চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমাদের অন্ধ গলি এবং সত্যজিৎ এর পোস্টার

Nagod
Bkash July

নির্মাতা সত্যজিৎ রায়কে আমরা যখন চিনতে শুরু করছি। তখন আমাদের কাছে ছিল সিডি-ডিভিডি আর ভারত-বাংলাদেশের টেলিভিশনের বাংলা চ্যানেল। ঢাকার নিউমার্কেটের এক সরু গলি, আলো-আঁধারের মধ্য দিয়ে যা পৌঁছে যেত সিডি আর ক্যাসেটের দোকানে। আমি কৈশোরে সেখানে খুঁজে পেয়েছিলাম সত্যজিৎ রায়-এর চলচ্চিত্রের সিডি-ডিভিডি। এরপর খুঁজে পাই আজিজ সুপার মার্কেটে। তো সেই সিডি-ডিভিডির কাভারে লো রেজ্যুলেশনে প্রকৃত রঙ খুঁজে পাওয়া না পাওয়ার মাঝেই খুঁজে পাই সত্যজিৎ রায়-এর চলচ্চিত্রের পোস্টারগুলো। তখনই পোস্টারগুলো আমাকে ভীষণ আকৃষ্ট করতো।

Reneta June

পরবর্তীতে যখন আরও জানার সুযোগ হল তখন জানতে পারি এরমধ্যে অধিকাংশ পোস্টারের ডিজাইনই শিল্পী সত্যজিৎ রায় নিজে করেছেন। সত্যজিৎ রায় এর পোস্টার ডিজাইনে খুঁজে পাওয়া যায় ইউরোপিয়ান আর্ট ট্যাকনিকের সাথে আমাদের এই উপমহাদেশের স্বকীয়তার মিশেল। সত্যজিৎ রায় ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে যেমন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন ঠিক তেমনি একেক প্রেক্ষাপটে নির্মিত চলচ্চিত্রের জন্য খুঁজে নিয়েছেন একেক ধরনের পোস্টার ডিজাইন বা স্টাইল।

চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু কিংবা চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানের সাথে মিল রেখে বদলে গেছে সত্যজিৎ এর পোস্টার ডিজাইনের ধরন কিংবা টাইপোগ্রাফিও।

‘পথের পাঁচালী’র পোস্টার লক্ষ্য করলে দেখা যায় অপু-দুর্গা এবং তাদের মা এক বৃত্তে আবদ্ধ। এবং সেই বৃত্তটিও বাংলার আবহমান কালের যে আলপনাচিত্র, সেই আলপনাচিত্র দিয়ে আঁকা। এর মাঝে মাছ, পাখি, সূর্যের মোটিফ যেমন শিশু-হাতের অঙ্কনের একটা অনুভূতি সৃষ্টি করে আমাদের মনে তেমনি আবার গ্রামীণ পটভূমিকেও কিন্তু এটা প্রতিনিধিত্ব করে।
‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রের যে অন্তর্গত নির্যাস, তা কিন্তু এই পোস্টারে উদ্ভাসিত।

চারুলতা- র পোস্টারে আমরা দেখতে পাই ব্রাশস্ট্রকে প্রটাগনিস্টের মুখচ্ছবি এবং ‘চারুলতা’র টাইপোগ্রাফিতেও চারুলতা চরিত্রের সূচীকর্মের শৈল্পিকতার যে বৈশিষ্ট্য তা বিদ্যমান। মিনিমালিস্টিক এপ্রোচের নান্দনিক একটি উদাহরণ সত্যজিৎ রায় এর ‘চারুলতা’ চলচ্চিত্রের এই পোস্টারটি।

মহানগর-এর পোস্টারে এই চলচ্চিত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দৃশ্যের ঝলক দেখা যায়। চরিত্র আরতী যখন লিপস্টিক দিচ্ছে ঠোঁটে। যখন আরতী স্বাবলম্বী, নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে, চাকরি করছে, নিজের পছন্দ অপছন্দকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছে। সেই মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে পোস্টার। শুধু তাই নয়, রঙ নির্বাচন এবং রঙের গাঢ়ত্বও এখানে বিবেচনার বিষয়। লিপস্টিকের লাল রঙ পোস্টারের অন্য রঙগুলোর চেয়ে তীব্রভাবে ফুটে আছে স্বাধীন আত্মনির্ভরশীল এ চরিত্রের প্রতিচ্ছবি হয়ে।

দেবী-র পোস্টার সত্যজিৎ এর আলোচিত একটি পোস্টারের অন্যতম। আমার এখনো মনে আছে এই পোস্টারটা ডিভিডির কাভারে দেখে ডিভিডিটা হাতে নিয়েছিলাম আমি প্রথম। মাতৃরূপের যে বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখি শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত দয়াময়ীর মাঝে, তা এখানে পোস্টারেই প্রকাশিত। মুখচ্ছবির এক পাশ আলোকিত আরেক পাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন, এক পাশে কালীরূপী দয়াময়ী আর আরেক পাশে বাংলার চিরন্তন বধূরূপী নারী। সবচে দুর্দান্ত হচ্ছে দু’দিকের চোখের দৃষ্টির পার্থক্য। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বধূরূপী দয়াময়ীর এক দিকে টানা টানা স্নিগ্ধ চোখ আর আরেক দিকে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। এবং দেবী-র টাইপোগ্রাফিটাও মন্দির এবং আগুন এ দু’টো ভাবনার সম্মিলনে সৃষ্ট বলে মনে হয়।

