ফিলিস্তিনি ছিটমহল গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান গড়িয়েছে দুই বছরেরও বেশি সময়। এই সময়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে উপকূলীয় ভূখণ্ডটি। আবাসন ও অবকাঠামোর বড় অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রাণ হারিয়েছেন ৭০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি। বেঁচে থাকা মানুষগুলো আজ খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয়ের চরম সংকটে শীতের সঙ্গে লড়াই করছে।
এই প্রেক্ষাপটেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে থাকা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিয়েছেন। গাজার পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা তদারকির উদ্দেশ্যে এই বোর্ড গঠনের কথা বলা হলেও এতে ইসরায়েলের প্রকৃত অভিপ্রায় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্নটি এখন আর শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, ইসরায়েল আদৌ গাজাকে পুনর্গঠন করতে চায়, নাকি ধ্বংসের মধ্য দিয়েই বর্তমান বাস্তবতা ধরে রাখতে আগ্রহী?
নেতানিয়াহুর দ্বিধার রাজনীতি
এ বছরের শেষ দিকে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন। ফলে আন্তর্জাতিক মহল ও দেশীয় জনমতের সামনে গাজা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করার চাপ রয়েছে নেতানিয়াহুর ওপর। তবে একই সঙ্গে তাকে ধরে রাখতে হচ্ছে তার শাসক জোট—যেখানে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের মতো কট্টর ডানপন্থি নেতারা গাজার পুনর্গঠন তো দূরের কথা, যুদ্ধবিরতিরই বিরোধী।
স্মোট্রিচ ও তার ধর্মীয় ইহুদিবাদী মিত্ররা গাজাকে ‘ঐশ্বরিক অধিকারভুক্ত ভূমি’ হিসেবে দেখে সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের পক্ষে। ফলে বোর্ড অব পিস বা আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানের ধারণা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
বাস্তবতাও নেতানিয়াহুর অনুকূলে যাচ্ছে না। হামাস নিরস্ত্রীকরণে রাজি না হলেও ট্রাম্পের তিন ধাপের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। তার আপত্তি সত্ত্বেও গাজার রাফাহ ক্রসিং খুলে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে মানুষ যাতায়াতের সুযোগ পাবে। একইভাবে বোর্ড অব পিসে তুরস্ক ও কাতারের অন্তর্ভুক্তি এবং গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনাও যুক্তরাষ্ট্র উপেক্ষা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা নাকি বসতি?
ইসরায়েলের ভেতরেই গাজা প্রশ্নে বিভক্তি স্পষ্ট। স্মোট্রিচ মার্কিন প্রস্তাবকে ‘ইসরায়েলের জন্য ক্ষতিকর’ আখ্যা দিয়ে যুদ্ধবিরতি তদারকির দায়িত্বে থাকা দক্ষিণ ইসরায়েলের একটি মার্কিন ঘাঁটি ভেঙে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে বহু রাজনীতিক গাজা নয়, বরং আসন্ন নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতেই বেশি মনোযোগী।
নেতানিয়াহু বারবার বলছেন, হামাসকে নিরস্ত্র করাই ইসরায়েলের লক্ষ্য। সেই সঙ্গে গাজার সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক ধ্বংস চালিয়ে একটি গভীর বাফার জোন তৈরির কাজ চলছে। যদিও হামাস পুরোপুরি অস্ত্র হারায়নি, তবু সংগঠনটি দুর্বল হয়েছে—এমন বর্ণনা দিয়ে ইসরায়েল সরকার নিজেদের জনগণের কাছে ‘নিরাপত্তা নিশ্চিতের’ দাবি তুলে ধরছে।
দুই বছরের যুদ্ধের ক্লান্তিতে ইসরায়েলি সমাজেও এক ধরনের উদাসীনতা তৈরি হয়েছে। জাতীয় গণমাধ্যমে গাজার মানবিক বিপর্যয় প্রায় অনুপস্থিত।
জনমত ও অদৃশ্য ফিলিস্তিনিরা
আমেরিকান-ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডাহলিয়া শেইন্ডলিন বলেন, গাজা ও বোর্ড অব পিস নিয়ে ইসরায়েলি সমাজ গভীরভাবে বিভক্ত। তার ভাষায়, “একটি ছোট গোষ্ঠী গাজায় পুনর্বাসনের পক্ষে থাকলেও অধিকাংশ মানুষ গাজাকে ভয় ও নিরাপত্তা উদ্বেগের চোখে দেখে—২০২৩ সালের অক্টোবরের ঘটনার ছায়া এখনো প্রভাব ফেলছে।”
তার মতে, ইসরায়েলিরা চায় গাজায় ইসরায়েলের কোনো না কোনো উপস্থিতি থাকুক, তবে শাসনের দায়িত্ব বাইরের শক্তির ওপর থাকুক। একই সঙ্গে অনেকেই আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু করতে পারবে যা দুই বছরের যুদ্ধ পারেনি।
শান্তি কর্মী গেরশন বাসকিন আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “তাদের কোনো কৌশল নেই। সবকিছু বিশৃঙ্খল। নেসেট এখন পাগলাটে ঘর।” তার অভিযোগ, গাজায় নিহত লক্ষাধিক মানুষের বাস্তবতা ইসরায়েলি জনপরিসরে কার্যত অদৃশ্য।
রাষ্ট্রহীন ভবিষ্যৎ?
একটি বিষয়ে ইসরায়েলি রাজনীতির বড় অংশ একমত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র হবে না। তবে সেই লক্ষ্য কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কিংবা গাজা তার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবে তা স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি যাই হোক না কেন, ইসরায়েলকে গাজার পাশেই থাকতে হবে—এমন একটি ভূখণ্ডের পাশে, যার জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সহাবস্থানের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই; রয়েছে কেবল এই সন্দেহ যে, বাইরের শক্তিরাও আদৌ জানে না, কীভাবে এটি সম্ভব।

ইসরায়েলি আইনপ্রণেতা ওফার কাসিফ বলেন, গণহত্যা থামেনি—এটি কেবল সক্রিয় থেকে নিষ্ক্রিয় পর্যায়ে গেছে। বোমা কম পড়ছে, কিন্তু মানুষকে অনাহারে ও শীতে ফেলে রাখা হচ্ছে। এটা সরকারের নীতি।
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভারের মতে, ইসরায়েলি নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় অক্ষম। তার ভাষায়, স্মোট্রিচদের একটি পরিকল্পনা আছে। বসতি স্থাপন ও ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় সবকিছুই স্বল্পমেয়াদি, সংকটকেন্দ্রিক।
অনিশ্চয়তার গাজা
অসলো চুক্তির সময়কার মধ্যস্থতাকারী গেরশন বাসকিন কিছুটা আশাবাদী। তার মতে, এই প্রথম এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আছেন, যাকে ইসরায়েল সরাসরি ‘না’ বলতে পারছে না।
তবে কাসিফ সেই আশাবাদে আস্থা রাখতে পারছেন না। তার ভাষায়, এই বোর্ড অব পিসে আমার কোনো বিশ্বাস নেই। এটি কেবল সময়ক্ষেপণ, আর এই সময়েই মানুষ মরছে। তিনি বলেন, এই কথা বলা আমার জন্যও বেদনাদায়ক। শুধু মানবতাবাদী বা সমাজতান্ত্রিক হিসেবে নয়, একজন ইহুদি হিসেবেও।









