সিনেমার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে খ্যাতি পেয়েছেন, পরিচিতি পেয়েছেন, প্রশংসা পেয়েছেন সমালোচকের। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও। বলছি ‘শঙ্খচিল’ খ্যাত অভিনেত্রী কুসুম সিকদারের কথা! ‘অভিনেত্রী’ পরিচয়ের বাইরে তিনি নিজেকে ‘লেখক’ ভাবতেই পছন্দ করেন! ‘শরতের জবা’র হাত ধরে এ বছর তার সঙ্গে যুক্ত হলো আরো কিছু নতুন পরিচয়!
চিত্রনাট্যকার, পরিচালক ও প্রযোজক- ‘শরতের জবা’র মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো নির্মাণের এই তিন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ একাই সামলেছেন কুসুম! যা করতে গিয়ে অম্ল মধুর অভিজ্ঞতাও হয়েছে ঢের! তবে সব ছাপিয়ে ‘শরতের জবা’ নিয়ে সাধারণ দর্শকের উচ্ছ্বাসেই আপাতত মগ্ন কুসুম! অক্টোবরে হল রিলিজের পর চলতি মাসে ওটিটি প্লাটফর্ম আইস্ক্রিনেও দর্শক দেখছে ছবিটি।
ব্যক্তিগতভাবে চব্বিশ তাই কুসুমের কাছে ভীষণ প্রাপ্তির! এর কারণও রয়েছে। এ বছর দেশের প্রেক্ষাগৃহে পঞ্চাশটির মতো সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। এরমধ্যে মাত্র ৩টি সিনেমা বানিয়েছেন তিনজন নারী। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় চয়নিকা চৌধুরীর ‘কাগজের বউ’, অক্টোবরে কুসুমের ‘শরতের জবা’ এবং ডিসেম্বরে মুক্তি পায় শবনম পারভীনের ‘হুরমতি’! এরমধ্যে সিনেমা নির্মাণ কিংবা প্রযোজনায় চয়নিকা ও শবনমের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলেও কুসুমই একমাত্র নারী- এ বছর যার হাতেখড়ি হলো!
নিজের প্রথম সিনেমা নির্মাণের ঘোষণার পর গেল বছর চ্যানেল আই অনলাইনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কুসুম সিকদার বলেছিলেন, ‘নো রিস্ক, নো গেইন’! সেই ছবি দর্শকের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর পর চব্বিশের শেষপ্রান্তে এসে কুসুমের কাছে তাই জানতে চাওয়া, ‘কতোটা গেইন করলেন তিনি?’
উত্তরে কুসুম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, “তেইশের কথার ধারাবাহিকতা কিন্তু চব্বিশেও ছিলো। আমি যখন এবার ‘শরতের জবা’ মুক্তির সিদ্ধান্ত নেই, তখন কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে কেউ সাহস করে প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা মুক্তি দিতে আগ্রহী ছিলেন না। সত্যি কথা বলতে গেলে চব্বিশের কোরবানী ঈদের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কোনো বাংলা সিনেমা যখন রিলিজ হয়নি, হলে যখন দর্শক নেই- তখন কিন্তু আমি রিস্ক নিয়ে ‘শরতের জবা’ রিলিজ দিয়েছি। অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে সিনেমা রিলিজ না দিতে অনেকে আমাকেও বলেছিলেন। কিন্তু আমি রিস্কটা নিয়েছিলাম।”
কথার সূত্র ধরেই কুসুম বলেন,“দর্শক ছবিটি দেখতে সেই সময়ে হলে আসবে কিনা, এমন সংশয় কিন্তু ছিলো। কেননা ওই সময়ে আমি যে খুব একটা প্রমোশনের সুযোগ পেয়েছি, তা কিন্তু নয়। তারমধ্যেও আমি যা পেয়েছি, সেটা আমার প্রত্যাশার বাইরে। অনেক মানুষ ‘শরতের জবা’ সিনেমা হলে গিয়ে দেখেছেন! ফলে আমি বলতে পারি, আমি রিস্ক নিয়েছি, এবং কিছুটাতো গেইন করেছিই।”
