নানা অনিয়ম দুর্নীতিতে নিমজ্জিত থাকা কক্সবাজার জেলা কারাগারে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। বন্দিরা পরিবারের সাথে ফোনে যোগাযোগ করতে পারছে। খাবারসহ নানা সুযোগ সুবিধা বেড়েছে। ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ বন্দি থাকার পরও শৃংখলার মধ্যে সব কিছু রয়েছে।
কক্সবাজার জেলা কারাগার এক সময় নানা প্রকার দুর্নীতি অনিয়মে নিমজ্জিত ছিল। বন্দিদের নানা প্রকার অত্যাচার করে টাকা আদায় করা হতো। ঠিকমতো পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা যেত না। খাবারের মান ছিল নিম্নমানের। এছাড়া নানা অনিয়ম আর দুর্নীতি ছিল কক্সবাজার জেলা কারাগারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর বর্তমান জেল সুপার মোহাম্মদ জাবেদ মেহেদীকে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে কক্সবাজার জেলা কারাগারে জেল সুপার হিসেবে বদলি করা হয়।
জেল সুপার মোহাম্মদ জাবেদ মেহেদী জানান, তিনি যোগদান করার পর নানা অনিয়ম দুর্নীতিগুলো শনাক্ত করার কাজ শুরু করেন। এরপর প্রতিটা বিষয়ের উপর তিনি গুরুত্ব দিয়ে সেগুলোকে মোকাবেলা করতে শুরু করেন। জেলের ভেতর বন্দিদের সাথে নিয়মিত দেখা সাক্ষাত করেন, তাদের নানা সমস্যা কথা জানার চেষ্টা করেন, এরপর সমস্যাগুলো নিয়ে জেলারসহ অন্যান্য সহকর্মীদের নিয়ে সেগুলো দূর করে জেলখানায় শৃঙ্খলা ফেরাতে শুরু করেন।
জেল সুপার মোহাম্মদ জাবেদ মেহেদী জানান, বর্তমানে কারাগারে ৮৩০ জন ধারণ ক্ষমতার অনুকূলে ২ হাজার ৮৫০ জন বন্দী রয়েছেন। ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ বন্দী থাকার পরেও সবকিছু শৃঙ্খলার মধ্যেই চলছে। তবে কিছু সংকটের কথা জানান তিনি। নিয়মিত চিকিৎসক ও কিছু লোক বল সংকট রয়েছে। তারপরেও যা আছে তা দিয়ে তারা নিয়মিত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানান জেল সুপার।
কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে আসা টেকনাফের আব্দুর রহিম জানান, “আমি তিন মাস জেলে ছিলাম, ভেতরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে, পুরানো বন্দিদের কাছে শুনেছি, আগে নাকি অনেক অনিয়ম দুর্নীতি হত, কিন্তু আমি যাবার পর সেগুলো দেখিনি, ঠিকমতো খাবার পেয়েছি।” কারাগার থেকে বের হওয়া উখিয়ার রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি চার মাস পরে বের হয়েছি, আগের বন্দীদের কাছ থেকে শুনেছি, আগে নাকি খাবার দেওয়া হতো কম পরিমাণে, কিন্তু আমি সবগুলো ঠিক মতো পেয়েছি, শীত পড়ার আগেই তিনটি কম্বল দিয়েছে আমাকে, আর আমি নিয়মিত বাড়িতে কথা বলতে পারতাম মোবাইলে, সপ্তাহে একবার ১০ মিনিট করে বাড়িতে কথা বলেছি।”
কারাগার থেকে বের হওয়া কুতুবদিয়া এলাকার আব্দুল জব্বার বলেন, “নতুন জেল সুপারের তদারকির কারণে অনিয়ম দুর্নীতি অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে, খাবারের মান বেড়েছে। চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন হয়েছে কারাগারে। বন্দীদের জন্য টেলিভিশন দেখা ও ফুটবল খেলার ব্যবস্থা রয়েছে।”
দীর্ঘদিন কারাবাসের পর সদ্য মুক্তি পাওয়া কক্সবাজার সদর উপজেলার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, বর্তমান জেল সুপার জেলের ভেতর প্রবেশ করে বন্দিদের নানা সমস্যার কথা শুনেন, বন্দিরা বলার সাথে সাথে তিনি সমাধানের চেষ্টা করেন।
কক্সবাজার কারাগারের জেলার মোহাম্মদ দেলোয়ার জাহান বলেন, দর্শনার্থীদের ঘরে ফ্যান দেওয়া হয়েছে, বিনোদনের জন্য বড় টেলিভিশন রয়েছে, ক্যান্টিন সচল রয়েছে, ভেতরে ফুটবল খেলার ব্যবস্থা করা হয়। কারা ফটকের সামনে বড় মনিটরে জামিন প্রাপ্ত বন্দীদের নাম প্রচার করা হচ্ছে। এতে কোন বন্দি জামিনে বের হবেন সেটা প্রধান সড়ক থেকেই অনায়াসে জানতে পারা যাচ্ছে।
জেলার মোঃ জাবেদ মেহেদী বলেন, আমি যোগদানের সময় বিশৃঙ্খলা ও নানা অনিয়মের কথা শুনতে পেয়েছি। তাই যোগদান করার সাথে সাথেই প্রথমে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজ শুরু করি। বন্দীদের স্বজনদের সাক্ষাতে স্বচ্ছতা ও দর্শনার্থীদের সঙ্গে কর্মকর্তা কর্মচারীদের ভালো ব্যবহার নিশ্চিতের বিষয়টি নিয়মিত তদারকি করছি।
বন্দিদের বিনোদনে কারাগারের ভিতরে উন্মুক্ত স্থানে বড় মনিটরে নাটক ও গান পরিবেশন করা হয়। প্রতিদিন বিকেলে এক ঘণ্টা করে মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। বর্তমান কক্সবাজার কারাগারে ৫ শতাধিক রোহিঙ্গা বন্দি রয়েছে, বিচার কাজ শেষ হয়েছে এরকম বন্দী রয়েছে একজন। মিয়ানমারের সাজা প্রাপ্তবন্দী রয়েছে ২৫ জন।
জেল সুপার বলেন, “আমি নিয়মিত ভেতরে গিয়ে বন্দীদের সমস্যার কথা শুনে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। আমাদের কারাগারের কারারক্ষিসহ কারো বিরুদ্ধে কোন অনিয়ম পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নিচ্ছি। কারাগারে নিজস্ব উৎপাদিত সবজি বন্দীদের খাওয়ানো হয়, খাবারের মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত করা হয়েছে। কারারক্ষীদের বড়িঅন ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। কারাগারকে সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। মহা-কারা মহাপরিদর্শক নিজেই কক্সবাজার কারাগারের সবকিছু দেখতে পান নিয়মিত। ফলে এখানে দুর্নীতি বা অনিয়ম করার সুযোগ নেই। আমরা চাকরি করতে এসেছি। বন্দীদের ভালো রাখার চেষ্টা করছি। কারা ক্যান্টিনে নির্ধারিত মূল্য তালিকা জুলিয়ে কম্পিউটারের মাধ্যমে ন্যায্য মূল্যে খাবার বিক্রি হচ্ছে।
তবে এ ব্যাপারে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। বন্দীদের নিয়মিত ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”









