চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে এলপিজি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, সমস্যায় বহু ভারতীয় পরিবার

‘আজকাল রান্নাঘরের চুলা জ্বালানোর সময় আমি সবসময় উদ্বিগ্ন থাকি। আমাদের কেনা গ্যাস সিলিন্ডার যেন কমপক্ষে দুই মাস ব্যবহার করা যায় তা নিশ্চিত করতে হয় আমাকে’ ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একজন নারী গত সপ্তাহে তার একজন সহকর্মীকে এ কথা বলছিলেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সাথে এলপিজি গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে সমস্যায় পড়েছে লাখ লাখ ভারতীয় পরিবার।

তিনি সারাদিনের খাবার একবারেই রান্না করেন, কারণ তার পুরো পরিবার তার স্বামীর মাসিক প্রায় ১০ হাজার রুপি আয়ের মাধ্যমে চলে।

Reneta June

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নারী সেই লক্ষাধিক ভারতীয়দের মধ্যেই একজন যারা রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহার করছেন। যার দাম গত দেড় বছর ধরে বৃদ্ধির পর গত সপ্তাহে আবারও ৫০ রুপি বেড়ে যাওয়ায় দেশের কিছু অংশে ১৪.২ কিলোগ্রাম সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার রুপি ছাড়িয়েছে৷

বিজ্ঞাপন

গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধি ভারতে দীর্ঘকাল ধরে একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক ইস্যু ছিল। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার আগে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)সহ বিরোধী দলগুলো এর নিয়মিতভাবে বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমেছিল।

কিন্তু কোভিড মহামারির পরে মানুষের আয় কমে যাওয়া, চাকরি হারানো এবং সঞ্চয় যাওয়ায় কারণে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠে।

এছাড়া দেশটিতে খাদ্য এবং জ্বালানীর দামও বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যে গত দুই বছরের মধ্যে প্রথম সুদের হার বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে মূল্য বৃদ্ধি জনগণকে অন্যান্য অগ্রাধিকার কমাতে বাধ্য করবে।

অর্থনীতিবিদ এবং একাডেমিক হিমাংশু বলেন, ‘কোথায় খরচ কমাতে হবে সে বিষয়ে বিভিন্ন পরিবার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত থাকে, কিন্তু আমরা জানি খাদ্য এবং শিক্ষা এ দুটি খুব সাধারণ বিষয় তাই হয়তো ক্রমবর্ধমান মূল্য বৃদ্ধির সাথে তাল মেলাতে মানুষ দুধ কেনা বা তাদের বাচ্চাদের কোচিং ক্লাসের জন্য অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করার সিদ্ধান্তও নিতে পারে।’

তিনি বলেন এই দুটি বিষয়ের যেকোনো একটি বাছাই করা হলেই তা দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে।

কেন্দ্রীয় সরকার দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষদের সুবিধার্থে রান্নার জ্বালানি সরবরাহ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর উজ্জ্বল যোজনা প্রকল্প চালু করেছিল ২০১৬ সালে। তারপর পর্যায়ক্রমে তা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেশবাসী এই প্রকল্পের আওতাধীন হয়েছেন।

এই প্রকল্পের লক্ষ্য হল দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারগুলোকে কাঠের মতো উচ্চ-দূষণকারী জ্বালানি উৎস থেকে দূরে সরানো, তাদের ভর্তুকিযুক্ত এলপিজি সংযোগ এবং সিলিন্ডার দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে নিয়ে যাওয়া। ২০১৯ সালের হিসেবে সরকার বলেন এর অধীনে ৮ কোটির বেশি সংযোগ প্রদান করা হয়েছে।

কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার (সিইইডব্লিউ), থিঙ্ক-ট্যাঙ্কের ২০২০ সালের রিপোর্টে বলা হয় ভারতীয়দের প্রাথমিক রান্নার জ্বালানিতে এলপিজির ব্যবহার ২০১১ সাল থেকে মার্চ, ২০২০ পর্যন্ত ২৮.৫ শতাংশ থেকে ৭১ শতাংশ বেড়ে গেছে।

তবে এতে যে সব সমাধান হয়ে গেছিলো তা নয়, বরং গ্যাস সংকটের কারণে এসব মানুষকেও রান্না করতে ঝামেলা পোহাতে হয়েছে।

সিইইডব্লিউ-এর গবেষণা অনুসারে, গ্রামীণ ভারতের একটি পরিবার ২০২০ সালের মার্চ মাসে রান্নার জ্বালানি সংগ্রহের জন্য গড় তার মাসিক ব্যয়ের ৪.৯ শতাংশ আলাদা করে রাখতে শুরু করে।

এপ্রিল ২০২২ এর মধ্যে যখন একটি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে ৯৫০ রুপি হয়ে যায় তখন একটি পরিবারের মাসিক খরচের ১১ শতাংশ বেড়ে যায় বলে জানান সিইইডব্লিউ-এর একজন প্রোগ্রাম সহযোগী এবং গবেষণার অন্যতম লেখক সুনীল মানি।

তিনি আরও বলেন, দরিদ্র পরিবারগুলিকে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দেয়া উচিত যাতে করে এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য নিশ্চিত করা যায়।

হিমাংশু বলেন, সরকার যদি গ্যাস সিলিন্ডারের এই দাম বৃদ্ধি কমাতে না পারেন তাহলে দরিদ্র মানুষগুলো তাদের অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যে ব্যয় কমিয়ে দিবে যার ফলাফল হবে ভয়ঙ্কর এবং এর কারণে ব্যাপক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ও ঘটতে পারে।

অন্যদিকে শহুরে মানুষের কাছে এলপিজি গ্যাসের বিকল্প জ্বালানীর সুযোগ তেমন নেই। তবে এভাবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেলে গ্রামীণ মানুষেরা আবারও আগের পরিচ্ছন্ন, অস্বাস্থ্যকর জ্বালানী ব্যবস্থায় ফিরে যাবে।

ভারতে কোভিডের কারণে স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ঘটনা ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে এরই মধ্যে জ্বালানি সংক্রান্ত বিকল্প পদ্ধতি আরও ক্ষতি বয়ে আনতে পারে বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞরা।

গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ স্টাডির তথ্য মতে, ২০১৯ সালে শুধু নাগরিক বায়ু দূষণেই ৬ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

তাছাড়া গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি খুঁজে বের করাও একটি জেন্ডার রোলে প্রতিফলিত হয়, যার ভার এসে পড়ে নারীদের কাঁধেই।