চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘আর্ট অ্যাগেইনস্ট জেনোসাইড’ প্রসঙ্গে

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ এবং তাদের জীবনযাপনের লাখ লাখ আলোকচিত্রকর্ম তো দেখলাম। মাঝে মাঝে ভাবি রোহিঙ্গাদের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আর কোনদিকটা আমাদের দেখা বাকি। উত্তর পাই, যখন সালাহউদ্দিন আহমেদ পলাশের মতো তরুণ দূরদর্শী আলোকচিত্রীরা ছবির তোড়া নিয়ে টেকনাফ থেকে ফেরেন।

তাদের ছবি দেখে বিস্মিত হই, আরো কত কি দেখা বাকি! পলাশের আলোকচিত্রগুলো অন্য আলোচিত্রগুলো থেকে স্বতন্ত্র। তার ছবিতে দেশছাড়া রোহিঙ্গাদের সংগ্রামের কাহিনীর পাশাপাশি, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের আনন্দ-বেদনার জীবনযাপনের ট্র্যাক শটও আছে।

ছবিগুলো দেখে মনে হয়, দৃশ্যগুলো- মানুষগুলোকে সে একাই আবিষ্কার করেছেন। কারণ অনেকের ছবির সঙ্গে তার ছবির মিল নেই। এমনকি, অনেক ক্ষেত্রে স্থান ও সময়েরও মিল নেই। এখানেই তো শিল্পীর সার্থকতা। শিল্পী চিরাচরিত কাজে হাত দিলেও মনে হবে, এ যেন অভূতপূর্ব।

আলোকচিত্রশিল্পী পলাশের রোহিঙ্গাকেন্দ্রিক ছবিগুলো আগেও বিচ্ছিন্নভাবে দেখেছি। তবে এবার ঢাকার কসমস বুকস প্রকাশিত ‘আর্ট অ্যাগেইনস্ট জেনোসাইড’ বইটির বদৌলতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে পলাশের করা আলোকচিত্রিক তথ্যচিত্রের পুরোটা দেখা হলো। সুদৃশ্য ও আন্তর্জাতিক মানের এই বইটিতে পলাশের মোট ৪০টি ছবি রয়েছে। আর আছে চিত্রশিল্পীদের মোট ২৯টি চিত্রকর্ম। আলোকচিত্রকলার লোক হিসেবে আমার আলোচ্য বিষয় ওই সংখ্যাগরিষ্ঠ আলোচিত্রকর্মগুলো।

ভালো টাইমিং সালাহউদ্দিন আহমেদ পলাশের ছবির একটি বিশেষ দিক। তার করা ছবিগুলোকে সমৃদ্ধ করেছে রংধনু, মেঘের ভেলা ও গোধূলির সোনালি আলো। তার প্রতিটি ছবি রঙিন, রোহিঙ্গাদের সুখের কিংবা দুঃখের- উভয় মুহূর্তে উজ্জ্বল রংগুলোকে তিনি অনেক গুরুত্ব দিয়ে স্থান দিয়েছেন।

রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে সেখানকার অসহায় শিশুগুলো। সবচেয়ে
বেশি ভুগছে, বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরাই। পলাশের ৪০টি ছবির সিংহভাগেই প্রাধান্য পেয়েছে রোহিঙ্গা শিশুরা। তাদের উচ্ছ্বাস, কান্না, সংগ্রাম ও অসহায়ত্বের প্রতিফলন ছবিতে ছবিতে। অন্যদিকে শিশুদের ছবির এই আধিক্যকে আলোকচিত্রীর এই কাজের দুর্বলতা হিসেবেও চিহ্নিত করা যায়।

একটি ছবি তো আমাকে একাত্তরের মুখোমুখি করিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়ে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছিল। সেই সময় শরণার্থী শিবিরে সবার ঠাঁই হয়নি। অনেকে ঠাঁই নিয়েছিলেন সিমেন্টের বড় বড় পাইপে। রঘু রাইয়ের কিছু ছবি আছে। পলাশেরও একটি ছবি আছে। ছবিতে দেখি একই ধরণের পাইপে আশ্রয় নিয়েছে কয়েকটি রোহিঙ্গা পরিবার।

বিজ্ঞাপন

আরেকটি ছবির কথা বলতেই চাই, রাতের অন্ধকারে মরদেহের চারপাই কাঁধে নিয়ে পানি পার হচ্ছেন কয়েকজন। নীল চারপাইয়ে কাফনে মোড়া অনড় শবটি আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে গভীর অমানিশায়। ছবিটি মর্মস্পর্শী ও দুর্লভ।

কয়েকটি ছবি না থাকলে ভালো হতো বলেও মনে হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ যাত্রার কয়েকটি ছবি বেশ দুর্বল ঠেকেছে। অন্যান্য অমূল্য ছবিগুলোর সঙ্গে এগুলো খাপ খায় না। ৪০টির বদলে ৩০টি ছবি হলেও পলাশের ছবির অন্তর্নিহিত শক্তিকে অনুধাবন করতে আমাদের অসুবিধা হতো না।

নকশা ও ছাপার দিক থেকে বইটি লোভনীয় তাতে সন্দেহ নেই। তবে একটি ব্যাপার আমাকে পীড়া দিয়েছে। কোনো পাঠক-দর্শক যদি কোনো কারণে বইয়ের প্রিন্টার্স লাইনটি না দেখে এগিয়ে যান তাহলে জানতেই পারবেন না আলোচিত্রকর্মগুলো কার! কারণ ওই প্রিন্টার্স লাইনের শেষেই কেবল আলোকচিত্রীর নাম ছোট্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে। আর কোথাও নেই পলাশের নাম। ওই যে বললাম, বইটিতে ২৯টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে- সেগুলোর প্রত্যেকটির নিচে চিত্রশিল্পীর নাম রয়েছে, কোন মাধ্যমে- কোন ক্যানভাসে এঁকেছেন তারও উল্লেখ আছে।

আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে ছবির সঙ্গে ক্যাপশন তো দূরের কথা আলোচিত্রীর নামও নেই। বইয়ের সম্পাদকও আলোকচিত্রীর নাম মুখে আনেননি। তরুণ আলোকচিত্রীর ভরসা প্রিন্টার্স লাইনের তলার নামটিই। একটি দুটি ছবি না, ৪০টি ছবি! আলোকচিত্রীকে তফাতে রাখতে চাওয়াই কি এমনটি করার উদ্দেশ্য? এই বই সংক্রান্ত প্রায় সকল সংবাদও দেখলাম বইয়ের প্রকাশক ও সম্পাদককে কেন্দ্র করে আবর্তিত।

বাংলাদেশে আলোকচিত্র ও আলোকচিত্রী উভয়ই অব্যাহতভাবে অবহেলা-অযত্নের শিকার। তাদের অবদান ও গুরুত্বকে খাটো করার মানসিকতা এদেশে খুবই সাধারণ ও পুরোনো। মুখে অনেক বড় কথা বলা হয়, বাস্তবে থাকে আলোকচিত্রীদেরকে অস্বীকার করার হীনতা। এজন্যই অনেকে আক্ষেপ করে বলে থাকেন, আলোচিত্রশিল্পীর জন্ম যেন বাংলাদেশে না হয়। এই বইটিতেও কি সেই মানসিকতার ছায়া পড়লো?

কসমস বুকসের কাছে আমার প্রত্যাশা অনেক। তাদের প্রকাশিত বইগুলো আমাকে আশাবাদী ও
অনুপ্রাণিত করে।কসমস বুকসের একজন গুণগ্রাহী হিসেবে তাদের কাছ থেকে আলোকচিত্রশিল্পীদের জন্যআরেকটু উদারতা প্রত্যাশা করতেই পারি। আর আশা রাখি, এমন উন্নত মানের প্রকাশনা অব্যাহত
থাকবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন