বঙ্গোপসাগরের অববাহিকায় অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন ভ্রমণ শেষে এর অভিজ্ঞতা এবং ইতিহাস তুলে ধরেছেন নুসরাত জাহান লামিয়া।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের গৃহীত পর্যটক সীমিত করার সিদ্ধান্তের পর দেশের একমাত্র এই প্রবাল দ্বীপ ভ্রমণ শেষে এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন লামিয়া।
দেশের এই পর্যটন স্পটটি ঘিরে আমাদের আগ্রহের যেন কোন কমতি নেই। কেননা বছরের যেকোন সময় চাইলেই আপনি এই দ্বীপে ভ্রমণ করতে পারবেন না। নির্দিষ্ট সময়ে অর্থাৎ নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত সরকার কর্তৃক সেন্টমার্টিন যাওয়ার অনুমতি রয়েছে। তবে একই সাথে রয়েছে কিছু বিধিনিষেধ এবং নতুন নিয়ম। এই দ্বীপটি টেকনাফ শহর থেকে ৯ কিলোমিটার এবং মায়ানমার উপকূলের ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এখন আসা যাক এর উৎপত্তির কথায়। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে টেকনাফের মূল ভূমির অংশ ছিল সেন্টমার্টিন আইল্যান্ড। কিন্তু সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় এটি সমুদ্রের নিচে চলে যায়। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ সময়। প্রায় ৪৫০ বছর আগে বর্তমান সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণপাড়া, এরপর ধীরে ধীরে দ্বীপের বাকি অংশ জেগে ওঠে। ২৫০ বছর আগে আরব বণিকদের নজরে আসে এই দ্বীপটি। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সাথে বাণিজ্যর সময় আরব বণিকরা এখানে বিশ্রাম নিতেন। তখন আরব বণিকরা এই দ্বীপের নামকরণ করেন জাজিরা। ১৮৯০ সালে কিছু মৎস্যজীবী এই দ্বীপে বসতি স্থাপন করে । সে সময় এই দ্বীপে ছিল প্রচুর নারিকেল গাছ। এই নারিকেল গাছ এবং জাজিরা শব্দের সংমিশ্রণে এর নাম হয়ে যায় নারিকেল জিনজিরা।
এরপর ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০০ সালে ভূমি জরিপের সময় দ্বীপটিকে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। ব্রিটিশরা খ্রিস্টান সাধু মার্টিনের নামানুসারে দ্বীপটির নামকরণ করেন সেন্টমার্টিন ।
ইতিহাস হলো জানা, ভ্রমণ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতায় প্রবেশ করা যাক-
আমাদের এবার সেন্টমার্টিন যাত্রা শুরু হয়েছিল ঢাকার আরামবাগ থেকে। এ যাত্রায় আমরা গিয়েছিলাম লন্ডন এক্সপ্রেস এর একটি এসি গাড়িতে, যেটি আমাদেরকে সরাসরি ঢাকা থেকে কক্সবাজার পৌঁছে দিবে। তারপর কক্সবাজার থেকে শিপে করে সমুদ্রপথে চলে যাব সেন্টমার্টিন।
আমাদের যেহেতু সেন্টমার্টিনগামী শিপ ছাড়ার আগ মুহূর্তে ঘাটে পৌঁছাতে হবে, তাই শিপের সময় অনুযায়ী বাসের টিকিট করা হয়েছিল। যাতে করে বাস থেকে নেমেই নির্বিঘ্নে শিপে উঠে পড়তে পারি। আমরা কাজিনরা ৪ জন এবং আমাদের জিজুসহ সর্বমোট ৫ জন গিয়েছিলাম সেন্টমার্টিন ভ্রমণে। রাত সাড়ে সাতটার দিকে আমরা লন্ডন এক্সপ্রেস নামক বাসে উঠি। জনপ্রতি সকলের বাস টিকিটের মূল্য ধার্য করা হয়েছিল ১২০০ টাকা।

