চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আইনপ্রণেতার আইনভঙ্গের প্ররোচনা

টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকারে থাকা আওয়ামী লীগ দলীয় আরও এক সাংসদ শাহীন চাকলাদার সম্প্রতি সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। ইতিবাচক ভাবে নয়, তার আলোচনায় আসা মূলত সন্ত্রাসের উসকানি দেওয়ার মাধ্যমে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তিনি বোমা মেরে একজন পরিবেশকর্মীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা এঁকেছেন। থানার ওসিকে বদলির ভয় দেখিয়ে সন্ত্রাসের প্ররোচনা দেওয়া এই এমপির বিরুদ্ধে সরকারি দল আওয়ামী লীগ কোনো কথা বলেনি। তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে দৃশ্যমান হয়নি। অর্থাৎ তার এই উগ্রবাদী মানসিকতা আওয়ামী লীগকে বিব্রত করেনি, দলের একজন নেতার এমন প্রকাশ্য হয়ে পড়া গোপন ষড়যন্ত্রকে তারা আশকারা দিচ্ছে। ভাগ্যিস, এমপির ওই মোবাইল কথোপকথন ফাঁস হয়েছে; তা না হলে কে জানে থানায় বোমা হামলা হয়ত হতো, এরপর হয়ত পরিবেশকর্মীকে নাশকতাকারী অভিযোগে গ্রেপ্তার করত পুলিশ!

শাহীন চাকলাদার এবারই প্রথম সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন এমন না। আগেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার দুর্নীতির প্রতিবেদন এসেছে। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির হোতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সময়ে তার সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের খবর প্রকাশিত হয়েছিল একাধিক গণমাধ্যমে। তার বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগের ফিরিস্তিও প্রকাশ্যে এসেছিল, দুদকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের চিঠিও গিয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তিনি থেকে গেছেন অধরা। জমি দখল, চোরাচালান সিণ্ডিকেট, মাদক ও অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ কী নেই তার বিরুদ্ধে? এমপি হয়ে যাওয়ার পর রাতারাতি কোটিপতি হয়ে পড়ার নানা আলোচনা আছে যশোরে। আইনপ্রণেতা হয়েও আইন ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সংসদেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন যশোরের আরেক সাংসদ। এতকিছুর পরও তার কিছুই হয়নি। ফলে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেছেন তিনি। সবশেষ যশোরের পরিবেশ আন্দোলনকর্মী অ্যাডভোকেট সাইফুল্লাহকে ফাঁসাতে তার বিরুদ্ধে ‘ডাকাতির উদ্দেশ্যে বোমা হামলা’র মামলা করতে থানার ওসিকে ফোনে নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি কেশবপুর থানার ওসি জসিম উদ্দিনের মুঠোফোনে কল করে থানায় বোমা মেরে সাইফুল্লাহকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার প্ররোচনা দেন শাহীন চাকলাদার। এনিয়ে সাইফুল্লাহ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, পরিবেশকর্মী সাইফুল্লাহ সম্প্রতি যশোরের ‘মেসার্স সুপার ব্রিকস’ নামে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা একটি ইটভাটার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সহায়তায় রিট করেন। আদালত থেকে ইটভাটার বিরুদ্ধে নির্দেশনা আসে, আর এতে তার ওপর ক্ষিপ্ত হন স্থানীয় যশোর-৬ আসনের এমপি শাহীন চাকলাদার। এমপি ফোন করে ওসির কাছে জানতে চান যে তিনি ‘সাতবাড়িয়ার সাইফুল্লাহ’কে চেনেন কি না। জবাবে ওসি বলেন, ‘ওই ইটভাটার একটা বিষয় নিয়ে সাইফুল্লাহ বেলায় যেয়ে মামলা-টামলা করে আর কী। বাজে একটা ছেলে স্যার।’ জবাবে সাংসদ শাহীন চাকলাদার ওসিকে বলেন, ‘আপনি এখন রাত্তিরে থানায় বোম মারেন একটা। মারায়ে ওর নামে মামলা করতে হইবে। পারবেন? আপনি থাকলে এগুলো করতে অইবে। না অইলে কোন জায়গায় করবেন? আমি যা বলছি, লাস্ট কথা এডাই। ঘটনা হচ্ছে, আপনি যদি পারেন ওই এলাকা ঠান্ডা রাখতি, আমি বন ও পরিবেশ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য। ওখানে কারো বাপের ক্ষমতা নেই। তাহলে এ (সাইফুল্লাহ) বারবার যেয়ে কেন করে, আপনি কী করেন?’ কথোপকথনের ওই পর্যায়ে ওসি বলেন, ‘ও (সাইফুল্লাহ) তো স্যার হাই কোর্টের কাগজ নিয়া আসে বারবার।’ এরপর এমপি বলেন, ‘আরে কোথার হাই কোর্ট-ফাইকোর্ট। কোর্ট-ফোর্ট যা বলুক, বলুগ্যা। আমাদের খেলা নাই?’ এমপি শাহীন চাকলাদার এরপর সাইফুল্লাহকে ফাঁসানোর নির্দেশ দিয়ে ওসিকে বলেন, ‘আপনে ওকে যেকোনোভাবে যেকোনো লোক দিয়ে কাইলকে যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটায়ে কালকে এটা কাজ করতে হবে, ওকে?… যেকোনো ভাটায় যেয়ে, দরকার হলি পুলিশের লোক যেয়ে সিভিলে যেয়ে বোম ফাটায় দিয়ে চলে আসুক। এখানে হামলা করেছে ডাকাতি করার জন্য। এটা ছিল অমুক। একটা বানাই দিলে হয়া গেল।’

