গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষের চার বছর পর চীন ও ভারতের মধ্যে বিতর্কিত সীমান্ত টহলের বিষয়ে একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করে, এই চুক্তির মধ্য দিয়ে ২০২০ সালে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘাতকে কেন্দ্র করে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা দূর করা সম্ভব হবে।
এনডিটিভি জানিয়েছে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিটে বলেছিলেন, এর ফলে ভারতীয় ও চীনা সৈন্যরা সীমান্ত এলাকায় টহল দিতে সক্ষম হবে যেভাবে ২০২০ সালের মে মাসের আগে দিত।
এই চুক্তির বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি গতকাল সোমবার নয়া দিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতীয় ও চীনা কূটনীতিক এবং সামরিক কর্মকর্তারা একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন এবং এই আলোচনার ফলস্বরূপ ভারত-চীন সীমান্তে এলএসি বরাবর টহল দেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছে। যা ২০২০ সালে উত্থাপিত সমস্যাগুলোর সমাধানের দিকে নিয়ে গেছে।’
চুক্তিটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ানে চীন-ভারতের সামরিক বাহিনীর মধ্যকার সংঘর্ষে কমপক্ষে ২০ ভারতীয় ও ৪ জন চীনা সেনা নিহত হন। এতে ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়। সেই ঘটনার পর দুই পক্ষই পার্বত্য অঞ্চলটি হাজার হাজার সেনা, আর্টিলারি, ট্যাংক এবং যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে। এই চুক্তির ফলে ওই অঞ্চলটি উত্তেজনা কমবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এই চুক্তিটি ডেপসাং সমভূমি এবং ডেমচোকের মতো পয়েন্টে সম্ভাব্য সংঘর্ষ কমিয়ে এলএসি বরাবর পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সহায়তা এবং আলোচনার জন্য একটি অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করবে। এলএসি বা লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বাংলায় যাকে বলা হয়, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা। মূলত ভারত ও চীনের মধ্যকার সীমান্তকে নির্দেশ করে এলএসি।
ভারতের উত্তর-পশ্চিমের লাদাখ থেকে পূর্ব দিকের অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত চীন-ভারতের মধ্যে ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত আছে। এই সীমান্ত ইস্যুতে ১৯৬২ সালে দুই দেশের মধ্যে একদফা যুদ্ধ হয়েছে। একাধিকবার চীনা সেনারা এই সীমানা অতিক্রম করে ভারতে অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে দিল্লি অভিযোগ করেছে।
চুক্তিটি উচ্চ-স্তরের কূটনৈতিক যোগাযোগকে সহজ করতে পারে, যেমন আন্তর্জাতিক ফোরামে নেতাদের মধ্যে সম্ভাব্য বৈঠক এবং সামরিক দ্বন্দ্বের বাইরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত করতে। ভারতের জন্য এর অর্থ হতে পারে সংঘাতের তাৎক্ষণিক হুমকি ছাড়াই সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়নের আরও ভাল ব্যবস্থাপনা নির্মাণ। চীনের জন্য এটি অন্যান্য বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে ভারতের সাথে তার সীমান্ত স্থিতিশীল করার জন্য একটি কৌশলগত উপায়ও হতে পারে।
গালওয়ান সংঘর্ষের পটভূমি
দুই দেশের মধ্যে সীমান্তের এই এলাকা ভালভাবে চিহ্ণিত নয়। এই গালওয়ান উপত্যকার আবহাওয়া অত্যন্ত বৈরি, সেই সাথে এর অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক ওপরে। এলাকাটি যে কোনরকম ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে থাকে, যা স্পষ্ট সীমানা নির্ধারণকে আরও কঠিন করে তোলে।
২০২০ সালের ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় ভারতীয় ও চীনা সৈন্যরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই ঘটনাটি ১৯৭৫ সালের পর এই অঞ্চলে প্রথম মারাত্মক সংঘর্ষ এবং উভয় পক্ষেরই হতাহতের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সৈন্য মারা গেলেও চীনা হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন দাবি করা হয়। সীমান্তের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং এলএসি সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা এই সংঘর্ষের সূত্রপাত করেছিল।
অন্যান্য বিতর্কিত এলাকা
গালওয়ান ছাড়াও নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর অন্তত চারটি বিতর্কিত এলাকা রয়েছে যেখানে ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারতীয় ও চীনা সৈন্যরা লড়াই করেছিল।
ডেমচোক: ডেমচোক এর পশ্চিম অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ভারত। পূর্ব দিকটি চীনের নিয়ন্ত্রণে। তবে চীন পশ্চিম অংশও নিজেদের বলে দাবি করে।
প্যাংগং: প্যাংগং হ্রদের প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা তিব্বতে (চীনা নিয়ন্ত্রণে), ৪০ শতাংশ লাদাখে এবং ১০ শতাংশ বিতর্কিত।
হট স্প্রিংস: গোগরা পোস্টের কাছে অবস্থিত হট স্প্রিংস এলাকাটি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটির কৌশলগত অবস্থান। এই অঞ্চলের ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ আকসাই চিনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য উপযুক্ত।
ডেপসাং: দৌলত বেগ ওল্ডি (ডিবিও) এয়ারস্ট্রিপ এবং দারবুক-শিওক-ডিবিও সড়কে কৌশলগত অবস্থানের কারণে ডেপসাং সমভূমি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভারতের উত্তর সীমান্ত প্রতিরক্ষা এবং সামরিক গতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।









