চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এই বৃষ্টিতে……

মন কি মেঘলা আকাশ? তা না হলে কেন ভিজে যায় বৃষ্টিতে? বাদল দিনে মন কেন মেঘ হয়ে যায়? কেন বুকের মধ্যে বৃষ্টিপাত হয়? মনের সঙ্গে মেঘের কী সম্পর্ক? আর মনমেঘ নিয়ে এত প্রশ্নইবা কেন মনের মধ্যে তড়পায়? আচ্ছা, বৃষ্টিতে কি নারী কিংবা পুরুষের একই রকম অনুভূতি হয়? তবে এটুকু বুঝতে পারি, বৃষ্টির সঙ্গে তো সম্পর্ক আছে সৃষ্টির। এ কারণেই বোধ করি বৃষ্টি হলে মনটা হয়ে যায় খেয়ালি আকাশ। কত যে তার রং। কত যে তার ভাব। কত যে তার ভঙ্গি। কখনো উদাস। কখনো উড়নচণ্ডি। কখনো আউলা-ঝাউলা। অস্থির কি নয়? বরং বাদল দিনে মন একদমই সুস্থির হতে চায় না। কোনো কিছুতেই কেন যেন মন বসে না। ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে/জানি নে, জানি নে/কিছুতেই কেন যে মন লাগে না।’ কেন লাগে না?

আর ঘোর বর্ষাকাল হলে তো কথাই নেই। ‘আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন/ঝর ঝর ঝর ঝর ঝরেছে/তোমাকে আমার মনে পড়েছে’। বর্ষাকালে কেন বেশি বেশি মনে পড়ে?

বৃষ্টির দিনে সুস্থির মনটা কেমন যেন চপলমতি হয়ে ওঠে। কারণ কি পাগলা হাওয়া? ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে/পাগল আমার মন জেগে ওঠে’। মেঘলা দিনের সঙ্গে তোমার কি কোনো সম্পর্ক আছে? তা না হলে কেন যেন মন ঘরে থাকতে চায় না। ছুটে যেতে চায় তোমার কাছে। ‘এই মেঘলা দিনে একলা/ঘরে থাকে না তো মন/কাছে যাবো কবে পাবো/ওগো তোমার নিমন্ত্রণ’। পাওয়া যাবে কি নিমন্ত্রণ?

তবুও ছুটেও যাই তোমার আশ্বাসে। তারপরও তোমার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কেন যে কাটতে চায় না। কী যে অস্থির অস্থির লাগে। কেন যে আমায় করো অবহেলা? তাহলে কীভাবে কাটবে বর্ষণমুখর দিন? ‘তুমি যদি না দেখা দাও, করো আমায় হেলা/কেমন করে কাটে আমার এমন বাদল-বেলা।/দূরের পানে মেলে আঁখি কেবল আমি চেয়ে থাকি/পরান আমার কেঁদে বেড়ায় দুরন্ত বাতাসে’।

মনের সঙ্গে বোধ করি মেঘের একটি আত্মিক বন্ধন আছে। এ কারণে মনটাও হতে চায় মেঘের সঙ্গী। ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী/উড়ে চলে দিগ্দিগন্তের পানে/নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবর্ষণসংগীতে/রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম’।

টিপটিপ বৃষ্টি হলে তোমার সঙ্গে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে হয়। ‘চলো সব কাজ ফেলে রেখে/তুমি-আমি দুজনে/ এসো বেরিয়ে পড়ি’। কোথায় যেন হারিয়ে যেতে চায় মন। ‘চলো না দুজন হারিয়ে যাই/বৃষ্টিমুখর জলের আদরে’। তোমার কি এমন ইচ্ছে করে না?

বাদল দিনে মন হয়ে যায় আনমনা। কোথায় যেন হারিয়ে হারিয়ে যায়। এ কারণে মনটা কেমন যেন বেভুল হয়ে যায়। হয়ে যায় এলোমেলো। হৃদয় নিমজ্জিত হতে চায় ভালোবাসার আকণ্ঠ ঋণে। ‘মন হারাবার আজি বেলা/পথ ভুলিবার খেলা/মন চায় মন চায়/হৃদয় জড়াতে কারো চির-ঋণে’। তদুপরি অনেক বর্ষণের পর তুমি যখন আসো, কী যে ভালো লাগে। তুমি কি সেই অনুভূতিটুকু বোঝো? ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে/যেন একমুঠো রোদ্দুর আমার দুচোখ ভরে/তুমি এলে’।
কখনো কখনো বিলম্বিত বৃষ্টিটাও প্রত্যাশিত হয়ে ওঠে। তাহলে যে তোমার বিড়ম্বনা পোহাতে হবে না। ‘তুমি আসবে বলেই আকাশ মেঘলা বৃষ্টি এখনো হয় নি/তুমি আসবে বলেই কৃষ্ণচূড়ার ফুলগুলো ঝরে যায়নি’।