রাত দুইটার দিকে কুমিল্লার মিয়ামি নামক রেস্টুরেন্টে দেওয়া হয় যাত্রাবিরতি। সেখানে নির্ধারিত দামের থেকে কিছুটা বাড়তি খরচে রাতের খাবার সেরে নির্ধারিত 30 মিনিট সময়ের মধ্যেই প্রস্তুতি নেই বাসে ওঠার। অতঃপর বাসে উঠে লম্বা একটি ঘুমের পর নিজেকে আবিষ্কার করলাম ডলফিন মোড়ে। মোড় থেকে একটি অটো ভাড়া করে চলে গেলাম বারো আউলিয়া নামক শিপের কাছে। প্রতিটি শিপ টিকিটের মূল্য ছিল ২৮০০ টাকা।
ঘড়ির কাটায় চোখ পড়তেই দেখলাম সকাল ছয়টা বেজে দশ মিনিট। একটু পরেই সূর্যের লাল আঁভায় চোখের সঞ্জীবতা ফিরে পেলাম। ৬ টা ৩০ মিনিটে শিপে রওনা হলাম। সূর্যের আলো যখনই নদীর পানির ওপর তার প্রভাব বিস্তার করল মনে হল এ যেন এক অন্যরকম সকাল। চারদিকে কোলাহল নেই , বিরহ নেই , শুধুই যেন খুশির জোয়ার। দৃশ্য উপভোগ করতে করতে কখন যে মাঝসমুদ্রে চলে এসেছি টেরও পাইনি। যাইহোক কতগুলো ছবি তুলে নিলাম এ সুযোগে সমুদ্রের সাথে।
কাজিনদেরও তুলে দিলাম পছন্দ মাফিক ছবি । ছবি তোলার পর্ব শেষে খাবার খাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করলাম সকলে। যথারীতি খাবার শেষে পুনরায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। চারিদিকে শুধু পানি , যতদূর চোখ যায় পানি ছাড়া কিছুর অস্তিত্ব দেখতে পাই না। একটু বিরক্ত হলাম বটে। তবে যখনই দেখলাম নীল পানিতে প্রবেশ করেছি তখন এই বিরক্তবোধই শান্তির সাথে যুদ্ধে হেরে গেল। দুপুর বারোটার দিকে মধ্যাহ্নভোজ শেষ করে একটু ঘুমিয়ে দুপুর ২ঃ২০ মিনিটে পৌছালাম কাঙ্ক্ষিত স্পট সেন্টমার্টিনে। যদিও কিঞ্চিত আগে পৌঁছানোর কথা ছিল তবে মাঝ সমুদ্রে শিপটিতে সমস্যা হওয়ার কারণে একটু ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল । যদিও শিপটি পুনরায় চালু করতে সমর্থ হয়েছিলেন চালকরা।

যাইহোক নানান রকম বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে পৌঁছালাম বটে সেন্টমার্টিনে। এবার আসি জীববৈচিত্র্য এবং রিসোর্ট এর কথায়। আমরা “ফ্যামিলি টাইম বিচ রিসোর্টে” দুই রাতের জন্য অবস্থান করেছিলাম। আমরা সর্বমোট দুইটি রুম বুক করেছিলাম সেখানে। একটি রুমের নাম ছিল “দাদা বাড়ি” এবং অন্যটির নাম ছিল “নানা বাড়ি”। এই দুইটি রুমের অবস্থান ছিল পাশাপাশি। প্রতিটি রুমের ভাড়া ছিল ৮৫০০ টাকা। আমরা সকলে বেলা তিনটার দিকে রিসোর্ট এ চেক ইন করি।
এরপর কাপড় বদলে সমুদ্রের অপার সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে চলে যাই। যেহেতু ক্লান্তি অনুভব করছিলাম সেহেতু গোসল সেরে যথারীতি রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল ৮ টায় উঠে ফ্রেস হয়ে রিসোর্ট কর্তৃক বরাদ্দকৃত সকালের নাস্তা করি। মেনুতে ছিল ডিম খিচুড়ি, সালাদ, এবং চা । এরপর একটু বিশ্রাম নিয়ে চলে যাই সমুদ্র পাড়ে। তখন সময় ছিল ১১ঃ০০ টা বেজে ২১ মিনিট। আমিসহ আমার দুই কাজিন তখন আমাদের সবচেয়ে পছন্দের কাজটি করি যেটি কিনা সাইকেল চালানো।
আমরা বিরতিহীনভাবে তিন ঘণ্টা সাইকেলে চড়ে দ্বীপের সবকিছু ঘুরছিলাম। আমাদেরকে সাইকেল ভাড়ায় দেওয়া হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল প্রতি ঘণ্টায় চার্জ মাত্র ৫০ টাকা। আমরা সকলে সাইকেল চালানোর সময় দেখতে পেলাম জলপাই রাঙা সাগর কচ্ছপ। প্রথমে এটিকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন এক টুকরো পাথর শায়িত আছে। তবে যখনই কাছে গিয়ে দেখলাম তখন কচ্ছপটির উপস্থিতি টের পেলাম। শুনেছি এগুলো নাকি বেশি দিন বাঁচে। জোয়ারের পানি নামার পর অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁকড়ার গর্ত দেখতে পেলাম। জেলিফিস এবং বিভিন্ন প্রজাতির বিষাক্ত মাছও দেখতে পাচ্ছিলাম। একটু দূরে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার সময় সারি সারি নারিকেল গাছ দেখতে পেলাম। তবে সেখানে কোন নারিকেল এর উপস্থিতি ছিল না।
একটু দূরে যেতেই দেখতে পেলাম বরফের গোলা বিক্রেতাকে। দেরি না করে কিনে নিলাম তিনটি বরফের গোলা। সেগুলো খাওয়া শেষে সাইকেল মালিককে তার সাইকেলটি বুঝিয়ে দিয়ে চলে আসলাম রিসোর্টে। দুপুরের খাবার খেয়ে গোসল করে টানা ছয় ঘণ্টা ঘুমালাম। রাত আটটার দিকে ঘুম থেকে উঠে ডিনার করে চলে গেলাম চাঁদের আলোর মন ভুলানো রূপ দেখতে। সেখানে গিয়ে লক্ষ্য করলাম অনেকটা চড় পড়েছে এবং একটু দূরে চাঁদের আলো পড়েছে নীলচে পানির ওপর।

দেখে মনে হচ্ছিল হয়তো কোন এক পরী নেমে এসেছে পানিতে এবং তার হাসিতে সকলে বিমুগ্ধ হচ্ছে। মনে হচ্ছিল জীবনে আর কিছু চাওয়ার ক্ষুধা নেই, পাওয়ার ইচ্ছা নেই। সবকিছু বোধ হয় এখানেই পেয়ে গেলাম। এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো এখানে ভ্রমণ করার জন্য আমাকে একটি টাকাও ব্যয় করতে হয়নি। আমার শ্রদ্ধেয় আঙ্কেল রাজু আলিম আমাকে সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না। তবে বলতে চাই সে আমাকে আমার কাজিনদের সাথে কাটানো সবচেয়ে ভালো সময় উপহার দিয়েছেন।
যাইহোক ,চাঁদের রূপ দেখার পরে একটু সংগীত পরিবেশন করলাম সবাই মিলে। এরপর চলে গেলাম সেখানকার লোকাল বাজারে। ভ্যান দিয়ে সেখানে যেতে হয়েছিল এবং জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়া ধার্য হয়েছিল। ওইখানে গিয়ে সর্বপ্রথম সবার নজর কাটলো দুটি বেশ বড় সাইজের মাছ। একটি কোরাল মাছ এবং অন্যটি রূপচাঁদা মাছ। সর্বসম্মতি সাপেক্ষে সেই দুটি মাছ বার-বি-কিউ করা হলো। সরাসরি বার-বি-কিউ করতে দেখে চোখে শান্তি অনুভূত হলো সকলেরই। খানিকক্ষণ পরে আমার চোখ পরল সাগরের বিগ সাইজ পাঙ্গাস মাছের ওপর। পরক্ষণেই মনে মনে বলতে লাগলাম টাকাগুলো সব শেষ হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিন খাব পাঙ্গাস মাছ। কেন জানিনা পরক্ষণেই আবার আনমনে ভাবলাম মাছটি হয়তোবা আমার দিকে তাকিয়ে বলছে “তোমার নানান বাহানায় ,আমার জায়গাটা কোথায়”! এই হাস্যকর ঘটনার মধ্য দিয়ে আমার একজন ব্যক্তির উক্তি মনে পড়ে গেল যিনি কিনা বলেছিলেন “Money returns, Time Doesn’t”।
