চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এ শোক সইব কেমন করে?

বাবার সঙ্গে আকাশে উড়তে চেয়েছিল এফএইচ প্রিয়কের তিন বছরের মেয়ে প্রিয়ন্ময়ী। শেষ পর্যন্ত আকাশে উড়ার স্বপ্ন পূরণ হলেও জীবন নিয়ে মাটিতে নামা হয়নি নেপালে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলার বিমানের বাবা-মেয়ে দুই যাত্রীর। আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি প্রিয়ন্ময়ীর মা আলমিন নাহার এ্যানি। যেমন স্বামীর সঙ্গে হানিমুন করে ফিরে আসা হলো না মানিকগঞ্জের মেয়ে শশীর।

এমনি অনেক করুণ গল্প, চোখের জল ঝরানো হৃদয় বিদীর্ণ করা এমন অনেক ট্রাজেডি! শুধু বাংলাদেশের নাগরিকরাই নন, লাশ হয়ে ফিরল নেপালের ১৩ জন ভবিষ্যৎ ডাক্তার। বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করে এমবিবিএস পরীক্ষা শেষে দেশে ফিরছিল ওরা ১৩ জন। নেপালের কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত হওয়া ইউএস বাংলার উড়োজাহাজটিতেই ছিল নেপাল থেকে বাংলাদেশের সিলেট জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজে পড়তে আসা ১৩ শিক্ষার্থী। তারা সবাই ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরছিল। পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি যাওয়ার পথে সবাই লাশ হয়ে গেলো একটি দুর্ঘটনায়। ইন্টার্নি শেষ করলেই তারা ডাক্তার হয়ে নেপাল ফিরতেন। তারা সবাই ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ১১জন মেয়ে এবং দুজন ছেলে।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিধ্বস্ত বিমানে চার ক্রুসহ ৭১ জন আরোহীর মধ্যে পঞ্চাশেরও অধিক নিহত হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে! বিধ্বস্ত বিমানে ৩৩ জন নেপালি, ৩২ বাংলাদেশী, একজন মালদ্বীপের এবং এক চীনা নাগরিক ছিলেন। যাত্রীদের মধ্যে দুজন শিশু ছিল। দুই শিশুই করুণ মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর মতে, বিধ্বস্ত হওয়া বিমান থেকে ১৪ জন বাংলাদেশি যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের অবস্থাই সংকটাপন্ন!

এই বিমানের যাত্রীদের অনেকে দাপ্তরিক কাজে ভ্রমণে গিয়েছিলেন, অনেকে ঘুরতে, কেউ গেছেন হানিমুন করতে, কেউ তাদের বিবাহ বার্ষিকী উদযাপনের জন্য। আর নেপালি মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা ছুটি কাটাতে বাড়িতে গিয়েছিলেন। বিমান দুর্ঘটনায় তাদের জীবপাত জীবনের আজ আকস্মিক যবনিকাপাত ঘটল। এখনও যারা জীবিত আছেন, তারা ঝলসানো শরীর আর দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে জীবনের অভিশাপই কেবল বয়ে বেড়াবেন! সত্যিই অবিশ্বাস্য! এমন ট্রাজেডির জন্য আমরা কেউ-ই প্রস্তুত ছিলাম না। এ শোক আমরা সইব কেমন করে?

উড়োজাহাজ

গণমাধ্যমের খবরে দেখা গেছে, হবু ডাক্তার ছেলের লাশ নিতে দাঁড়িয়ে আছেন বাকরুদ্ধ এক নেপালি পিতা। তাঁর মুখের দিকে তাকানো যায় না, চোখের দিকে তাকানো যায় না। শোকে পাথর হয়েছেন তিনি, কাঁদতে ভুলে গেছেন। অসহায় চোখে তাকিয়ে আছেন বিধ্বস্ত বিমানের দিকে। মানুষের জন্য এই পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী বোঝা কী? পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে অনিচ্ছুক এই পিতার ছবি দেখে যে কেউ দিশেহারা হবেন, মুহূর্তের জন্য ভুলে যাবেন কথা বলতে। মানুষের চোখ ভরে আসবে জলে, চোখ ভিজে যাবে জলে। আমরাও দিশেহারা হচ্ছি, কথা বলতে ভুলে যাচ্ছি। আমাদেরও চোখ ভিজছে চোখের জলে। আরেক ছবিতে দেখা গেছে এক কিশোরীর লাশের সামনে বসে আছেন অসহায় স্বজনরা। একজন ঝুঁকে আছেন কিশোরীর মৃত মুখের ওপর। হয়তো তাঁর চোখে ছানি, চোখে ভালো দেখতে পান না। তবু দেখার চেষ্টা করছেন তাঁর প্রিয় কিশোরীটি সত্যি সত্যি চলে গেছে, নাকি তখনো শরীরের ভেতর লুকিয়ে আছে তার আত্মা! এই দৃশ্যের দিকে আমরা কেমন করে তাকাব! আমরা কীভাবে শোক করব? কতটা চোখের জলে এই ট্রাজেডিকে ভিজিয়ে মুছে দিতে পারব? সত্যি, নেপালের বিমান দুর্ঘটনায় শোকে মুহ্যমান আজ বাংলাদেশ ও নেপাল! কাঁদছে বাংলাদেশ। আজ চোখের জলে ভাসছে নেপাল!