গণশত্রু-র পোস্টারে একটা জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। স্যাটায়ার হিসেবে প্রোটাগনিস্ট এর মুখমন্ডল বড় করে দেখানো হচ্ছে এবং কমিক এফেক্ট নিয়ে আসা হয়েছে। এ পোস্টারের টাইটেলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে উত্থিত আঙুলগুলো স্থান করে নিয়েছে পোস্টারে যা প্রোটাগনিস্টকে ‘গণশত্রু’ হিসেবে পোস্টারেই চিহ্নিত করে তোলে।

নায়ক-এর পোস্টারে সেলিব্রিটি, স্টারডম এসমস্ত মাথায় রেখে অনেকটা পেপার কাটিং এফেক্ট নিয়ে আসা হয়েছে। নায়ক চলচ্চিত্রে প্রোটাগনিস্টের বর্ণিল জীবন এবং অতীতের স্মৃতি মগজে গেঁথে যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করা হয় পোস্টারের টুকরো টুকরো উজ্জ্বল কালার এবং সাদা-কালো মুখচ্ছবি কিন্তু তারই বহিঃপ্রকাশ।

‘নায়ক’ এর মতো ‘প্রতিদ্বন্দী’ এবং ‘সীমাবদ্ধ’ চলচ্চিত্রের পোস্টারেও এই কোলাজ ফর্ম দেখা যায়। তবে তুলনামূলকভাবে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র পোস্টারকে আমার কাছে অধিক আকর্ষণীয় বোধ হয়।

সত্যজিৎ – এর ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র দু’ধরনের পোস্টার পাই আমরা। অরণ্য বা বন-অরণ্য তথা প্রকৃতিকে সিল্যুট এর মাধ্যমে উপস্থাপন করে যে পোস্টার তাতে অরণ্যই প্রোটাগনিস্ট। অরণ্য এবং চাঁদ এর প্রতিচ্ছবি সেখানে প্রকৃতিকেই চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করে। অরণ্যই এখানে প্রধান বিষয়। এবং পোস্টারই অরণ্য বা বনকে এখানে চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করছে, নিয়ে আসছে। সেই সাথে টাইপোগ্রাফিতেও যে ধাঁচ তা অরণ্যের গাছের ডালগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অন্য পোস্টারটিতে পূর্বের পোস্টারগুলোর মতোন চরিত্রের মুখচ্ছবি দেখতে পাই।

এরপর যে পোস্টার নিয়ে বলছি এটা আমার খুব প্রিয় একটা পোস্টার। সত্যজিৎ রায় এর ‘ঘরে বাইরে’ চলচ্চিত্রের পোস্টার। এই পোস্টারে লাইট এন্ড শ্যাডো, আলো-ছায়া এবং ডেপথ ও কনট্রাস্ট যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তাতে প্রোটাগনিস্টের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান প্রকাশ পায়। চরিত্রের মনস্তত্ত্বের সাথে মিলিয়ে আমরা এই পোস্টারে রঙ, আলো আর আবছায়া দেখতে পাই যা পোস্টার ডিজাইনের নান্দনিকতাকে উপস্থাপিত করে। আলোকজ্জ্বল বাইরের পরিবেশ যা মুক্ত স্বাধীনতার আস্বাদ হিসেবে চিহ্ণিত আর অপরদিকে ঘরের ভেতরের অন্ধকারাচ্ছন্ন আবহ যা আমাদের তথাকথিত সামাজিক অবকাঠামো বা সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরছে। আর দরজা যেখানে উন্মুক্ত সেখানে দরজার উপরে কী সুন্দর রঙিন কাচের টুকরো, যা বর্ণিল এক বহির্জগতের টান হিসেবে উদ্ভাসিত যেন! এই যে সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বোধকে পোস্টার ডিজাইনে প্রকাশ করা এটা কিন্তু সত্যজিৎ রায় এর পোস্টার ডিজাইনের দারুণ বিষয়।

শিল্পী এবং নির্মাতা সত্যজিৎ রায় পোস্টার ডিজাইনের ক্ষেত্রে একই ফর্মে না থেকে সিনেমার বিষয়বস্তু এবং সামগ্রিক নির্মাণ বিবেচনায় পোস্টারের ডিজাইন করেছেন। সত্যজিৎ-এর বৈচিত্র্যময় পোস্টার ডিজাইন চলচ্চিত্র এবং চলচ্চিত্রের পোস্টারের মধ্যকার মেলবন্ধন নিয়ে আমাদের ভাবতে শেখায়।

BSH
Bellow Post-Green View