শাহীন চাকলাদার

কী ভয়ঙ্কর নির্দেশনা! একজন আইনপ্রণেতা শৃঙ্খলাবাহিনীর একজন সদস্যকে বোমা মেরে অন্যকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছেন! এখানে তিনি তার পরিচয় দিচ্ছেন প্রথমত একজন এমপি হিসেবে, দ্বিতীয়ত পরিচয় দিচ্ছেন বন ও পরিবেশ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে। এরচেয়ে বড় ক্ষমতায় অপব্যবহার আর কী হতে পারে! সাংসদ শাহীন চাকলাদারের সন্ত্রাসবাদের এই প্ররোচনা দেওয়ার সময়ে তিনি যে সংসদীয় কমিটির পরিচয় দিচ্ছেন সেটা পরিবেশ বিষয়ক, আর এই সংসদীয় কমিটির সদস্য হয়েও তিনি সন্ত্রাসবাদের উসকানি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশবিনাশী কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন এবং অন্যকে প্ররোচিত করছেন। এখানে বন ও পরিবেশ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির নাম ভাঙিয়ে পরিবেশবিনাশী ভূমিকার কারণে এই কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী ও সদস্য পরিবেশমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত। তবে দুঃখের বিষয় হলো এই কমিটিও অন্য অনেকের মত টু-শব্দটিও করেনি।

সাংসদ শাহীন চাকলাদারের এই কর্মকাণ্ড সত্ত্বেও তার দল আওয়ামী লীগকে বিব্রত হতে দেখা যায়নি। এটা স্পষ্টত রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবেশবিনাশী কর্মকাণ্ড হলেও তার বিরুদ্ধে দলীয় ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ অভিযোগও ওঠেনি। অথচ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ‘দলের কোনো সদস্য আওয়ামী লীগের আদর্শ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, গঠনতন্ত্র ও নিয়মাবলী বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের পরিপন্থী কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করিলে’ তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদ যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে বলে গঠনতন্ত্রে উল্লেখ রয়েছে, যদিও কী সেই ব্যবস্থা সেটার উল্লেখ নাই। তবে এখানে শোকজ, সাময়িক বহিস্কারসহ সাংগঠনিক যে সকল শাস্তির বিধান প্রচলিত সেগুলোর কোনোটিই আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেনি। ফলে শাহীন চাকলাদার আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদ হিসেবে রাষ্ট্র ও সমাজবিরোধী কাজ করেও সাংগঠনিকভাবে শাস্তির মুখে পড়েননি। সাংসদ হিসেবে তিনি কোন জবাবদিহির আওতায় আসেননি।