বৃষ্টিবর্ষায় যেভাবে ক্ষণে ক্ষণে বদলে যায় আকাশ, বদলায় মনটাও। বদলায় মনের রং। অনুভব। অনুভূতি। মনের আকাশে ভেসে উঠে রঙধনুও। তাকে পেতে ইচ্ছে করে। ‘মেঘের আড়ালে ভেসে থাকা সেই/রংধনুকে চায়’।

বিজ্ঞাপন

বৃষ্টি যখন অঝোর ধারায় ঝরতে থাকে, তখন খুলে দিতে ইচ্ছে করে হৃদয়ের খাজাঞ্চি। কোনো আগল রাখতে একদমই ইচ্ছে করে না। ‘দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি’ হয়ে বলতে ইচ্ছে জাগে না বলা অনেক কথা। ‘এমন দিনে তারে বলা যায়/এমন ঘনঘোর বরষায়। এমন দিনে মন খোলা যায়/এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরোঝরে/তপনহীন ঘন তমসায়।/সে কথা শুনিবে না কেহ আর/নিভৃত নির্জন চারিধার’। হৃদয়ের দাবির কাছে আসলে সব কিছু তুচ্ছ হয়ে যায়। তখন তুমি ছাড়া আর কিছুই যেন মর্মস্পর্শ করে না। ‘সমাজ সংসার মিছে সব/মিছে এ জীবনের কলরব।/কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে/হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব/আঁধারে মিশে গেছে আর সব’।

খুব ইচ্ছে করে তোমার হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজতে। জানি, তুমি তো ভিজতে চাইবে না। তবুও ইচ্ছের ঘোড়াকে তো আর লাগাম পরানো যায় না। ‘যদি ডেকে বলি, এসো হাত ধরো/চলো ভিজি আজ বৃষ্টিতে/এসো গান করি মেঘ মল্লারে/করুণাধারা দৃষ্টিতে/আসবে না তুমি; জানি আমি জানি/অকারণে তবু কেন কাছে ডাকি/কেন মরে যাই তৃষ্ণাতে/এইই এসো না চলো জলে ভিজি’। এত এত আকুতি নিয়ে অনুরোধ করছি, তুমি কি আমার অনুরোধ রাখবে না?

আবার কি বৈপরীত্য দেখো, বৃষ্টিতে তোমাকে ভিজতে দিতে চাই না। ভয় পাইয়ে দিয়ে তোমাকে আটকে রাখতে চাই। ‘আকাশ এতো মেঘলা যেও নাকো একলা/এখনি নামবে অন্ধকার/ঝড়ের জল-তরঙ্গে নাচবে নটি রঙ্গে/ভয় আছে পথ হারাবার।’ একটু বেশি সময় তোমাকে রাখার জন্য কত না কথা? ‘একটু দাঁড়াবে কি, এখনি নামবে বৃষ্টি।/মেঘে আকাশ থমথম, নীড়ে ফিরে যাচ্ছে পাখি;/একটু দাঁড়াবে কি, এখনি নামবে বৃষ্টি। খেয়ালি আকাশের বুকে, ফুটে থাকা তারার মেলা;/ঢেকে দিয়ে যাচ্ছে যেন, কালো কালো মেঘের ভেলা।/এখনই যেও না তুমি, এখনই যেও না তুমি;/ভালোবাসার অনেক বাকি’। কেমন সেই ভালোবাসা? আমি ঠিক জানি না।

বৃষ্টি চাই না। আবার চাইও। কী যে দ্বিধা-দ্বন্দ? আসলে বৃষ্টিকে চাই নিজের সুবিধামাফিক। তা কি সম্ভব? বৃষ্টি কি কারও কথা শোনে? সুরের জাদুকর মিয়া তানসেন কি আর সবাই হতে পারেন? ‘ওগো বরষা তুমি ঝরো না গো অমন জোরে/কাছে সে আসবে তবে কেমন করে/রিমঝিম রিমঝিম রিমঝিম/এলে না হয় ঝোরো তখন অঝোর ধারে/যাতে সে যেতে চেয়েও যেতে নাহি পারে/রিমঝিম ঝিম ঝিম ঝিম।’ জানি, যা চাই, তা পাওয়ার সুযোগ নেই। তবুও ‘বৃষ্টি নেশাভরা সন্ধ্যা বেলা’ বেশরম মন কোনো কিছু মানতে চায় না।‘যা না চাইবার তাই আজি চাই গো/যা না পাইবার তাই কোথা পাই গো।/পাবো না, পাবো না/মরি অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটে’। আসলে কী চাই? বৃষ্টিতে ভিজে তোমার ঠাণ্ডা লাগুক, সেটাও কিছুতেই চাইতে পারি না। তাহলে যে সুস্থির থাকতে পারবো না। ‘তুমি বৃষ্টি ভিজো না/ঠাণ্ডা লেগে যাবে/পাগল হলে নাকি/আর আমার যে কী হবে’?

