চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অস্ট্রেলিয়ায় লিগ কাঁপানো ক্রিকেটার উপেক্ষিত নিজ দেশেই

বাংলাদেশ দলে টিকে থাকতে না পারার হতাশা থেকে সম্ভাবনার নতুন পথ তৈরি করেছেন ক্রিকেটার জান্নাতুল ফেরদৌস সুমনা। ২০ বছরের এ তরুণী অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়ে সিডনি ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলেছেন মেয়েদের নিউ সাউথ ওয়েলস প্রিমিয়ার লিগে। ওয়ানডে লিগে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটিকে চ্যাম্পিয়ন করাতে টাইগ্রেস অলরাউন্ডার বলে-ব্যাটে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

সুমনার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সিইও বরাবর মেইল পাঠিয়েছেন সিডনি ওমেন্স ক্রিকেট ক্লাবের চেয়ারম্যান গ্রেইগ হিলি। বিসিবির সম্মতি পেলে পরের মৌসুমের জন্যও তাকে রাখতে চায় দলটি।

বিজ্ঞাপন

নিজ দেশে উপেক্ষিত সুমনা সিডনি ক্রিকেট ক্লাবে সতীর্থ হিসেবে পেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য এলিসা হিলি ও র‌্যাচেল হেইনেসকে। ছিলেন ইংলিশ ক্রিকেটার জেনি গান। এই ত্রয়ী সিডনি থান্ডার্সের হয়ে বিগ ব্যাশে প্রতিনিধিত্ব করেন।

তাদের কাছে শেখার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ক্রিকেট প্রশিক্ষক রস টার্নার ও সাবেক লেগস্পিনার স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের অধীনে কয়েকটি অনুশীলন সেশন করেছেন সুমনা। নিজেকে তৈরি করেছেন পুরোদস্তুর অলরাউন্ডার হিসেবে। লিগের ১২ ম্যাচে নিয়েছেন ১৭ উইকেট। করেছেন ২৪০ রান। ওপেনার হিসেবে নেমেছেন একাধিক ম্যাচে।

বিসিবির সিইও নিজাম উদ্দিন চৌধুরীকে পাঠানো বার্তায় গ্রেইগ উল্লেখ করেছেন, ‘অলরাউন্ডার হিসেবে সুমনার উন্নতি সত্যিই দুর্দান্ত। একজন অফস্পিনার হিসেবে তার বোলিংয়ে বিরাট টার্ন ও অসাধারণ বৈচিত্র্য রয়েছে। মাঠে তার পরিশ্রম, ক্ষিপ্রতা, শক্তিশালী ব্যাটিং টেকনিক ও ম্যাচ রিড করার ক্ষমতা অসাধারণ। কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যাটে রান করা ও জুটি গড়ে তুলে বড় দলের বিপক্ষে একাধিক জয়ও এনে দিয়েছে সে।’

প্রিমিয়ার লিগ দিয়ে ক্রিকেট মৌসুম শেষ হয়ে গেলেও সুমনা সারাবছর সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এসসিজি) অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন, এমন জানিয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ জাতীয় দলের একজন উঠতি ক্রিকেটারকে ভবিষ্যতের জন্য গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পেরে দারুণ খুশি ক্লাবের কোচ-কর্মকর্তারাও।

বাংলাদেশি বোলার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেও এত টার্ন পাবেন, এমনটা ভাবেননি অজি দলের উইকেটরক্ষক-ব্যাটার এলিসা হিলি। টার্নের জন্য অন্য সতীর্থদের মুখ থেকেও সুমনা পেয়েছেন প্রশংসাবাক্য। চ্যানেল আই অনলাইনকে টাইগ্রেস অলরাউন্ডার শুনিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেট জার্নির সেসব কথাই।

২০১৫ সালে বিকেএসপির গণ্ডি পেরোনোর আগেই জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পান সুমনা। কয়েকটি সিরিজে থাকেন স্ট্যান্ডবাই হিসেবে। অফস্পিনিং অলরাউন্ডার হিসেবে মূল দলে দ্রুত জায়গা হলেও আন্তর্জাতিক অভিষেকের জন্য অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘদিন। ২০১৮ সালের মে মাসে সাউথ আফ্রিকা সফরে অভিষেক। খেলেন দুটি ওয়ানডে ও একটি টি-টুয়েন্টি। লাল-সবুজ জার্সি গায়ে জড়ালেও মূল যে কাজ সেই বোলিংটাই পাননি!

