চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমার জীবনের পরতে পরতে বাসুদার অবদান: ফেরদৌস

ভারতীয় সিনেমার প্রখ্যাত নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার বাসু চ্যাটার্জী মারা গেছেন বৃহস্পতিবার সকালে। বার্ধক্যজনিত কারণেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর। বলিউডের দাপুটে নির্মাতাদের একজন ছিলেন তিনি। অমিতাভ বচ্চন, ধর্মেন্দ্র থেকে শুরু করে ভারতীয় অভিনেতা প্রসেনজিতরা তার পরিচালনায় কাজ করেছেন। তবে বাংলাদেশের দর্শকের কাছে তিনি পরিচিত ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ নামের ছবির জন্য। যে ছবিতে বাংলাদেশ থেকে অভিনয় করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন চিত্রনায়ক ফেরদৌস!

এই ছবির পর থেকেই বাসু চ্যাটার্জীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো ফেরদৌসের। ফেরদৌসের ভাষায়, ‘ডিরেক্টর-হিরোর সম্পর্ক ছাপিয়ে আমাদের সম্পর্ক রূপ নিয়েছিলো পিতা-পুত্র, বন্ধু কিংবা গুরু-শিষ্যের সম্পর্কে!’

সেই সম্পর্ক নিয়ে ফেরদৌস খোলাখুলি কথা বলেছেন চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে…

করোনাকালের এই সময়ে কেমন চলছে আপনার?
বলা যায় মোটামুটি ভালোই ছিলাম এতোদিন, কিন্তু আজকে মনটা ভীষণ রকমের খারাপ! বাসুদার (বাসু চ্যাটার্জী) মৃত্যু সংবাদ সব কেমন উলট পালট করে দিলো!

বিজ্ঞাপন

হ্যাঁ, এটা মন খারাপের। আর আপনার জন্যতো বটেই! উনার সাথে কি যোগাযোগ ছিলো আপনার?
আমার সঙ্গে বাসুদার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। পারিবারিকভাবে যোগাযোগ ছিল আমাদের। এই যে গেল সপ্তাহেও তার মেয়ের সাথে কথা বলছিলাম, আমাকে জানাচ্ছিলেন যে বাসুদা অসুস্থ। শরীর ঠিক নেই, চলাফেরা করতে পারছেন না। সার্বক্ষণিক খবর রাখছিলাম ওনার শারীরিক অবস্থার।

বিজ্ঞাপন

‘হঠাৎ বৃষ্টি’ তো আপনার কিংবা বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রের জন্যই একটি দারুণ ব্যাপার। তো এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে পাঠকের কৌতুহল থাকে এমন গুণী নির্মাতার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা জানতে! উনাকে আপনি কেমন দেখেছেন?
বাসুদার সাথে আমার প্রথম দিন থেকেই কিন্তু ডিরেক্টর-হিরোর সম্পর্ক ছিল না! এটা কীভাবে হয়েছে জানি না! তার সাথে ছিল আমার পিতা-পুত্রের সম্পর্ক, একটা বন্ধুর সম্পর্ক, বলা যায় একটা গুরু শিষ্যের সম্পর্ক- এরকম ব্যাপার সবসময় আমাদের মধ্যে ছিল। ওই প্রথম দিন থেকে আমি ওনাকে নির্মাতা হিসেবে দেখিনি।

তার সাথে আপনার প্রথম সাক্ষাৎ কোথায় হয়?
ঢাকার গুলশান ক্লাবে প্রথম আমাদের দেখা। ওই দিনই তিনি আমাকে ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র স্ক্রিপ্ট দিয়ে দিলেন। তারপর কলকাতা নিয়ে গেল, তার বাসায় নিয়ে গেলেন। তিনি আমাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র কস্টিউম কিনে দিলেন। আমরাই সব কিনেছি। সেই তখন থেকেই আমাদের মধ্যে যে অদ্ভুত রিলেশন হলো, রিলেশনটা গত সপ্তাহ পর্যন্ত কন্টিনিউ ছিল ছিল। এরমধ্যে আমরা আরও কয়েকটা সিনেমার শুটিং করলাম, সামনে আরেকটা সিনেমা করার কথা ছিল। এই বয়সেও কাজ করতে চাইতেন, কাজপাগল একজন মানুষ ছিলেন তিনি।

