স্বাধীনতা নিয়ে আমরা যত কথা বলি তার ভিতর একদিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো স্বাধীনতার ভ্রাতৃসুলভ মনোভাবকে গলিয়ে দিয়ে অন্যকে ট্যাগ করে ফেলে দেওয়া। এ তো দেশবিরোধী, এই তো বিদেশি এজেন্ট, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে না, মৌলবাদী কিংবা তার সঙ্গে জঙ্গিদের সম্পর্ক আছে ইত্যাদি।
এগুলো শুধুমাত্র শব্দ নয়, এগুলোর মানে হলো কারো রাজনৈতিক অস্তিত্বই মুছে ফেলার অপচেষ্টা। কথাটা সরল; ট্যাগিং-ফ্রেমিং হল এমন এক ভাষা ও প্রযুক্তি যেটি ভাব ও অনুভূতিকে এমনভাবে বেঁধে দেয় যে প্রশ্ন করা, ভিন্নভাবে চিন্তা করা বা সমালোচনা করা সবাইকে সন্দেহজনক করে তোলে।
ট্যাগিং কখনোই কেবল ব্যক্তিগত অপমান নয়; এটি একটি বলিষ্ঠ রাজনৈতিক কৌশল। যদি মিডিয়া, শক্তিশালী কণ্ঠ একসাথে কিছু বা কারো প্রতি বিরোধী কিংবা অপরাধী রঙ লাগিয়ে দেয় সে রঙ মুছতে খুব কষ্ট হয়। এমন ফ্রেম ইস্যুগুলোকে নিজস্বতা থেকে পলিটিক্যাল করে তোলে। বক্তার বক্তব্যের পরিবর্তে বক্তাকে বিচার করা হয়। এটিই ফ্রেমিং এর কার্যপদ্ধতি: কন্টেক্সট বদলে দেওয়া, প্রসঙ্গ সরিয়ে দেওয়া এবং লোককে একটি সরল ট্যাগের মধ্যে আবদ্ধ করে দেওয়া। কিছু গবেষণার রিপোর্ট থেকে দেখা যায় যে, মিডিয়ার ফ্রেমিং কেবল জানালা নয়, এটি মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিভাবে হবে, তা গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
ট্যাগিং-ফ্রেমিংয়ের উপাদানগুলো অনেক রকম। এর মধ্যে আছে ঐতিহাসিক কটূক্তি ব্যবহার, ধর্মীয় অনুভূতিতে প্রভাব ফেলা, দেশপ্রেম বনাম দেশদ্রোহী চিহ্নিত করা, কখনো কখনো আর্থিক বা আচরণগত অভিযোগ দিয়ে কারও বিরুদ্ধে দোষ চাপানো, ব্যক্তিগত আক্রমণ করা, মিথ্যা বা অর্ধসত্য তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, সামাজিক বা পেশাগতভাবে ভীতি সৃষ্টি করা এবং মানুষকে ভাগ করে আমরা বনাম তারা ভাব তৈরি করা। এইভাবে ভিন্নমত রাখাকে অপরাধী বা নেতিবাচক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এ কৌশল আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কেটে-ছেঁটে ভিডিও, কনটেক্সট ছাড়া ক্লিপ এবং টার্গেটেড অপসারণ ও ট্রোলিং মানুষকে নীরবে সরিয়ে দেয়। জাতি-পরিসরের বাইরে অনেক দেশেই এ রকম কৌশল প্রয়োগের উদাহরণ আছে কোন বিদেশি এজেন্ট ট্যাগ একটি ব্যক্তিকে কার্যত সরকারি নিশানার তালিকায় ফেলতে পারে। বিশ্ব বিবেচনায়ও দেখা যায়, এ ধরনের লেবেলিং কেবল ব্যক্তির না, সমগ্র সমালোচনাত্মক সমাজবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ট্যাগিংয়ের সংস্কৃতি কেবল রাজনৈতিক বিরোধীকে নিশানা করে না; এটি গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতিযোগিতা, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যমসহ নাগরিক সমাজের নিরাপত্তাও খেয়ে ফেলে। যখন সাংবাদিক, শিক্ষক বা বুদ্ধিজীবী ট্যাগ করা হয় তখন আলোচনার ক্ষেত্র সংকীর্ণ ও খোলা চর্চা বন্ধ হয়ে যায়। মিডিয়া মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণের ভার কখনো কখনো একই কাঁচি দিয়ে জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা নেয়; মালিকানার স্বার্থ যদি একপেশে বার্তা তৈরি করে তখন স্বাধীনতা শুধু শ্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকে। বিশ্লেষণ দেখায় মালিকানার নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিক স্বার্থ মিললে ফ্রেমিং আরও জোরালোভাবে কাজ করে।