চব্বিশে পাওয়া নতুন তিন পরিচয় নিয়ে কুসুম সিকদার বলেন,“চিত্রনাট্যকার, পরিচালক ও প্রযোজক- এ বছর তিনটি পরিচয় যুক্ত হলো। এক আঙ্গিকে অভিনয়টাও। কারণ ‘শঙ্খচিল’ মুক্তির প্রায় ৮ বছর পর কিন্তু আমি অভিনয়ে ফিরলাম। আমি সব সময় বলি, অভিনয়টা আমি খুব যে পারি তা নয়। দশে নিজেকে আমি দুইয়ের উপরে দিতে পারি না। তো অভিনয়ে যদি দুই দিই, আর বাকিগুলোতে একেবারে এ বছরেই শুরু হলো- মার্কিং করতে বললে আমি বলবো, আমি এখনো জিরোতে! আর বাকিটা দর্শকের উপর, যারা সিনেমা হলে কিংবা আইস্ক্রিনে ‘শরতের জবা’ দেখেছেন, তারা মার্ক দিবেন! সেটা আমি সাদরে গ্রহণ করবো।”
কুসুম বলেন, “নিজের মূল্যায়ণ করতে বললে আমি বলবো, শিল্পী হিসেবে আমি কখনোই সেটিসফায়েড না। অভিনয়তো বললাম ই, সর্বোচ্চ নিজেকে দশে দুই দিবো। চিত্রনাট্যকার, পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে আমার মূল্যায়ণ ভার একেবারেই দর্শকদের উপরে ছেড়ে দিতে চাই।।”
অতীতের চেয়ে বর্তমানে ক্যামেরার পেছনে বহু নারী যুক্ত হচ্ছেন। তবুও বছর শেষে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের তালিকার দিকে তাকালে হতাশই হতে হয়। বিশেষ করে নির্মাতার আসনে ওই অর্থে নারীকে প্রায় দেখা ই যায় না। সে অনুযায়ি নতুন মুখ হিসেবে এ বছর একমাত্র নারী নির্মাতা, প্রযোজক কুসুম সিকদার। নিজ অভিজ্ঞতায় এ বিষয়ে বেশ কিছু ফ্যাক্টের কথা বলেন তিনি।
কুসুম সিকদার বলেন, অভিজ্ঞতা কিন্তু আমার খুব একটা সুখকর ছিলো না। আমি যখন শুরু করি, তখন আমার কাছে মনে হয়েছিলো- এতোদিন ধরে যেহেতু অভিনয় করি, ফলে ইন্ডাস্ট্রিটা এক অর্থে আমারও! ভয়ের জায়গাটা কমই ছিলো। কিন্তু আমি যখন কাজ করতে আসলাম, তখন দেখলাম- এখানে ভুল ভ্রান্তির কিছু সম্ভাবনা আছে, ব্যর্থতার কিছু সম্ভাবনা আছে এবং এগুলোকে সাথে নিয়েই কাজ করতে হবে। সেভাবেই করেছি।
কুসুম বলেন, কাজ করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো এবং এই পরিস্থিতিগুলো বার বার তৈরী হয়েছিলো। শুধু চিত্রনাট্যটা আমি একান্তে নিজের মতো করে করেছি। এর পরের যে কাজগুলোতে আসলে স্বভাবতই আমার সঙ্গে অনেক মানুষ জড়িয়ে যায়। নির্মাণ, প্রযোজনা কিংবা প্রমোশন পর্যন্ত- বহু মানুষকে ডিল করতে হয়েছে। তো ওই যে বলছিলাম, শুরুর ভাবনা ছিলো- ইন্ডাস্ট্রিটা আমার, এই ভাবনাটা সঠিক হলেও- পথ খুব একটা মসৃণ ছিলো না। সত্যি কথা বলতে, পরিস্থিতি এমনও হয়েছে- মাঝেমধ্যেই আমার মনে হয়েছে যে আমি পারবো না। মনে হয়েছে ‘শরতের জবা’ নিয়ে আমি গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়তো ব্যর্থ হবো, তখনই মনে হয়েছে- নির্মাণ বা প্রযোজনায় মেয়েরা কেন পারছে না- এমন প্রশ্ন তো আমরা প্রায়শই শুনি, যদি ব্যর্থ হই তাহলে এমন প্রশ্ন কি এড়ানো সম্ভব!