এরপর আর কী, এই মাছটিকেও নিয়ে নিলাম ডিনার হিসেবে। খাবার খাওয়া শেষে একটু বিশ্রাম নিয়ে চলে গেলাম রিসোর্টে। সমুদ্র পাড়ে সবাই একটু হাটাহাটি করার পরে ঘুমাতে চলে গেলও আমার ইচ্ছে হচ্ছিল না। যেহেতু পরবর্তী দিন আমরা রিসোর্ট থেকে চেক আউট করবো সেহেতু আমি ঘুমাতে না গিয়ে সারারাত সমুদ্রের এই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করি।

শীতের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে বারবার মনে হচ্ছিল ভুল করে আবার সাইবেরিয়াতে চলে আসিনি তো!!! শীতে কাঁপতে কাঁপতে জমে যাচ্ছিলাম পুরো। যাইহোক রাতে আর ঘুমানো সম্ভব হয়নি শীত কাকু এবং মশা মামাদের কারণে!! সকাল সাত ঘটিকায় তাই একটু ঘুমটা সেরে নিলাম এবং ১১ ঘটিকায় সকলে মিলে সমুদ্রে গোসল সেরে ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি হলাম হোটেল ছাড়ার উদ্দেশ্যে।
একটু পরে শুনলাম আরেক ঘটনা। আমাদের সকলের যে শিপে যাওয়ার কথা ছিল সেটি নাকি যান্ত্রিক সমস্যার কারণে বন্ধ আছে। তবে ভাগ্য ভালো ছিল বলে আমরা কর্ণফুলী শিপে আসতে পেরেছি। তবে এক্ষেত্রে জনপ্রতি ৩২০০ টাকা খরচ হয়েছে। এমনকি আমরা সকলে সিট ও পাইনি ওইভাবে। পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের সিট পাওয়া গেলেও বাকি দুইজনের স্ট্যান্ডিং টিকিটে আসতে হয়েছে।
এবার যেহেতু শিপে কোনরকম সমস্যা হয়নি সেহেতু আমরা নির্ধারিত সময়ের থেকে ১ ঘণ্টা ৫০ মিনিট পূর্বে ডলফিন মোড়ে পৌঁছেছিলাম। যেহেতু সকলে ক্ষুধার্ত ছিল সেহেতু আমরা ডলফিন মোড় সংলগ্ন “শালিক” রেস্টুরেন্টে ডিনারটা সেরে নিলাম। এবং রাত বারোটার দিকে গ্রীনল্যান্ড নামক বাসে উঠে রওনা দিলাম ঢাকা যাবার উদ্দেশ্যে। জনপ্রতি বাস টিকিটের মূল্য ছিল ১৫০০ টাকা। আর এভাবেই আমাদের আড্ডা ,হাসি তামাশা, নানান রকম ভোজ এর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি হল সেন্ট মার্টিন ট্যুরের।
আসলে কিছু কিছু অনুভূতি থাকে যেগুলো ভাষায় অথবা লিখে ব্যক্ত করা যায় না। আমার ব্যাপারটাও অনেকটা সেইরকম। জীবনের সবচেয়ে ভালো সময় গিয়েছে ওখানে ভ্রমণকালে। জোর দিয়ে বলতে পারি যে ব্যক্তি সেন্টমার্টিন দেখেনি সে আসলে বাংলাদেশের কিছুই দেখেনি। আমি ঢাকায় বসে লিখছি ঠিকই তবে আমার মনটা এখনো সেই সমুদ্রপারের জীববৈচিত্র্য দেখতে দেখতে যেন সাইকেল চালাচ্ছে!!! লিখা আর দীর্ঘায়িত করতে চাইনা তবে , একটি কথাই বলতে চাই “one life,
one world,
explore it”
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