ট্যাগিং-ফ্রেমিংয়ের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো সামাজিকভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। মানুষ নিজের কণ্ঠ নীরব রাখে খুঁত দেখাবার ভয়ে, সহমত প্রকাশে দ্বিধা থাকে। এতে পুরো সমাজ জিনিসটা হারায়: ভুলকে ধরার, নীতিহীনতাকে প্রশ্ন করার ও শক্তিশালীদের স্বচ্ছতা দাবি করার সক্ষমতা। বন্ধুত্ব-পরিবার-কমিউনিটির ভেতরে যদি কোন ভুল বলা মানে দেশবিরোধ এমন আচরণ ঘেঁষে ওঠে তবে জীবনের ছোট ছোট স্বাধীনতাও হাহাকার করে। এটি রাজনৈতিক মাত্রায় ক্ষতি করার পাশাপাশি আমাদের সাধারণ মানবিক সহাবস্থানের গতিকেও ভেঙে দেয়।
এখন করণীয় কি? ট্যাগিং-ফ্রেমিং সমস্যার মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে স্বীকার করা। আমাদের কখনোই সত্য বা তথ্যকে চাপা দেওয়া বা বিকৃত করার চেষ্টা করা উচিত নয়। যদি কোন অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়, তাহলে সেটিকে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা প্রভাবের বাইরে রাখার মাধ্যমে উল্লসিত করা দরকার। আর যদি সত্যিই কোন অপরাধ বা অন্যায় ঘটে তাহলে তা অবশ্যই আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে যাতে কেউ অন্যায়ভাবে শাস্তিপ্রাপ্ত না হয়।
মিডিয়া কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। সংবাদমাধ্যমের মালিকানা, রাজনৈতিক সম্পর্ক, আর্থিক স্বার্থ এসব তথ্য প্রকাশ্যভাবে জানানো দরকার। এ ছাড়া সম্পাদক ও সাংবাদিকরা যাতে নিজস্ব নীতি, স্বকীয়তা এবং দায়িত্ববোধ বজায় রাখতে পারেন তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। মিডিয়া যেন স্বাধীনতা হারিয়ে দোষারোপের হাতিয়ার না হয়ে জনমত গঠনে বিশ্বাসযোগ্য ভূমিকা রাখে।
আমাদের নাগরিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। সাধারণ মানুষকে শেখাতে হবে কিভাবে তথ্যের উৎস বা সোর্স যাচাই করতে হয়, কিভাবে ফ্রেমিং বা ট্যাগিং চিহ্নিত করা যায় এবং কিভাবে বিতর্ককে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা লাঞ্ছনার বদলে যুক্তির মাধ্যমে সমাধান করা যায়। সচেতন নাগরিক সমাজই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, যেসব দেশে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, স্বচ্ছ মিডিয়া এবং সক্রিয় নাগরিক সমাজ একসাথে কাজ করে সেখানে ট্যাগিং-ফ্রেমিং এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে অনেক কম। আমাদেরও এই একই নীতি অনুসরণ করতে হবে, সত্যের পাশে দাঁড়ানো, তথ্য যাচাই করা, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো- এটিই ট্যাগিং-ফ্রেমিং সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ।
যারা সত্যিকার অর্থেই দেশের মঙ্গল চায়, তাদের জন্য একটাই পথ সেটি হলো ট্যাগিং-ফ্রেমিং বন্ধ করা। কৌশলে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা বা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কোনো দেশকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করবে না। এটি আমাদের মুক্তমন, সৃজনশীলতা এবং জাতিগত ভরসাকে খেয়ে ফেলে। সত্যিকারের পরিবর্তন করতে হলে প্রথমে নিজের বক্তব্যের ব্যাকরণ ঠিক রেখে অন্যকে লেবেল করা বন্ধ করতে হবে। যুক্তি আনুন, প্রমাণ দেখান এবং সবচেয়ে বড় কথা ভিন্নমতকে মানুষ হিসেবে দেখুন শত্রু হিসেবে নয়। এটাই স্বাধীনতার সৎ, নৈতিক এবং টেকসই চেতনা।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