সেই পরিস্থিতিকে কুসুম ব্যাখ্যা করেন এভাবে,“আমার বারংবার মনে হয়েছে, আমি মেয়ে বলেই কি কাজটি সম্পন্ন করতে এতো কষ্ট হচ্ছে! এতো বাধা আসছে, এতো সীমাবদ্ধতা তৈরী হচ্ছে! মনে হয়েছে, এই পর্যায়ে এসে আমি যদি দমে যাই, তাহলে তো উদাহরণ তৈরী করতেই পারলাম না। তাহলে তো আমি ব্যর্থ হয়ে গেলাম। সে কারণেই আমি নিজে নিজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম, যতো বাধাই আসুক- আমি দমে যাবো না। আমি জানি পড়ে যাবো, কিন্তু আমাকে সফলতার সাথে উঠে দাঁড়াতেই হবে। বিশেষ করে নারী বলেই আমাকে উঠে দাঁড়াতে হবে।”
এসময় কুসুম বলেন, আর এই কঠিন সময়ে আমাকে স্ট্রেন্থ দিয়েছেন আমাদের শ্রদ্ধেয় বস ফরিদুর রেজা সাগর। উনি ভীষণভাবে আমাকে সমর্থন দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন। আমি জানি, তিনি অনেককেই এভাবে মানসিকভাবে শক্তি যুগান।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এসময় কুসুম নারীদের উদ্দেশে বলেন, “শুধু সিনেমা নয়, যে কোনো কর্মক্ষেত্রই নারীদের জন্য মসৃণ নয়। আমি যেহেতু অম্ল মধুর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এসেছি, সেই জায়গা থেকে নারীদের উদ্দেশে একটা কথা বলতে পারি, বাধা আসবে এমনকি কাছের পরিচিত মানুষরাও দমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে, ডিমরালাইজ করার চেষ্টা করবে; কিন্তু দমে গেলে হবে না। এই বাধাগুলো ওভারকাম করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে, যদি সফল হতে চাই।”
নতুন বছরে কাজের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে কুসুম বলেন, “অভিনয় থেকে শুরু করে লেখালেখি, আমার সবই কিন্তু সংখ্যায় খুম কম। আমি চেষ্টা করি সময় নিয়ে, প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করতে। এজন্যই আমি বলতে পারছি না, নেক্সট কাজটি কবে কীভাবে হতে পারে! এই মুহূর্তে ‘শরতের জবা’ নিয়েই ব্যস্ত আছি। আর যেটা বলবো, আমি যেটা মনেপ্রাণে চাই- আমার কাছের মানুষরা, যারা আমাকে নিয়ে ভাবেন- তারা যেন ভালো থাকেন, সুস্থ থাকেন।”
শরতের জবা পরিচালনা, চিত্রনাট্য ও প্রযোজনা: কুসুম সিকদার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান: ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও পহরডাঙ্গা পিকচার্স অভিনয়: কুসুম সিকদার, জিতু আহসান, ইয়াশ রোহান, নিদ্রা দে নেহা, নরেশ ভূঁইয়া, শহিদুল আলম সাচ্চু প্রমুখ। ওটিটি প্লাটফর্ম: আইস্ক্রিন