দু’চোখে যখন বৃষ্টির মতো অশ্রু ঝরে, তুমি যখন খবর নেওনা, তখন খুব খুব অভিমান হয়। ‘বৃষ্টি ঝরে যায়, দু’চোখে গোপনে/সখিগো নিলা না খবর যতনে/আশায় আশায় বসে থাকি তোমার পথে/সখিগো নিলা না খবর মনেতে’।
বৃষ্টিতে ভেসে ওঠে কত না বিরহগাঁথা। ভালোবাসার কান্নাটাকে যেন মুছে না দেয়, তার জন্য কত আকুতি। ‘ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁয়ো না/আমার এতো সাধের কান্নার দাগ ধুয়ো না/সে যেন এসে দেখে/পথ চেয়ে তার কেমন করে কেঁদেছি’। বাদল দিনে বিরহীর কান্না ছুঁয়ে যায় হৃদয়। ‘কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল ঝরে গো’। বৃষ্টির দিনে মনে পড়ে যায় অশ্রুভরা সেই চোখ। ‘আজ এই বৃষ্টির/ কান্না দেখে/মনে পড়লো তোমায়/অশ্রু ভরা দুটি চোখ’। মনটাও হয়ে যায় উদাসী। হারিয়ে যেতে চায় অজানায়। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে/দূর অজানায় চায় হারাতে’।

বৃষ্টি ঝরিয়ে দেয় বুকের ভেতরে থাকা চাপা কষ্ট। ‘বৃষ্টি দেখে অনেক কেঁদেছি/করেছি কতই আর্তনাদ।’ বৃষ্টি তো ধুইয়ে দেয় অভিমানও। ‘একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে/আমরা ধরা পড়ে যাবো যেনো ঠিক/ধুয়ে যাবে যত আছে অভিমান’।
বৃষ্টির দিনে কত স্মৃতি মনে পড়ে যায়। কত কষ্টের কথা। ‘একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে/মনে পড়ে যাবে সব কথা/কথা দিয়ে কথাটা না রাখা/ফেলে আসা চেনা চেনা ব্যথা’। কত কত দিন তোমাকে না দেখার স্মৃতি নস্টালজিক করে তোলে। ‘বৃষ্টি নেমেছে আজ আকাশ ভেঙে/হাঁটছি আমি মেঠো পথে/মনের ক্যানভাসে ভাসছে তোমার ছবি/বহুদিন তোমায় দেখি না যে’। বৃষ্টি নিয়ে কত কিছুই করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তাতেও মনের ক্ষতে প্রলেপ দেওয়া যায় না। বরং তোমার চলে যাওয়াটাই অনেক বেশি ক্ষতবিক্ষত করে। ‘আমি বৃষ্টি দেখেছি, বৃষ্টির ছবি এঁকেছি/আমি রোদে পুড়ে ঘুরে ঘুরে অনেক কেঁদেছি/আমার আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখার খেলা থামেনি/শুধু তুমি চলে যাবে আমি স্বপ্নেও ভাবি নি’।

এখন তো তুমি হয়ে আছো অধরা। খুব কাছাকাছি থাকো, তবুও তোমাকে ছোঁয়া যায় না। ভালোবাসাও যায় না। ‘যদি বৃষ্টি হতাম তোমায় ভিজিয়ে দিতাম/তোমাকে স্পর্শ থাকতো না অধরা…/এতটা কাছে তুমি তবুও যায় না ছোঁওয়া/এতটা ভালোবাসা তবুও হয় না দেওয়া…’।

বাদল দিনে মনে পড়ে যায় আনন্দ-বেদনার কত স্মৃতি। তোমার কি পড়ে না মনে? কখনও কখনও অকারণেই অশ্রুসজল হয়ে ওঠে চোখ। তখন তোমার কাছে যাওয়ার জন্য মনটা খুবই ছটফট করে। তোমার ডাকের জন্য কী যে আকুলতা নিয়ে অপেক্ষা করি। আমার অপেক্ষা আর ফুরায় না। ‘বাদলও দিনের প্রথম কদম ফুল’ নিয়ে শাওনের মতো করে কেউ মায়াবী কণ্ঠে বলে না, ‘যদি মন কাঁদে/তুমি চলে এসো/ চলে এসো/এক বরষায়’। হায়! এমন আমন্ত্রণের জন্য প্রতীক্ষায় প্রতীক্ষায় কেটে যায় দিন। আর অবিরত ঝরতে থাকে বৃষ্টি। ঝরতে থাকে। ঝরতে থাকে। ঝরেই যাচ্ছে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন