চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে পাইওনিয়ার ব্যাংক এশিয়া, কাজ করছে ভয়েজ ব্যাংকিং নিয়েও: আরফান আলী

এজেন্ট ব্যাংকিং এখন জনপ্রিয় এবং দেশে বেশ সমাদৃত বলে জানিয়েছেন ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে মো. আরফান আলী। বিভিন্ন উদ্যোগসহ ব্যাংকিং খাতের গতিপ্রকৃতি নিয়ে সম্প্রতি চ্যানেল আইয়ের সাথে আলোচনায় তিনি এ কথা জানান।

মো. আরফান আলী বলেন, ব্যাংকিং সেবা সাধারণ মানুষের দোড়গোড়ায় পৌঁছানোর যে কার্যক্রম, তা বেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। সব নাগরিকের জন্য ব্যাংক একাউন্ট করার যে পরিকল্পনা (ন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন স্ট্রাটেজি-এনএফআইএস) করেছে বাংলাদেশ সরকার তা ২০২৪ সালের মধ্যে পূরণ হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এনএফআইএস পূরণে এজেন্ট ব্যাংকিং একটি বড় ভূমিকা পালন করবে।

বিজ্ঞাপন

‘ব্যাংকের পক্ষে এজেন্ট ব্যাংক গ্রাহককে সবগুলো সেবা দেবে। গ্রাহক কিন্তু ব্যাংকের, এজেন্ট শুধুমাত্র ব্যাংকের পক্ষে গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে এবং এই সেবা দেয়ার জন্য ব্যাংকের দায়ভার সম্পুর্ণরূপে ব্যাংকের কাছে থাকবে এবং ব্যাংক এই গ্রাহককে সম্পুর্ণ নিরাপত্তা দেবে। আর তার এক্সটেনশন হিসেবে এজেন্ট গ্রাহক সেবাটা প্রদান করবে। এতে করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অগ্রাহক যারা তাদেরও ব্যাংকিং সেবাখাতের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।’

তিনি আরও বলেন, তখনই এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্কটা পরিপূর্ণ রূপ পাবে, যখন আমরা দেখতে পাবো সব ব্যাংক একাউন্টগুলো এনশিওর হয়েছে। সকলেই যখন একাউন্টধারী হয়ে যাবেন তখন কিন্তু মোবাইল এপ্লিকেশনটা বেড়ে যাবে। এটা এমএফএস না, এটা মোবাইল ব্যাংকিং। এইভাবে যে, একটি একাউন্টের মাধ্যমে সকলে একটি মোবাইল অ্যাপের সাথে যুক্ত থাকবে। এখন এই মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সমস্ত ধরণের ব্যাংকিং সেবা, ট্রানজিকশন কমপ্লিট করা যাবে।

‘বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করেছে, ব্যক্তি বিশেষে কারেন্ট একাউন্ট খুলে মাইক্রো মার্চেন্টাইল লেনদেন করতে পারবে। সেবার জন্য লেনদেন করতে পারবে। কোন স্মল পেমেন্ট রিসিভ করতে পারবে গ্রামীণ পর্যায়ে বা যে কোন জায়গা থেকে। তো এই যে সুযোগটা সৃষ্টি হলো, এই সুযোগটা ব্যবহার করে গ্রাহকরা অনায়াসেই ব্যাংক লেনদেন করতে পারবে।’

ব্যাংকিং সেক্টরে প্রযুক্তির অগ্রগতি বিষয়ে ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এছাড়া কোড দিয়ে, ব্যাংক কার্ড দিয়ে গ্রাহকরা পেমেন্টে দিতে পারবে, আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে, ফিঙ্গার কিংবা ফেস রিকোগনাইজেশন করেও গ্রাহকরা লেনদেন করতে পারবে। আমরা এখন ভয়েস ব্যাংকিংটা  নিয়ে কাজ করছি। একজন গ্রাহক যাতে কথা বলে অর্থাৎ ভয়েজ রিকোগনাইজেশনের মাধ্যমে যাতে ব্যাংকিং সব সেবা পেতে পারে তা নিশ্চিতের চেষ্টা করছি। এটাকে ভয়েজ ব্যাংকিং বলছি আমরা। এটাও এজেন্ট ব্যাংকিংকে আরো জনপ্রিয় করবে।

‘একজন গ্রাহক আগের চেয়ে অনেক বেশি এমপাওয়ার্ড ফিল করবেন। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, ব্যাংকিং সেবা শুধুমাত্র ব্যাংক দেবে তা কিন্তু নয়। আরো অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা ফিনটেক বা টেকফিন (দুই রকমের প্রতিষ্ঠান) তারাও কিন্তু কিছু সেবা নিয়ে আসবে সামনের দিকে। যত ডিজিটাইজেশন হবে তত ব্যাংক থেকে গ্রাহকের চাওয়া-পাওয়া বেড়ে যাবে। গ্রাহকরা সবগুলো সেবা তার বাসা বসেই পাবে-এমন একটা চিন্তা আমরা সহজেই করতে পারি।’

করোনাকালে বদলে যাওয়া ব্যাংক ব্যবস্থা সর্ম্পকে তিনি বলেন, কোভিড পিরিয়ডে এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থাটা একটি কার্যকারী ব্যবস্থা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এটাকে বলে ফ্লাগমেন্টেন্ডে সাপ্লাই চেইন। আপনার এজেন্ট ব্যাংক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সুতরাং একটা বুথ বন্ধ থাকলে আরেকটা বুথ চালু রাখা যায়। কিন্তু ব্যাংকের কোন শাখা বন্ধ থাকলে ওই এরিয়াটাই ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত থাকছেন। সে হিসেবে এজেন্ট বুথের সেবা অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত। ফলে গ্রাহকরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যাংকিং সেবা উপভোগ করছেন। রেমিটেন্সের ব্যাপারেও এজেন্ট ব্যাংকিং একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে। এজেন্ট ব্যাংকে লেনদেন এখন এতো হয় যে হুন্ডি ব্যবসাটা এখন নেই বললেই চলে।

তার ব্যাংকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের শুরু ইতিহাস বিষয়ে তিনি বলেন, মূলত ব্যাংক এশিয়া দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পাইওনিয়ার। আমরাই প্রথম মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলায় সেবাটির পাইলট প্রকল্প শুরু করি। এরপর ডাচ্-বাংলা ব্যাংকসহ অন্যরা এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করেছে। আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিং মডেলটা এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে লম্বা সময় ধরে এটি সাপোর্ট দিতে পারে। এতদিন এজেন্ট সংখ্যা বাড়ানো ও অবকাঠামো নেটওয়ার্ক তৈরিতে আমরা অনেক ব্যয় করেছি। এর ফলে লম্বা সময় ধরে এ থেকে উপকৃত হব।

তিনি আরও জানান, দেশের ৬৩টি জেলার ৩৫৫টি উপজেলায় আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৯৩৬টি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। এসব ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ৩০২ কোটি টাকার আমানত। এছাড়া ৫ হাজার ৭৫১ জন গ্রাহককে আমরা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১১৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছি। চালু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট ৯ হাজার ২৬১ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। বর্তমানে এর মাধ্যমে দিনে ২ হাজার ৫০০ হিসাব খোলা হচ্ছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের জন্য এটি বড় ধরনের সফলতা। আমাদের লক্ষ্য হলো দিনে ১০ হাজার ব্যাংক হিসাব চালু করা। বিদ্যমান নেটওয়ার্ক দিয়েই এটি সম্ভব।

ইকমার্স ও বিভিন্ন ভাতায় এজেন্ট ব্যাংকিং বিষয়ে মো. আরফান আলী বলেন, আগামী দিনে ইউডিসিগুলো ই-কমার্সের হাব হিসেবে কাজ করবে। ভূমি কর বা খাজনা পরিশোধের মতো সরকারি অর্থ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করা যাবে। এছাড়া বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, দুস্থ ভাতার মতো সরকারি সমাজসেবাগুলো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। এক্ষেত্রে সেবাটির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে।

তবে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তার দিকটি যথেষ্ট শক্তিশালী করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এজেন্টের অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকলে সে কোনো লেনদেন করতে পারে না। লেনদেন না হলে গ্রাহককে কোনো প্রিন্টেড রিসিট দেয়াও সম্ভব হবে না। গ্রামের গ্রাহকদের লেনদেনসংক্রান্ত বিষয়ে সচেতন করার জন্য প্রত্যেকটি আউটলেটে বোর্ড দিয়ে রাখি। এছাড়া প্রত্যক আউটলেটে আমাদের একজন কর্মী আছে। পৃথিবীর এজেন্ট ব্যাংকিং মডেলে এটি না থাকলেও নিরাপদ লেনদেনের স্বার্থেই এটি আমরা করেছি। এর মাধ্যমে লেনদেনের ক্ষেত্রে বহুস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

এর আগে দেশে প্রথমবারের মতো ‘স্বাধীন’ ফ্রিল্যান্সার কার্ড চালু হয়েছে। এতে সহযোগিতা করেছে ব্যাংক এশিয়া, মাস্টারকার্ড ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার সার্ভিসসেস (বেসিস)। এর মধ্য দিয়ে যাঁরা ফ্রিল্যান্সিং করেন তাঁরা এখন থেকে এই কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি বৈধ উপায়ে তাঁদের আন্তর্জাতিক নিয়োগদাতাদের কাছ থেকে আয়ের অর্থ গ্রহণ করছেন। মাস্টারকার্ডের স্থানীয়ভাবে ইস্যু করা এই কার্ডের মাধ্যমে তাঁরা অত্যন্ত সহজে, নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে বৈদেশিক মুদ্রায় তাঁদের কাজের তথা আয়ের অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন।

দ্বিতীয়বারের মতো ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ পান মো. আরফান আলী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইন্সটিউট থেকে এমবিএ ডিগ্রিধারী এবং ব্যাংকিং সেক্টরের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২৮ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।

১৯৯১ সালে আরব বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রবেশনারী অফিসার হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তার ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু হয়।

১৯৯৯ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পূর্বেই তিনি ব্যাংক এশিয়ায় যোগদান করেন এবং ব্যাংক এশিয়া কর্তৃক দেশে প্রথমবারের মতো দুটি বিদেশী ব্যাংক- ব্যাংক অব নোভা স্কশিয়া অব কানাডা এবং মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক অব পাকিস্তানের বাংলাদেশ কার্যক্রম অধিগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

দেশের প্রান্তিক ও ব্যাংকিং সেবা বহির্ভূত ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার লক্ষে তিনিই প্রথম এদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা প্রবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মোঃ আরফান আলী সুইফটের বাংলাদেশে সদস্য ও ব্যবহারকারীদের সংগঠনের বর্তমান সভাপতি, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ লিমিটেড (এবিবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং বাংলাদেশ মানি মার্কেট ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএএমডিএ)-এর উপদেষ্টা।

কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার মেধাবী শিক্ষার্থীকে উচ্চ শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করছে ব্যাংক এশিয়া। (দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের প্রকাশনার জন্য বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ট্রাস্টকে বিশেষ মেশিন অনুদান দিয়েছে ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড।

বিজ্ঞাপন