ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় মার্কিন বিদেশ নীতি নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এই নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এলেও কৌশলগত বিষয়ে তেমন পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন৷ ইতোমধ্যে তার প্রশাসন কেমন হবে তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে৷ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য নাম ঘোষণা করেছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় জমানায় মার্কিন বিদেশ নীতিতে অর্থনীতির বিবেচনায় বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের পুনঃবিন্যাস ঘটতে পারে। রিপাবলিকান দলের প্রতিনিধি ট্রাম্পের কাছে অর্থনীতি বেশি গুরুত্ব পাবে।
বিশেষজ্ঞরা এটাও মনে করেন যে, রাজনীতির মাঠ গরম করতে ট্রাম্প যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, বাস্তবে সেসবের প্রতিফলন না-ও ঘটতে পারে৷ ফলে তিনি দায়িত্ব নেয়ার আগ অবধি এক্ষেত্রে একধরনের অনিশ্চিয়তা রয়ে যাচ্ছে৷
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রথাগত মিত্র যারা আছেন, যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো, কানাডা এবং মেক্সিকোর সাথে মার্কিন সম্পর্কের একটি পুনঃবিন্যাস ঘটতে পারে ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় আমলে।
তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই আমরা ইঙ্গিত পাচ্ছি, মেক্সিকো এবং ক্যানাডা যারা আগের নাফটা এবং পরবর্তীতে এটা নতুন নামে হয়েছে যেটা, সেটা পরিবর্তনের জন্য ট্রাম্প কিন্তু বলছেন যে, তাদের উপর ট্যারিফ আরোপ করবেন। ন্যাটো নিয়ে তার বক্তব্য আছে৷ বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পরে ন্যাটো শক্তিশালী হওয়ার যে প্রবণতাটা ছিল, সেটা এখন ট্রাম্প প্রশাসনে কী রকম হবে, সেটা বলা মুশকিল৷ তবে খানিকটা অনিশ্চয়তা যে আসছে, এটা তো বলাই যাচ্ছে।
রাশিয়া এবং চীনের ক্ষেত্রে মার্কিন নীতিতে পরিবর্তনের আভাসও দেখতে পাচ্ছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা৷ ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুটিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হতে পারে বলে মনে করেন তারা৷ তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত কারণে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাশিয়ার রয়েছে, সেটা অব্যাহত থাকবে।
কবির বলেন, বিশেষ করে চীনের ক্ষেত্রেতো কৌশলগত বলুন, সামরিক বলুন, অর্থনীতি বলুন – সব বিষয়েই নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা হবে৷ ইতোমধ্যে তিনি ঘোষণাই করে দিয়েছেন যে, চীনাদের ক্ষেত্রে বাড়তি ট্যারিফ আরোপ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোলগেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক নাভিন মুর্শিদ মনে করেন, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে রাশিয়া ছিল একটি স্কেপগোট। ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করলে চীন এক্ষেত্রে হয়ে উঠতে পারে নতুন মার্কিন ‘স্কেপগোট’৷
তিনি বলেন, বাইডেন রাশিয়াকে একটি স্কেপগোট বানিয়ে রেখেছিল৷ রাশিয়া ছিল তাদের কাছে ঐ দেশটা যাকে শত্রু সাজিয়ে নানান ধরনের বিদেশ নীতি সাজানো যায়৷ এখন রাশিয়া যদি সেই জায়গা থেকে চলে যায়, তখন আরেকটা শত্রু লাগবে ট্রাম্প সরকারের৷ তখন সে কে হবে? চীন অনেকদিন ধরে এই ভূমিকাটা নেওয়ার একটা জায়গায় আছে৷ হয়ত আমরা দেখবো যে চীনকে ঘিরেই এই কাজটা হবে।
মার্কিন অর্থনীতিকে প্রাধান্য
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয়বারে মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব ধরে রাখার পাশাপাশি মার্কিন অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়টি তার প্রশাসনের কৌশল হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা৷ গত সপ্তাহে ট্রাম্প ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোকে নতুন কোনো মুদ্রা চালু করতে নিষেধ করেছেন। বিশ্ববাণিজ্যে মার্কিন ডলারকে প্রতিস্থাপিত করতে পারে বা এই মুদ্রাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো মুদ্রায় বাণিজ্য চলতে পারে, এমন কোনো মুদ্রাকে সমর্থন দিতে রাজি নন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট৷ তার এই কথা না মানলে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন ট্রাম্প।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এম হুমায়ুন কবির বলেন, ব্রিকসে রুশ, চীনা, ভারতীয়রা কিন্তু ইতোমধ্যেই বিকল্প মুদ্রা দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা শুরু করেছেন৷ এখন তিনি যে প্রস্তাব দিচ্ছেন সেটা যদি বাস্তবায়ন করেন, তাহলে তো তার শত্রু-মিত্র সবাই আক্রান্ত হয়ে যাবেন। ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে চীন, তারপর ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হবে৷ তুরস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে৷ ব্রিকসকে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন হিসেবে মনে করে৷ এই হুমকিটা আমরা পত্রপত্রিকায় দেখেছি৷ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এটা বাস্তবায়নের দিকে যাবেন না- এটাও নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারেন না।
ড. নাভিন মুর্শিদ অবশ্য ব্রিকসে অন্য মুদ্রায় ব্যবসাবাণিজ্য হলে মার্কিন ডলারের উপরে খুব বড় প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন না। তিনি বলেন, মার্কিন ডলার এখনো একটা বৈশ্বিক মুদ্রা৷ এটা চলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম৷ স্বল্প মেয়াদে এটার উপর খুব একটা বড় প্রভাব হবে না।
তবে ইতোমধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করা দেশগুলোর উপর দশ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে পরিকল্পনা করছেন তার প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপর পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হুমায়ুন কবির বলেন, ট্রাম্প বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যত ইমপোর্ট বা আমদানি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হয়, তার উপর তিনি ফ্ল্যাট রেইট একটা শুল্ক আরোপ করবেন৷ সেটা ১০ শতাংশের কথা আলোচনা হচ্ছে৷ যদি তাই করেন তাহলে ভারতের মতো দেশ যে তার মিত্র বা তার সাথে কাজ করে, তারাও কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে। এখন এই ট্রাম্প প্রশাসন, সেটা কৌশলগত অবস্থান বলুন, সামরিক সম্পর্ক বলুন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বলুন, এই সবগুলো জায়গাতেই কিন্তু একধরনের পরিবর্তন আসবার একটা সম্ভাবনা অনেকই বলছেন।
তিনি আরও বলেন, এছাড়া যে প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর ভিত্তি করে এই সম্পর্কগুলো আবর্তিত হয়, যেমন ধরুন জাতিসংঘ, ডব্লিউটিও, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ – এগুলোর ক্ষেত্রেও কিন্তু পরিবর্তনের বাতাস ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে আসতে পারে৷ কারণ, এবার ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে মার্কিন প্রশাসনকে সাজানোর কথা ভাবছেন৷ এবং সেটা যদি সাজান তাহলে তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া পৃথিবীতে পড়ার একটা সম্ভবনা তো থাকছেই।
ট্রাম্পের বাংলাদেশ ভাবনা
অধ্যাপক নাভিন মুর্শিদ মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে কাজের যে বিশাল বহর রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ তেমন কোনো আলাদা গুরুত্ব বহন করে না৷ ফলে ভারতের চোখে বাংলাদেশকে দেখার যে দীর্ঘদিনের চর্চা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশকে স্বতন্ত্রভাবে দেখার মতো পর্যায়ে বাংলাদেশ না-ও পৌঁছাতে পারে। তবে জিওপলিটিক্যাল কারণে বাংলাদেশের আলাদা একটা গুরুত্ব আছে বলে মনে করেন তিনি।
মুর্শিদ বলেন, প্রফেসর ইউনূসের সাথে বিল ক্লিন্টনের যেমন খুব ভালো সম্পর্ক আছে, সেই জায়গা থেকে মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক আছে৷ আমরা ড. ইউনূসের ট্যুরের সময় দেখলাম তার সাথে খুব ঘনিষ্ঠ ছবি৷ এগুলো দেখেই আবার ট্রাম্প ওভাবে বক্তব্য দিয়েছেন যে বাংলাদেশে কী হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের নির্যাতন হচ্ছে৷ টুইট একটা করেছেন। যেহেতু অ্যামেরিকান রাজনীতিতে এই পার্টিজানশিপটা একটা রেটোরিকাল জায়গায় চলে যায়, বাইডেন কী করলেন তার বিপরীতটা বলার একটা জায়গা থেকে ট্রাম্প অনেক সময় কথা বলেন৷ তার মানে যে সে আসলেই কিছু করবে সেটাও নয়।
উভয় বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কৌশলগত স্বার্থে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে মার্কিন প্রশাসনের কাছে৷ চূড়ান্ত বিবেচনায় সেটাই বিবেচ্য বলে মতো তাদের।
সূত্র: ডয়েচে ভেলে (ডিডব্লিউ)