বিজ্ঞাপন

শাহীন চাকলাদার একা কি রাষ্ট্র ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছেন? হিসাব মেলালে আরও অনেককেই একই কাতারে ফেলা যায়। দল ও সংসদ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বা কোনোধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে কদিন পর পর একেকজন একেক ভূমিকায় নেমে দলকে বিব্রত করে চলেছেন। আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদদের যে যত বড় অপরাধই করুক না কেন তারা যে আইন-আদালত ও দলীয় শাস্তির বাইরে সেটা প্রায় প্রমাণ হয়েই গেছে। ফলে একেকজন শাহীন একেক সময় আবির্ভূত হন। হাজি সেলিম, আসলামুল হক, এনামুল হক, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, তামান্না নুসরাত বুবলি- খুঁজতে গেলে এমন আরও অনেকের নাম উল্লেখ করাই যায়। লক্ষ্মীপুরের সাংসদ কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল ত কুয়েতের একটি আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্তও হয়েছেন। এই সাংসদদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, দখলদারি, নারী কেলেঙ্কারি, পরীক্ষায় জালিয়াতি, অর্থপাচার, মানবপাচারসহ অনেক অভিযোগ রয়েছে। অথচ এতকিছু সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে দল যেমন ব্যবস্থা নেয়নি, তেমনি সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতায় সংসদও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

নির্বাচন কমিশন ভবন

নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন আয়োজন নিয়ে ভূমিকা, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শৃঙ্খলার অভাবের কারণে এখন দলীয় সাংসদদের অনেকেই নিজেদের অবস্থানকে চিরস্থায়ী ভাবতে শুরু করেছেন। এতে করে তাদের মধ্যে বেপরোয়া ভাব চলে এসেছে। জবাবদিহি না থাকার এই পরিবেশ তাদেরকে সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে প্ররোচিত করছে। এতে করে আইনপ্রণেতা হয়েও তাদের কেউ কেউ অন্যকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডেও প্ররোচনা দিচ্ছেন। এতে করে সমাজে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে এর দায় দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এড়িয়ে যেতে পারে না।

শাহীন চাকলাদার এমপি সন্ত্রাসবাদের উস্কানি দেওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি যে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠবেন সেটা হলফ করেই বলা যায়। এছাড়া আইনবিরোধী সরাসরি উস্কানি দেওয়ার পর কেবল তিনিই নন দেশের সকল সাংসদের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ণ হয়েছে। সাংসদের নামের আগে সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত ‘মাননীয়’ শব্দটাও তার এবং আরও অনেকের কারণে ক্রমশ অলঙ্কার হারাচ্ছে।

‘সন্ত্রাসের উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগে এই দেশে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের অনেক নেতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ বাদী হয়ে অনেক মামলা করেছে। সেই সব মামলার স্বাভাবিক আইনি প্রতিবিধানের পাশাপাশি সরকার তাদের হয়রানিও করছে বলেও অভিযোগ আছে। কিন্তু শাহীন চাকলাদার এমপি পুলিশকে সরাসরি বোমা মারার প্ররোচনা দেওয়ার পরেও এটা নিয়ে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেনি। পুলিশকে সন্ত্রাসবাদে উসকানি দেওয়ার কারণে দায়িত্বশীল মন্ত্রীও এনিয়ে কথা ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেননি। স্রেফ নিজেদের লোক বলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ। মাত্র কয়েকজনের এই অপরাধের দায় তখন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও সরকারের ওপরও বর্তায়।

সন্ত্রাসের উসকানিদাতা এই সাংসদের বিরুদ্ধে আইনি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নিলে ব্যক্তি শাহীন চাকলাদারই কেবল লাভবান হবেন, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ কি পারবে না ব্যক্তি ও দলীয় অনুরাগের বাইরে এসে সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থকে বড় করে দেখতে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন