গল্প লেখাটা যেন তার সহজাত একটা দক্ষতা। তার ইচ্ছা ছিল দশ বারোটা গল্প হলে ২০১৭ সালেই বইমেলায় একটা সংকলন বের করবে।’

ছয়টি গল্পের শৈল্পিক সন্নিবেশ ‘ফেরা না ফেরার গল্প’ গ্রন্থটি; ফেরা, টোপ, কুড়ি বছর পরে, গোল পাহাড়ের বাড়ি, রেখো মা দাসেরে মনে, এক ফালি চাঁদ কিংবা এক টুকরা কেকের গল্প, নামাঙ্কিত গল্পগুলো মাহবুবুল হক শাকিলের গল্পরচনার শিল্পভাষ্য। যাপিত জীবনের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়ানো ঘটনা এবং সূত্রাসূত্র গল্পের অনুষঙ্গ। পাশ্ববর্তী জীবনের চিত্রগুলো এড়িয়ে গিয়ে যখন আড়াল হয় আমাদের বক্তব্য তখনই দৃশ্যমান শিল্পরূপ লাভ করে ভিন্নতর এক ছায়া, সেই প্রেক্ষণবিন্দু তৈরি করেছেন গল্পকার শাকিল “ফেরা” গল্পে।

সচিব মোরতেজা সাহেব ফিরে গেছেন বর্ষাক্রান্ত সন্ধ্যায় একটানে সমস্ত বিবেকসূত্রের ছুটিতে। কোন কোন ক্ষেত্রের এই ‘ফেরা’ কাঙ্ক্ষিত অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থানের মিলনক্ষণ। ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত ধাপ এবং আরো ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষয়ে যেতে যেতে সেই বিন্দুতে পৌঁছে যাওয়া যার মীমাংসা না ফেরার দেশে ফেরার ক্রম সমান্তরাল। তবে গল্পের দ্বান্দ্বিক অবস্থানে রয়েছে দীপা। দীপা নামের মেয়েটি মোরতেজা সাহেবকে নিয়ে গেছেন তাই সেই অতীতের কাছে যা থেকে তিনি ফিরে আসতে চেয়েছেন বহুবছর পূর্বেই “আমার নাম মোরতেজা। এখন শুয়ে আছি গুলশান থানার একটি ঘরে, মেঝেতে।” (ফেরা- পৃ-১৮)।

স্বল্পভাষী জামান সাহেবের গল্প টোপ; পুরো নাম রাশেদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। জামান সাহেব দাঁড়িয়ে আছে এক যুগসন্ধিক্ষণে যার একদিকে তিনি ধারণ করে আছেন তার নিজ প্রজন্মের আচরনিক দায়বদ্ধতা অন্যদিকে প্রযুক্তির অভিঘাতে পিষ্টপথে বর্তমান প্রজন্ম; যাদের কারো কারো বোধ চেতনা বিলুপ্ত হয়ে নির্ণয় করে রেখেছে কিছু দৈন্য সভ্য অবস্থান। ব্যক্তিবোধ দিয়ে রাশেদুজ্জামান যা জানেননি প্রযুক্তির খাতিরে বুঝে যান তার সহজ অবস্থান। আত্মপরিচয় লুকিয়ে ঠক কারবারীদের অবস্থান দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় আতঙ্ক তৈরির চিত্রপট যেন সমকালীন বাংলাদেশের, তা সন্দেহের অবকাশ রাখেই না। এক কপটতার টোপের পরে জামান সাহেব নিজেই টোপ ফেলেন; জঙ্গি নামক রাষ্ট্রীয় আঘাত নির্মূলের চেষ্টা তাই জামান সাহেবের। গল্পের শেষে দেখতে পাই- “বেরিয়ে এলো একটি ছুরি, অনেকটা কোরবানির পশুর চামড়া ছাড়ানোর ছুরির মতো। ছুরিধরা আগুনে পোড়া হাত তার বুকের দিকে এগুচ্ছে। রাশেদুজ্জামানের মুখে একটুকরো স্মিত হাসির রেখা। নাহ্। তিনি ভুল করেন নি।” (টোপ-পৃ-৩১)।