এই নব্বই উর্ধ্ব বয়সেও?
হ্যাঁ, এটা একটা বিরাট ব্যাপার। ২০১৯ সালে তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা। তখনো তিনি নতুন সিনেমার বিষয়ে কথা বলছিলেন। অথচ তখন তার শরীর খারাপ, উঠতে-বসতে গেলেও আরেকজনের সহায়তার প্রয়োজন হয়! তখন আমাকে বাসুদার ফ্যামিলি থেকে জানানো হলো আমি যেন উনাকে অনুৎসাহিত করি। যেন বলি সিনেমাটা আমি করতে পারবোনা। তারা আমাকে বললেন ‘আমরা বললে উনি শুনবেন না, তুমি বললে শুনবে।’ আসলে বাসুদা আমাকে পুত্রসম মনে করতেন। ওনার দুই মেয়ে ছিল, ছেলে ছিল না। আমাকে উনি অনেকবার বলেছেন ‘তুমি বম্বে (মুম্বাই) চলে আসো। বোম্বাইতে হয়তো নতুন যারা আছে তাদের স্ট্রাগল করতে হয়। থাকার জায়গা থাকে না, মেস করে থাকে বা কারো সাথে রুম শেয়ার করে থাকে কিন্তু তোমার তো এই সমস্যা হবে না। তোমার তো একটা বাড়ি বোম্বাইতে আছেই। এখানে চলে আসো এখানে থেকে ট্রাই করো।’-সারাক্ষণ উনি এভাবে আমাকে মেন্টাল সাপোর্ট দিয়েছেন সেই শুরু থেকে। ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র সেই প্রথম দিনের পর থেকেই তার এই অভিভাবকত্ব, এই স্নেহ-মমতা আমার প্রতি চলমান ছিলো! ‌

এরকম সম্পর্ক তো বিরল!
যখন আমার নিজের একটু অবস্থান হলো, তখন তিনি আমাকে বলতেন ‘তোমাকে কিন্তু একদিন প্রযোজকও হতে হবে।’ ঠিকই তার হাত ধরে আমি প্রযোজকও হয়ে গেলাম একদিন। আমি প্রথম যে সিনেমাটা প্রযোজনা করি তার নাম ‘হঠাৎ সেদিন’। পরে যেটা আমি চ্যানেলে আইয়ে দিয়েছি।

আসলে বাসুদার সাথে আমার একটা অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক অন্য কাউকে বুঝানোটা টাফ। যেটা ফিল্মের মানুষের মধ্যে খুব কম গড়ে উঠতে দেখেছি। ছোট্ট একটা ঘটনা বলি, তিন চার বছর আগে আমি মুম্বাই গিয়েছি। গিয়ে দেখি এয়ারপোর্টে বাসুদা দাঁড়িয়ে আছেন! আমাকে রিসিভ করতে বাসুদা নিজেই চলে এসেছেন! কী কাণ্ড! তখন আমাকে বাসুদার দুই মেয়ে জানালেন যে, উনি খুব রিয়ার যে কাউকেই এয়ারপোর্টে পিকআপ কিংবা ড্রপ করতে যান! আমি সেই সৌভাগ্যবান ছিলাম! আমাকে সেদিন এয়ারপোর্ট থেকে সোজা উনার বাসায় নিয়ে গেলেন, হোটেলে উঠতে দেননি। মানে তার সাথে ব্যতিক্রমধর্মী একটা সম্পর্ক ছিল।

করোনাকালে উনার সাথে আপনার কথা হয়েছে?
জানিনা কেন করোনার সময়টায় আমি বারবার তার খবর নিচ্ছিলাম। অনেকদিন ধরেই তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। দু-একটা শব্দ বলতে পারছিলেন কেবল। আসলে স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছিলো দিনকে দিন এবং কথা বলতেও প্রবলেম হচ্ছিল। চোখের সামনে আমি দেখলাম এমন একজন প্রাণশক্তি সম্পন্ন মানুষ কীভাবে নিঃশ্বেষ হয়ে গেল! প্রাকৃতিকভাবেই তিনি চলে গেলেন, প্রচুর স্মৃতি তিনি রেখে গেলেন আমাদের জন্য। এমন একটা সময়ে তিনি চলে গেলেন যে তাকে শ্রদ্ধা জানাব সেটাও সম্ভব হলো না, সবকিছুই এখন ভার্চুয়ালি করতে হচ্ছে।