বিজ্ঞাপন

তিন ম্যাচের কোনটিতেই সুমনার হাতে বল তুলে দেননি অধিনায়ক। অভিষেক ওয়ানডেতে সাতে নেমে আউট হন রানের খাতা খোলার আগেই। দ্বিতীয় ম্যাচে করেন ১ রান। একমাত্র টি-টুয়েন্টিতে ব্যাটিং-বোলিং কিছুই পাননি। পরের মাসে মালয়েশিয়ায় হওয়া এশিয়া কাপের দলেও ছিলেন। খেলা হয়নি কোনো ম্যাচ। পরে আয়ারল্যান্ড সফরের দল থেকে ছিটকে পড়েন।

আর ডাক মেলেনি জাতীয় দলে। অস্ট্রেলিয়ায় টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য ৩০ জনের ফিটনেস ও ফিল্ডিং ক্যাম্পে অংশ নেন সুমনা। স্ট্যান্ডবাইসহ ১৮ জনের তালিকাতে ঠাঁই পাননি তিনি। তার দাবি, ফিল্ডিং ও ফিটনেস ক্যাম্পে ভালো করলেও কেনো ১৮ জনেও ছিলেন না তার ব্যাখ্যা দেননি কেউ।

‘প্রাউড করার জন্য বলছি না, ফিটনেস ও ফিল্ডিংয়ে সেরা কয়েকজনের মধ্যেই ছিলাম। অন্যান্য সময় দল ঘোষণার আগে খুব চিন্তা হয়, কিন্তু বিশ্বকাপ দলে থাকা নিয়ে খুব বেশি ভাবিনি। থাকব, এটি একরকম ধরেই নিয়েছিলাম। কিন্তু ১৮ জনেও নিজের নাম না দেখে হোঁচট খাই। কেনো আমি নেই, সেই ব্যাখ্যা পাইনি। কোথায় ঘাটতি সেটিও জানতে পারিনি। সবাই বলেছে তোমার বয়স কম, সামনে অনেক সময় পড়ে আছে। সান্ত্বনার চেয়ে বেশি জরুরি ছিল ঘাটতির জায়গা ধরিয়ে দেয়া। সেটি কেনো ম্যানেজমেন্টের কেউ করেননি আজও আমার কাছে রহস্য হয়েই আছে।’

‘হতে পারে দলে অফস্পিনার বেশি। সালমা আপু, কুবরা আপু আছে। তিনজন অফস্পিনার দলে রাখা কঠিন। যদি ব্যাপারটা এমন হয় তাহলে তো আফসোসের খুব বেশিকিছু নেই। আমি বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবেই বাংলাদেশ দলে আসি। আক্ষেপের জায়গা এটাই যে তিন ম্যাচে একটি বলও করিনি। নিজেকে প্রমাণের সুযোগই পেলাম না। স্বীকার করছি প্রথম সিরিজে ব্যাটিং ভালো করতে পারিনি। সাউথ আফ্রিকার কঠিন কন্ডিশন বুঝে উঠতে পারিনি। তখনও আমি পুরোপুরি অলরাউন্ডার হয়ে উঠিনি। হলেও বোলিংটাই তো আমার মূল ছিল। সেটিই পাইনি।’

সাত মাসে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট সংস্কৃতির সঙ্গেও দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছেন সুমনা। বিসিবিকে পাঠানো বার্তায় সেটি উল্লেখও করেছেন গ্রেইগ। সিডনিতে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ পড়ে থাকলেও সুমনা চাইছেন নিজ দেশের হয়েই প্রতিনিধিত্ব করতে। জাতীয় দলের ক্যাম্পে ফের ডাক পাওয়ার আশা নিয়ে তৈরি করছেন নিজেকে।

একবছরের স্পোর্টস ভিসা নিয়ে সুমনা অস্ট্রেলিয়া যান গত বছরের শেষদিকে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে ফিরবেন দেশে। জাতীয় দলে ডাক না এলে ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে আবার যাবেন অস্ট্রেলিয়ায়। বিকেএসপি থেকে এইচএসসি শেষ করা এ ক্রিকেটার ভর্তি হবেন সিডনির কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাশাপাশি চালিয়ে যাবেন ক্রিকেট। প্রিমিয়ার লিগের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ, ইংল্যান্ডের ফ্র্যাঞ্চাইজি আসর কেআইএ ‍সুপার লিগ খেলার লক্ষ্য নিয়ে আগাবেন।

বিসিবির উইমেনস উইং প্রধান শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় সালমা-রুমানাদের খেলা দেখতে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে সুমনা সম্পর্কে অবগত হয়েছেন তিনি, হয়েছে আলাপও।

বিসিবি পরিচালক ও মেয়েদের ক্রিকেটের অভিভাবক শফিউল আলম চ্যানেল আই অনলাইনকে বললেন, ‘সিডনিতে সুমনা একটি বাঙালি পরিবারের সঙ্গে থাকে। মার্চে বিশ্বকাপের সময় সরাসরিই কথা হয়েছে। জেনেছি সে খুব ভালো করছে ওখানে। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ভালো পারফর্ম করা সহজ ব্যাপার না। ওখানকার অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা দারুণ। শেখার অনেক সুযোগ রয়েছে। আরও কিছুদিন যদি কাজ করে তাহলে মন্দ কী। আমাদেরই তো লাভ। যেহেতু সে বাংলাদেশ দলে খেলেছে ও সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার, আশা করি প্রক্রিয়া অনুযায়ী সিলেকশনের জন্য অবশ্যই বিবেচনায় চলে আসবে।’