এই ঘটনার জন্য আমরা কাকে দায়ী করব? কীভাবে সান্ত্বনা খুঁজে পাব? সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৪০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। চারপাশের উঁচু পাহাড়-পর্বতে ঘেরা। এখানে উড়োজাহাজ অবতরণ ও উড্ডয়ন উভয়ই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ! বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে অবতরণের সময় প্রধান বাধা একটি বিশাল পাহাড়, এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮৭০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। ত্রিভুবন বিমানবন্দরের নয় মাইল দূরে রয়েছে এই পাহাড়। এ জন্য এই রানওয়েতে কোনো উড়োজাহাজই সোজা অবতরণ করতে পারে না। ওই পাহাড় পেরোনোর পরপরই দ্রুত উড়োজাহাজ অবতরণ করাতে হয়। উল্লেখ্য, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পর থেকে এক ঘণ্টা সময় লাগে কাঠমান্ডুর আকাশসীমায় যেতে।

শুধু তাই নয়, বিশ্বের সবচেয়ে ‘বিপজ্জনক বিমানবন্দর’ হিসেবে পরিচিতি রয়েছে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের। তবুও পাইলটদের উড়োজাহাজ চালিয়ে আসা-যাওয়া থেমে নেই। হিমালয় পর্বতমালার কারণে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় একটি দেশ নেপাল। প্রতিদিন প্রচুর যাত্রী আসা-যাওয়া করেন এখানে। পর্বত ছাড়াও প্রায়ই ঘন কুয়াশা ঘিরে ফেলে ত্রিভুবন বিমানবন্দরকে। এ কারণে ফ্লাইট পরিচালনায় বিপত্তিতে পড়তে হয় পাইলটদের। কিন্তু বিমান সংস্থাগুলো লাভের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ এই বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা করে।

ত্রিভুবন হচ্ছে নেপালের একমাত্র ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট যার ব্যবস্থাপনা অপর্যাপ্ত ও দুর্বল। ২০১৬ সালের প্রথম দিকে টুইন অটার টার্বোপ্রিপ নামের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হলে এর ২৩ জন যাত্রীর সবাই প্রাণ হারান। বিমানবন্দরটিতে আন্তর্জাতিক বিমান অবতরণের পর থেকে এ পর্যন্ত ৭০টির বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৬৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বিমানের পাশাপাশি সেখানে হেলিকপ্টারও বিধ্বস্ত হয়েছে। তারপরও এই বিমানবন্দরটির উন্নয়ন ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

এই রুটের সাবেক এক বিমান চালক বলেছেন, ত্রিভুবন বিমানবন্দরের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এখানে অটোমেটিক ল্যান্ডিং সিস্টেম নেই। এ পদ্ধতি থাকলে বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে রানওয়ের ৫০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় থাকা উড়োজাহাজকে নির্দেশনা দেওয়া যায়।

শাহজালালসহ বিশ্বের অন্যান্য বিমানবন্দরে অবতরণের সময় সাধারণত ৮০০ মিটার দূর থেকে রানওয়ের দিকে লক্ষ রাখেন পাইলটরা। কিন্তু অটোমেটিক ল্যান্ডিং সিস্টেম না থাকায় তিন কিলোমিটার দূর থেকে ত্রিভুবনের রানওয়ের দিকে লক্ষ রাখতে হয় তাঁদের। এর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণও প্রয়োজন হয়। এত ঝুঁকির পরও এখানে যে বিমান চলে সেটাই আশ্চর্যর!

নেপালে ইউএস বাংলার যে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে সেটি কানাডার বোম্বাডিয়ার কোম্পানির তৈরি ড্যাশ-৮ কিউ-৪০০ মডেলের। আকাশপথে বিশ্বের বিভিন্ন রুটে এই উড়োজাহাজ চলাচল করে। তবে এই মডেলের বিমানের বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই বিমান দুর্ঘটনা কবলিত হয়েছে। নেপালে বিধ্বস্ত ইউএস বাংলার বিমানটি ১৬ বছরের পুরাতন। এমন বিমান কীভাবে চলাচলের অনুমতি পায়, বা পেয়েছে, সে প্রশ্নটিও সামনে চলে আসছে। এসব বিষয়কে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা

নেপালে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার এই ট্র্যাজিক ঘটনাটিকে নিছক একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এই উড়োজাহাজটি বিধ্বংস হবার কারণ সঠিক তদন্তের ভিত্তিতে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যাপারে নেপাল-বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক মহলকে সম্পৃক্ত হরতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনা আর না ঘটে সেদিকে সবার দৃষ্টি রাখা উচিত।

আমাদের একটি সন্তানকেও আমরা এই ট্র্যাজেডির মতো করে হারাতে চাই না। নেপালের বিমান দুর্ঘটনায় যেসব বাবা-মা তাঁদের সন্তান হারিয়েছেন, যে ভাইবোন হারিয়েছেন তাঁদের ভাইটিকে, যে কিশোর-কিশোরী হারিয়েছেন তার বন্ধু, প্রার্থনা করি ঈশ্বর যেন তাঁর করুণাধারা এসব মানুষের ওপর বর্ষণ করেন। এই শোক সামলানোর ক্ষমতা যেন তাঁদেরকে দেন।

এমন ট্রাজেডি আর যেন না আসে, সেই প্রার্থনা করা ছাড়া আপাতত আমাদের আর কি-ই বা করার আছে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)