হ্যাঁ। খুব খারাপ সময় এখন। এরআগে ইরফান খান, ঋষি কাপুরদের শেষ কৃত্যানুষ্ঠানও খুব অল্প সময়ে শেষ করতে হয়েছে…!
তবে এরমধ্যে একটা কাকতাল ঘটে গেছে। তিনি যখন আমাকে নিয়ে তার প্রথম কাজ করছিলেন, মানে ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ ছবিটির প্রথম দিনের শুট যেদিন শুরু হয়, সেদিন হঠাৎ করে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছিলো। বৃষ্টিতে একাকার ছিলো সেদিনটি। আজকে যখন বাসুদার শেষকৃত্য হচ্ছে তখনও তুমুল বৃষ্টি পড়ছিল মুম্বাইতে। আমাদের এখানেও। মানে বৃষ্টিতেই শুরু বৃষ্টিতেই শেষ!

‘হঠাৎ বৃষ্টি’ করার পর আপনার সাথে বন্ধু, পিতা-পুত্র কিংবা গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিন্তু তার আগে তো আপনার কোনো কাজ ছিলো না। নতুন একজন তরুণকে কেন ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র মতো ছবিতে তিনি কাস্ট করেছিলেন, আপনি কি তার কাছে কখনো জানতে চেয়েছিলেন?
হ্যাঁ, তাকে আমি জিজ্ঞেস করেছি। আমার মত একজন তরুণ ও অপরিচিতকে তিনি কেন তার ছবির জন্য কাস্ট করলেন! তো যা জানলাম বাসুদার সাথে সবসময় একটা ডায়েরি থাকতো। ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ করার সময়ও তার সাথে সেটি ছিলো। সে ডায়েরিতে অন্তত ৩০ জন খ্যাতিমান অভিনেতার নাম ছিল। যাদেরকে ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র সম্ভাব্য নায়ক হিসেবে ভাবা হচ্ছিলো। তো ডায়েরি দেখে দেখে তিনি সেই তারকা অভিনেতার সঙ্গে দেখা করেছেন। তাদের সাথে মিট করতেন আর নাম কেটে দিতেন। তার আরেকটা মজার ব্যাপার ছিল যে ডায়েরিতে সেই নামগুলোর পাশে মন্তব্য লিখে রাখত। ছোট ছোট নোট রাখত সব সময়। উড়িষ্যা মুম্বাই এবং বাংলা থেকে ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র চরিত্রদের বাছাই করছিলেন। অডিশন নেয়ার মতো করে আরকি! তো ওই লিস্টে ওই সময়ে আমার নাম থাকারতো কোনো প্রশ্নই আসে না। তখন শুধুমাত্র আমি সালমান শাহ মরে যাওয়ার পর ‘বুকের ভিতর আগুন’ সিনেমার শুটিং শুরু করেছি। ওই সময়ে পত্রিকায় দেখলাম যে বাসু চ্যাটার্জি বাংলাদেশে আসছেন, জয়েন্ট ভেঞ্চারে সিনেমা করবেন বলে। আর সেই সময়েই হাবিব আঙ্কেল এবং সারোয়ার মোর্শেদ আমাকে ফোন দিলেন, বললেন ‘কালকে সকালে গুলশান ক্লাবে আসো।’ তো আমি তাদের মত প্রোডিউসারদের ফোন পেয়ে মোটামুটি সারপ্রাইজড! কথা মতো ওই সময়ে পরদিন গেলাম গুলশান ক্লাবে। গিয়ে দেখি শাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে বসে আছেন একজন লোক, দেখেই বুঝলাম যে তিনিই বাসু চ্যাটার্জী। পরিচয় হওয়ার পর তিনি আমাকে বললেন, ‘দেখো আমি একটা সিনেমা বানাচ্ছি সিনেমার নাম ‘হঠাৎ বৃষ্টি’, তুমি কি ড্রাইভিং পারো?’। আমি বললাম একটু একটু জানি। তখন তিনি আমাকে বললেন ‘ড্রাইভিং শিখে নাও।’ আর বললেন ‘এই ছবিতে তিনজন নায়িকা একজন নায়ক নায়ক, নায়কের চরিত্রটি তুমি করবে। এই নাও স্ক্রিপ্ট!’ পুরো বিষয়টা আমার কাছে অদ্ভুদ ঠেকলো। রীতিমত স্বপ্নের মত। পরবর্তীতে বাসুদাকে এই বিষয়টা আমি জিজ্ঞেসও করেছি যে, ‘দাদা, তুমি জীবনে প্রথম একটা বাংলা সিনেমা করছো, তুমি বলিউডের এতো বড় একজন ডিরেক্টর, কতো নায়ক তোমার সাথে কাজ করতে চাচ্ছে। কিন্তু তুমি আমাকে নিয়ে কেন ওই সময় কাজ করলে?’ আমার প্রশ্নের উত্তরে বাসুদা বলেছিলেন ‘আসলে আমিও জানিনা ওই মুহূর্তটার কথা। আমার কাছে মনে হয়েছে ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র অজিত চরিত্রটার যে সারল্য, সরলতা। তোমার মধ্যে সেটা আছে। তোমাকে প্রথম দেখেই কথা বলে তোমার মধ্যে সেই সারল্য, সে সরলতাটা পেয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হচ্ছিলো প্রিয়াঙ্কার সাথে তোমাকে অদ্ভুত ভাবে মানিয়ে যাবে! এরপর আমি কিছু ভাবি নি তোমাকে কাস্ট করেছিলাম মুহূর্তেই!’

