চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সময়টা ১৯৭১ হোক বা ২০১৮, আজকেও সমস্যাটা সেই একই: আলফনসো

অভিনয়শিল্পী প্রফেশনাল না হলেও আমার কিছুই যায় আসে না। ‘রোমা’র প্রধান চরিত্র নির্বাচন সম্পর্কে নির্মাতা আলফনসো কুয়ারন…

বাংলাদেশ সময় ২৫ ফেব্রুয়ারি ভোর বেলায় পর্দা উঠছে বহুল প্রতীক্ষিত অস্কার অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের ৯১তম আসরের। এই আসরে সবার দৃষ্টি থাকবে ম্যাক্সিকান নির্মাতা আলফনসো কুয়ারনের বিশ্বব্যাপী আলোচিত ছবি ‘রোমা’র দিকে। ছবিটি ইতোমধ্যে আসন্ন অস্কারে সর্বোচ্চ ১০টি বিভাগে মনোনয়ন নিয়ে আলোচনার শীর্ষে। এছাড়াও আলোচনার আরেকটি কারণ, ছবিটি নেটফ্লিক্সের!

২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া তুমুল আলোচিত ও প্রশংসিত ছবি ‘রোমা’। বিভিন্ন প্রেস্টিজিয়াস চলচ্চিত্র উৎসবেও বাগিয়ে নিয়েছে সেরার পুরস্কার। গেল বছর ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এর তালিকায় এক নম্বরে স্থান করে নিয়েছিলো আলফনসোর ‘রোমা’। তখন ছবিটি নির্মাণ নিয়ে বিস্তারিত একটি সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলেন পত্রিকায়। অস্কার অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে সেই সাক্ষাৎকারটিই চ্যানেল আই অনলাইন পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করা হলো:

অভিনন্দন আলফনসো। ‘রোমা’ ২০১৮ সালে গার্ডিয়ানের তালিকায় এক নম্বর চলচ্চিত্র। কেমন লাগছে?
দারুণ , সত্যি দারুণ! দ্য গার্ডিয়ান থেকে এই প্রাপ্তি, বিশাল ব্যাপার। খুবই খুশি লাগছে আমার।

আপনি ‘রোমা’কে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
এটা একটা দেশ ও পরিবারের এক বছরের গল্প। আমার জন্য, এই চলচ্চিত্রটিকে ব্যাখ্যা করা সবসময়ই কঠিন। এটা একটা পদ্ধতি ছিল যে ক্লিও (গৃহপরিচালকা চরিত্রটি) কে সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা, তার ক্ষতগুলো উপলব্ধি করা যা পারিবারিক এবং সামাজিক ছিল। তারপর আমার মনে হল এই ক্ষতগুলোকে আমি মেক্সিকোর অনেক মানুষের সাথেই ভাগ করে নিতে পারি। আর তারপর আমার মনে হল যে এটা মানবতারও ক্ষত।

‘রোমা’ আপনার গৃহিপরিচালিকা লিবো-র প্রতি একটি ভালোবাসার চিঠিস্বরূপ। তিনি এ নিয়ে কী ভাবছেন?
তিনি এটা দুই থেকে তিনবার দেখেছেন। এটা উনার অনেক পছন্দ! অনেক কেঁদেছেন দেখতে দেখতে। সুন্দর ব্যাপারটা হল, যখন তিনি কেঁদেছেন এজন্য নয় যে তার সাথে কী কী ঘটলো তা নিয়ে তিনি ভাবছিলেন, তিনি ভাবছিলেন বাচ্চাগুলোর কথা। নিজের বেদনার প্রতি তার মনোযোগ কমই ছিল।

আলোচিত ‘রোমা’র একটি দৃশ্য

‘রোমা’র গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হল আপনার মা-বাবা। তাঁরা দেখেছেন এ চলচ্চিত্র?
না, তিন বছর আগে আমার বাবা মারা গেছেন আর মা ২০১৮ সালের শেষের দিকে। আমি একটা কাট মাকে দেখিয়েছিলাম। সেই কাট-এ এটুকু স্পষ্ট ছিল যে সিনেমা প্রায় শেষের দিকে, সেজন্যই একটা স্ক্রিনিং এর ব্যবস্থা করেছিলাম। মা, লিবো আর আমার ভাই-বোনদের জন্য পোস্ট প্রোডাকশন কাজের মধ্যে থাকা অবস্থাতেই। যখন আপনার মা-বাবা মারা যাবেন আপনি সমস্তকিছুকেই অন্যভাবে দেখতে শিখবেন। রোমান্টিসিজমের মধ্য দিয়ে যাওয়া যায় তখন অথবা অন্য কোন দিকে ভাবা যায় ভাবনাগুলো। চিঠির চাইতেও বেশি কিছু এসব আমার কাছে।

আপনি যেভাবে শৈশবের মুহূর্তদের দৃশ্যবন্দী করেছেন তা আমাকে স্টিভেন স্পিলবার্গ এবং ভিকটর এরিস এর কথা মনে করায়। আপনি কি তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত?
তাঁরা তো আমার ডিএনএ-তেই আছেন। আমার জেনারেশনের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উপর স্পিলবার্গের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। আমি তাঁকে ভালোবাসি। এরিস এর ‘Spirit of the Beehive’ তো শৈশব নিয়ে বানানো চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে মাস্টারপিস ছিল। গিয়ের্মো দেল তোরো ও এই চলচ্চিত্রের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন।

একটা সিন ছিল ‘রোমা’তে, বাবা চরিত্র যখন গাড়ি পার্ক করার চেষ্টা করছেন গ্যারাজে তখন বাচ্চারা দেখছে এটা আমাকে ক্লোজ এনকাউন্টার-এর ইউ.এফ.ও ল্যান্ডিং এর কথা মনে করিয়ে দেয়। এটা কি ইচ্ছে করে করা?
হা হা হা হা। মজার ব্যাপারটা। আমি কখনোই সে কথা ভাবিনি। কিন্তু আমি সেটা দেখতে পারি। ওটা মূলত ‘দ্য এরাইভাল অন দ্য মুন অফ দ্য স্পেসশিপ’ (২০০১) থেকে উৎসাহিত হয়ে করা।

এটা কি সত্যি যে, আপনি যথার্থ ক্লিও কে খুঁজে পেতে একটু সমস্যাতেই ছিলেন?
হ্যাঁ, আমরা এক বছর ধরে খুঁজছিলাম। কিছুতেই সঠিক অভিনয়শিল্পী খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কখনো কখনো আমি এমন নারীদের সাথে দেখা করেছি যারা দেখতে লিবো-র মতো আবার কখনো বা এমন কারও কাছে গিয়েছি যিনি লিবোর মতোন একজন মানুষ। আমি সত্যিই সৌভাগ্যবান যে আমি জালিৎজা আপারিচিওকে খুঁজে পেয়েছিলাম। তাৎক্ষণিকাভবেই কেমন মনে হচ্ছিলো উনাকেই দরকার। জালিৎজা আপারিচিও-এর সাথে পারিবারিক সেই সম্পর্কগুলোর বোঝাপড়া, উনার জ্ঞান, বোঝার ক্ষমতা সব মিলে যাচ্ছিলো। তারপর আমি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লাম কারণ জালিৎজা আপারিচিও বললেন তিনি আগ্রহী নন। তাই কিছু সপ্তাহ এই টেনশনে গেলো যতদিন না উনি রাজি হচ্ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

ক্লিও চরিত্রটি কোন প্রফেশনাল অভিনয়শিল্পীকে দিয়ে অভিনয় না করানোর পেছনে নির্দিষ্ট কারণ কী ছিল?
আমার এতে কিছুই যায় আসে না অভিনয়শিল্পী প্রফেশনাল না কি প্রফেশনাল নন। আমি কেবল চাইছিলাম তারা যেন দেখতে এবং অনুভব করতেও আমার চরিত্রের মতোনই হোন। একটা কথা বলে রাখা ভাল, আমি কিন্তু প্রফেশনাল অভিনয়শিল্পীদের সাথেও দেখা করেছি ক্লিও চরিত্র খোঁজার সময়। জালিৎজা তাদের কারও মধ্যে ছিলেন না।

‘রোমা’র বিহাইন্ড দ্য সিনে নির্মাতা আলফনসো…

কোন অভিনয়শিল্পীই স্ক্রিপ্ট দেখতে পান নি শুনলাম। আপনার খারাপ লাগে নি এই যে জালিৎজাকে জানতে দেননি আগে যে তার একটা সিন আছে সন্তান প্রসব দানের?
হ্যাঁ। তিনি ফোঁপাচ্ছিলেন বার বার। আমি এটা নিতে পারছিলাম না। আমি দ্রুত থামালাম আর বললাম ‘কাট কাট আমি সরি, সরি সরি।’ তিনি কাঁদছিলেন আর বললেন – ‘আমিতো ভাবলাম আপনি সত্যিকারের বাচ্চাই নিয়ে আসতে চাইছেন দৃশ্যের মধ্যেই।’ পরে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, খুব বেশি বেশি হয়ে গেল কি? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন – ‘আমি জানি আপনি এমনটা কেন করেছেন, কিন্তু সত্যি স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো ব্যাপার ছিল।’ জালিৎজা সত্যিকারের রিএকশন দিতে চাইছিলেন, এটা অসাধারণ ব্যাপার!

আপনি কি কেনলোচ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন চিত্রনাট্যের ক্ষেত্রে?
দেখুন আপনি স্পিলবার্গ, লোচ, এরিস এর কথা বলছেন, আমি একটা কথাই বলতে চাই। উনারা সবাই ই আমার ডিএনএ তে আছেন। এটা প্রথম চলচ্চিত্র যা আমি কোনরকম প্রভাব ছাড়াই করতে চেয়েছি। এবং প্রথম চলচ্চিত্র যেটাতে উদ্দ্যেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু করতে চাইনি। যতবারই মনে হয়েছে কোন শট অন্য কোন চলচ্চিত্রের মতো মনে হচ্ছে আমি বদলে ফেলেছি। আমার প্রোডাকশন ডিজাইনার (Eugenio Caballero) আমাকে যখনই বলেছে ‘কেন বদলাচ্ছেন? কী দারুণ শটটা!’ আমি বলেছি – ‘হ্যাঁ এটা সুন্দর কারণ এটা আমার না।’ আবার নতুন শট নিলেই সে বলেছে ‘এটা বোরিং।’ আমি বলেছি ‘হ্যাঁ এটা বোরিং কিন্তু এইবার এটা আমার!’

শেষ পর্যন্ত ‘তুমি কে’ তা থেকে পালানো খুবই কঠিন। আমি ব্যক্তি হিসেবে কে আর চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেই বা কে সেটা খুবই দ্বিধা-দ্বন্দ্বময় যেহেতু অন্য অনেকের ডিএনএ-এর কথা বলেছি অনেকবার।

‘রোমা’ চলচ্চিত্রে একটা ছেলে মনে করে সে আগেও এখানে বসবাস করেছে, সেটা কি আপনি?
না সেটা আমার ভাই। ছোটবেলা ও সবসময় বলতো – ‘যখন আমি বড় ছিলাম…’ আমি সেই ছেলেটা যে তার মায়ের চড় খেয়েছিলাম।

আপনি কি হতাশা অনুভব করেন কখনো যে নেটফ্লিক্স এটাকে খুব কম থিয়েটারেই/ সিনেমা হলেই যেতে দিয়েছে? না কি এটার পেছনে বড় কোন সুবিধাও আছে?
আমি নিশ্চয় চেয়েছিলাম আরও হল এ যাক সিনেমাটা। কিন্তু কী জানেন প্রত্যেকেই সাদা-কালো, মেক্সিকান-স্পেনিশ এই ফিল্টার চোখে লাগিয়ে ব্যাপারটা দেখে, নেটফ্লিক্স অন্তত সেটা করে না। আমি খুশি যে ভার্চুয়ালি প্রতিটা থিয়েটারই এটি দেখালো। এতে বোঝা যায় সিনেমা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতাগুলো অনলাইন স্ট্রিমিং এর সাথে বেমানান নয়। কিন্তু নিশ্চয় আমি মনে করি ‘রোমা’র মতো চলচ্চিত্রগুলো হলেই মুক্তি পাওয়া উচিত। ইতালি এবং পোল্যান্ডে ৬০টা হল পেয়েছিলাম আমরা। এটা দুঃখজনক যে যুক্তরাজ্যে এতোটা হল পাওয়া যায়নি।

‘রোমা’র বিহাইন্ড দ্য সিনে নির্মাতা আলফনসো…

‘রোমা’ কী করে নিজের শৈশবকে এখন অন্যরকমভাবে দেখতে শেখায় ?
শুধু আমার শৈশব না, এটা অনেক দিক নিয়েই এখন আমাকে ভাবায়। আমার নিজস্ব জটিলতা সেই সময়কে ঘিরে, সেই সামাজিক বিভাজন, এক শ্রেণির সাথে অন্য শ্রেণির সম্পর্ক, শুধু আমার দেশের জন্যই এসব সত্য এরকম নয় কিন্তু ব্যাপারটা! সমস্ত বিশ্বের জন্যই সত্য এসব।

‘রোমা’র কোন দৃশ্যটা ব্যক্তিগতভাবে সবচে দুঃখের-কষ্টের মনে হয়?
অনেক দৃশ্য! কিন্তু সবচে কষ্ট দিয়েছিল যে দৃশ্য সেটা হল মধ্যবিত্ত পরিবারের সেই মুহূর্তগুলো। ১৯৭১ সালের পরিপ্রেক্ষিতে বানানো চলচ্চিত্র এটা আর সে সময় থেকেই সামাজিক সমস্যাগুলো বৃহৎ আকার ধারণ করে। খুবই কষ্টকর এসব। তারপর আমরা গৃহপরিচারিকাদের অধিকারের ব্যাপারে কথা বললাম, আমরা ভালো সংবাদ ও পেলাম যে তাদের আইনগতভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। কিন্তু ভয়ঙ্কর কী জানেন! রেসিস্ট কমিউনিটি, টুইটারে তাদের কমেন্ট। যখন জালিৎজা ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনের কাভার হল, চিন্তাও করতে পারবেন না কী পরিমাণ রেসিস্ট কমেন্ট চারপাশে উঠছিল এটা সম্পর্কে। তো ১৯৭১ হোক আর ২০১৮? আজকেও সমস্যাটা সেই একই!

বিজ্ঞাপন