Advertisement

পরিপার্শ্ববোধের নিটোল গাল্পিক চর্চা চলেছে ‘কুড়ি বছর পরে’ গল্পে। তিনটি ভাগে গল্পের শুরুর কাঠামোয় কবিতার চরণ ব্যবহার করে চিহ্নিত করেছেন চলচ্চিত্রায়নের কারিগরী। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের- দুঃসময়, রফিক আজাদের- ব্যবধান, আর জীবনানন্দ দাশের- কুড়ি বছর পরে’ কবিতার চরণ ব্যবহার এ গল্পের ইঙ্গিতময় দিক। কুড়ি বছর পরে শহীদুজ্জামান সাহেবের ভেতরটা নড়ে উঠে ক্লাস সিক্সের বিজিতের সামনে পড়ে। হঠাৎই বিজিতদের দেশ ছেড়ে যাওয়া আর তাদের পণ্ডিতপাড়ার বাড়িতে ‘নূর মঞ্জিল’ গড়ে উঠার চর্চা বিশেষ সামাজিক ঘাতকেই চিহ্নিত করার বোধ। তবে সময়ের ঘাতবোধের ক্লান্তিমোচনে বিজিতের কাছেই ফিরে যায় অস্বস্থির চিত্তের স্বস্তির চালনায় শহীদুজ্জামান- “ভরসন্ধ্যায় কলকাতার রাস্তায় দুজন প্রৌঢ় মানুষ হেঁটে যাচ্ছেন। তাঁদের হাতে নারকেলের নাড়ু। আয়েশ করে খাচ্ছেন। দেখে মনে হচ্ছে, স্কুলপালানো দুই বালক।” (‘কুড়ি বছর পরে’-পৃষ্ঠা- ৪১)।

গোলপাহাড়ের পাশে চল্লিশ নম্বর বাসার তিনতলার কলিং বেল বেজে ওঠার মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয় এক চাপা পড়া অক্লান্ত ইতিহাসের চিত্র, কুমুর কিশোরী মনের ছোপে ছোপে যা বহমান ছিল দগদগে ঘায়ের মতো। কুমু উন্মোচন করে তমালের হাতে তার বাবার জীবনপটের বিবর্তনের ইতিহাস। গল্পকার সচেতনভাবে নির্ধারণ করেছেন দুটি ভিন্ন প্রেক্ষণবিন্দুকে। যেখানে কুমু কক্সবাজারের পথে থেমে যায় চট্টগ্রামের গোলপাহাড়ে; মধুচন্দ্রিমার প্রাক্কালে তমালের প্রতি কুমুর যেন এটি এক সতর্কবার্তা। পরিণতি তাই কুমুই রচনা করে- ‘তমাল আমি তোমার কাছে মিথ্যা বলেছি। আমার বাবা মারা যাননি। সেই রাতে ভয়ংকর সেই মানুষটি আমাদের জীবন থেকে আরেকটি জীবনে চলে গেলেন।’ (গোলপাহাড়ের বাড়ি-পৃ-৪৯)।

প্রজন্মের যাত্রাপথে বিবর্তনের ফোঁকরে রয়ে যাওয়া ব্যবধান কখনো কখনো পদক্ষেপের দৃঢ়তায় মূল্যবোধ ও বিবেচনায় এক একাধিক প্রায়োগিক অবস্থানে তৈরি হওয়া পরিবর্তিত পরিস্থিতির গল্প ‘রেখো মা দাসেরে মনে’। ‘টোপ’ গল্পের আরো এক ভিন্ন চিত্রপট এই গল্পটি। বিরুদ্ধ প্রতিবেশের আনুপাতিক বিস্তরণ এবং সন্ত্রাসীর চরিত্র দেশ কাল ধর্মভেদে এক ও অভিন্ন একইসাথে স্বাদেশিক অনুভূতির দুর্দম নিশ্চয়তা বুক ফেটে আর্তনাদের মতো বেড়িয়ে আসে অভীক পরিবারের হৃদচিত্রপটে ‘মুখ থেকে বেরিয়ে আসা গোঙানির মধ্যেই সে বলে ওঠে, ‘আমি মায়ের কাছে ফিরে যাব।’ (“রেখো মা দাসেরে মনে” পৃ-৫৭)।

বাস্তবতার আয়নাজুড়ে স্কেচকাটা ভূমিতে দৃশ্যপটের আলোর নীচে আছে পারুলেরা। জীবন সংগ্রামের কর্মজীবী নারী; সাধারণ বা অসাধারণ। ‘এক ফালি চাঁদ কিংবা এক টুকরো কেকের গল্প’- এক টুকরো জীবনের গল্প। পারুলের জীবন বোধকরি অচেনা নয় তবে অপাঙক্তেয়। সমকাল আর চাক্ষুস জীবনের প্রাত্যহিক গল্পকে কাঠামোয় আনতে চেয়েছেন গল্পকার শাকিল। এক্ষেত্রে চরিত্র গল্পের উপর নির্ভরশীল না চরিত্র নির্ভরশীল গল্প তা কিছুটা ভাবিয়ে তোলে, তবে এটি গল্পকে অনিয়ন্ত্রিত করেনি।

‘সামগ্রিকভাবে তিনি সময়ের বিচিত্র ক্ষরণ ও সম্ভাবনার যতিচিহ্ন’ চিত্রিত করেছেন। গল্পের ভাষা নির্মাণে নির্মোহ জটিলতার বাইরে রয়েছে একেবারেই সরলতা। কোথাও কোথাও প্রতীকী তাৎপর্য পৌঁছে গেছে ব্যোমক্ষেত্রে-
* শমসেরের দু’হাত তাকে গ্রাস করতে থাকে, এক ভয়ংকর অজগর তার সমস্ত শরীর পেচিয়ে ধরে। (এক ফালি চাঁদ কিংবা এক টুকরো কেকের গল্প)
* টিকটিকির নিবিড় নিমগ্নতায় ঠায় আঁকড়ে আছে তার পৃথিবী। (ফেরা)
* ব্ল্যাকফরেস্ট কেকের ওপরে জ্বলতে থাকা মোমবাতিগুলো অপলা তার হাসিমাখা ফুঁ
দিয়ে নিভিয়ে দেয়। (রেখো মা দাসেরে মনে)

মাহবুবুল হক শাকিলতবে গল্প নির্মাণের চর্চা প্রয়োগের সময়গত সীমাবদ্ধতায় ছিল ‘ফেরা না ফেরার গল্প’গ্রন্থে, বাহুল্যতা ছাপিয়ে গেছেন গল্পকার অনায়াসেই; কিন্তু বর্ণনার পারদীয় জটিলতা তৈরি করতে কিছুটা কৈশোরছাপ রয়েছে। শৈল্পিক কুশলতা অনেকটাই গল্পকারের হাতে ছিল। একক চরিত্র নয় বরং আখ্যানই গল্পের প্রাণ হয়ে উঠেছে। কিছু সময়ের জন্য মোরতেজা সাহেবকে গল্পের নায়ক মনে হলেও ইডেন কলেজের তরুণী ও তার মা আয়েশা সব কিছুকে ছাপিয়ে যান, যেমন ছাপিয়ে যায় বিজিত, জামান সাহেবকে তার নামের মতোই।

অন্যদিকে কিছু মুহূর্তের মধ্যেই মনে হতে থাকে কুমুরাই হয়তো তার বাবাকে হত্যা করেছে; হত্যাই জীবিত বাবা যখন মৃত মানুষের গল্পে পরিণত হয়: সচিব, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ব্লগার, মধ্যবিত্ত লেখক চরিত্রের পাশে গায়ে রোজ পাউডার মাখা পারুলের শরীর নিয়ে মেতে ওঠা কানা শমসের ও আকাঙ্ক্ষিত কেকের জন্য ময়নার তোলপাড় গল্পকারের শ্রেণিচেতনার দায়বদ্ধতার স্বীকারোক্তি। অভীকের মধুসূদনীয় আকুতি ‘রেখো মা দাসেরে মনে’ ক্ষণ সময়ের জন্য দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তার ‘টোপ’ গল্পে দেখিয়েছেন ডোয়ার্সের গহীনে মনুষ্য শিশুর টোপ ফেলে মহারাজার পাশবিক শিকার উন্মাদনার বিপর্যস্ত বোধ আর রোধির অন্তঃসারশূণ্যতা। একই শিরোনামের গল্পে মাহবুবুল হক শাকিল দেখিয়েছেন প্রযুক্তির কারবারীদের বেহিসাবী ব্যধিগ্রস্থ টোপ আর গল্পকার টোপের বিপরীতে টোপ তৈরি করেছেন। সময়ের গল্পে যাত্রা করা গল্পকার মাহবুবুল হক শাকিলের বোধির তীব্রতা থেমে না গিয়ে রয়ে গেছে কিছু কালো অক্ষরবৃত্তে, তাই থেকে যাক আরো কিছুদিন নান্দনিক চর্চাক্ষেত্রে মাহবুবুল হক শাকিল।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)