মুহূর্তে ইমপ্রেসড হওয়ার বিষয়টাও দারুণ…
বাসুদার সাথে আমার এবং আমার সাথে বাসুদার অদ্ভুত একটা কমফোর্ট জোন ছিল। রাগ অভিমান ক্ষোভ সবই করতেন তিনি আমার সাথে। তবে এসবে আমি কোনো রিয়েক্ট করতাম না। কারণ তার সবই আমার ভালো লাগতো। তারচেয়ে বড় কথা তিনি ছিলেন একেবারে স্ট্রেটফরওয়ার্ড, কোন কিছু পেছনে বলতো না। গীবত যেটাকে বলে। তো এই বিষয়টা উনার কাছ থেকে আমি শেখার চেষ্টা করেছি। মানুষের পেছনে কিছু না বলা, মানুষের দোষ ত্রুটি গুণ সবকিছুই সামনাসামনি বলার অভ্যেস।

এখন এসে আমার জীবনের পেছনে ফিরে যদি তাকাই, তখন বাসুদাকেই দেখি আসলে। আমার শুরুটা যখন, তখন তো আমি কেবল স্টুডেন্ট! তো তখন থেকেই আমার জীবনের পরতে পরতে তার অবদান। প্রতিটা জিনিসই আমি তার কাছ থেকে শিখেছি। কঠিন পরিস্থিতি কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হয়, সব তার কাছ থেকে শিখেছি। আমার অন্য ছবির শুটিং থাকলেও তিনি কলকাতায় চলে আসছেন মাঝেমধ্যেই। গল্প হতো তার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা।

অভিভাবক হারানোর মতোই শোক আজ আপনার!
পরিচয় হওয়ার পর থেকে তার সাথে আমার সম্পর্কটা যেমন ছিল, গত সপ্তাহ পর্যন্ত ঠিক একই রকম ছিল। আমি যখন সিনেমাতে পারিশ্রমিক হিসেবে টাকা নেওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দিলাম, তখনও তিনি আমাকে পাত্তাই দিতেন না! পরবর্তীতে যখন উনার সাথে কাজ করেছি তিনি আমাকে বলতেন ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ সিনেমায় যে টাকা দিয়েছি তোকে, সেই পরিমাণ টাকাই দেবো। আমিও মজা করে বলতাম দাদা মাঝখান থেকে কিন্তু দশটা বছর চলে গেছে! আসলে আমাদের সম্পর্কটা সেই ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র সময়ে আটকে ছিল! সবকিছু নিয়ে মজা করে কথা বলার অসম্ভব হিউমার ছিলো তার। উইট, তার সেন্স অফ হিউমার এর কোন তুলনা হয় না। এগলো খুব মিস করবো।