এআইয়ের দখলে সংবাদ? সাংবাদিকতায় মানুষের জায়গা কোথায়?
ফ্যাক্টচেক, নৈতিকতা ও তথ্য নিরাপত্তার ওপর জোর বিশেষজ্ঞদের

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ বদলে দিচ্ছে সাংবাদিকতার কাজের ধরন। তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, অনুবাদ, অডিও থেকে লেখা তৈরি কিংবা কনটেন্ট তৈরিতে এআই সাংবাদিকদের সময় ও শ্রম কমাচ্ছে। একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন কিছু প্রশ্ন; এআইয়ের তৈরি তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য, ভুল তথ্য ছড়ালে দায় কার, সাংবাদিকের সৃজনশীলতা কতটা অক্ষুণ্ন থাকবে এবং প্রযুক্তির কারণে কর্মসংস্থানের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআইকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে সাংবাদিকতায় এর ব্যবহার হতে হবে সতর্ক ও দায়িত্বশীলভাবে। এআই সাংবাদিকের বিকল্প নয়, বরং সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করবে এটাই হওয়া উচিত গণমাধ্যমের নীতি।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) চ্যানেল আইয়ের ২৮ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে রাজধানীর চ্যানেল আই স্টুডিও বারান্দায় আয়োজিত ‘সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চ্যানেল আইয়ের প্রধান বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান। সূচনা বক্তব্য দেন চ্যানেল আইয়ের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান। অনুষ্ঠানে এআই নিয়ে নির্মিত বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ‘ন মানব’ প্রদর্শন করা হয়।
আলোচনায় ডেইলি ওয়াদার বার্তা প্রধান ইয়াশাব ওসামা রহমান বলেন, সব এআই প্ল্যাটফর্ম সব ধরনের বিষয়ে সমানভাবে আলোচনা বা বিশ্লেষণ করতে পারে না। এর পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
মানুষ এখন আগের মতো সরাসরি নিউজ পোর্টালে না গিয়ে অনেক সময় এআইয়ের মাধ্যমে সংবাদ ও তথ্য জানতে চাইছে। ফলে সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে পাঠকের সরাসরি প্রবেশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তার মতে, বাংলাদেশে এই পরিবর্তিত তথ্যচাহিদা পূরণের জন্য এখনো শক্তিশালী নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠেনি।
রয়টার্সের সাংবাদিক সাম জাহান সাংবাদিকতায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই বা ফ্যাক্টচেকের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এআইকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সাংবাদিকতার কাজেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও তথ্য যাচাইয়ের প্রচলিত পদ্ধতি বজায় রাখতে হবে।
কারণ এআই দ্রুত তথ্য দিতে পারলেও সেটি সবসময় সঠিক তথ্য দেবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই এআইয়ের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য প্রকাশের আগে সাংবাদিকের নিজস্ব যাচাই জরুরি।
চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ বলেন, এআই ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্টের ক্ষেত্রে যথাযথ ডিসক্লেইমার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, এআইনির্ভর কনটেন্ট এবং প্রচলিত সাংবাদিকতার মাধ্যমে তৈরি সংবাদকে কীভাবে দেখা হবে, সে বিষয়ে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর সুস্পষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন।
বিশেষ করে কোনো ছবি, ভিডিও, অডিও বা সংবাদ উপকরণ এআই দিয়ে তৈরি কিংবা পরিবর্তন করা হলে দর্শক ও পাঠককে বিষয়টি জানানো উচিত বলে মত দেন তিনি।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) সহকারী অধ্যাপক মালিহা তাবাসসুম বলেন, এআইনির্ভর সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তি জানলেই হবে না, দর্শক ও পাঠকের মনস্তত্ত্বও বুঝতে হবে।
এআইয়ের মাধ্যমে মানুষ কীভাবে সংবাদ খুঁজছে, কোন ধরনের তথ্য গ্রহণ করছে এবং কীভাবে সংবাদ উপস্থাপন করলে তা নতুন ধরনের সার্চ ও তথ্যপ্রাপ্তির ব্যবস্থায় গুরুত্ব পাবে এসব বিষয় নিয়েও গণমাধ্যমকে ভাবতে হবে।
তিনি সাংবাদিকতায় এআই ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা ও প্রকল্প গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন।
ইউল্যাবের গণমাধ্যম অধ্যয়ন ও সাংবাদিকতা বিভাগের ড. এম সুমন রহমান এআই ব্যবহারের ফলে সাংবাদিকতার সৃজনশীলতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরেন।
সাংবাদিকরা যদি তথ্য সংগ্রহ, লেখা ও কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তাহলে তাঁদের নিজস্ব চিন্তা ও সৃজনশীলতার চর্চায় প্রভাব পড়তে পারে।
একই সঙ্গে প্রযুক্তির কারণে সাংবাদিকতা পেশায় কর্মসংস্থান ও চাকরির ধরন কীভাবে পরিবর্তিত হবে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার কথা বলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ড. মো. মোসাদ্দেক খান বলেন, নতুন কোনো এআই মডেল তৈরি হয়েছে বলেই সেটি সব ক্ষেত্রে নিরাপদ এমন ধারণা ঠিক নয়।
গণমাধ্যমে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের হাতে থাকা ব্যক্তিগত, সংবেদনশীল বা গোপন তথ্য কোনো এআই প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারের আগে ঝুঁকি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী নিজস্ব বা নিয়ন্ত্রিত এআই মডেল তৈরির বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মত দেন তিনি।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চ্যানেল আইয়ের প্রোগ্রাম অপারেশনের নির্বাহী পরিচালক এস. এম. হারুন-অর-রশীদ।
তিনি বলেন, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, অনুবাদ, অডিও প্রতিলিপি, ছবি ও কনটেন্ট তৈরির মতো কাজে এআই সাংবাদিকদের সময় ও শ্রম কমাতে পারে। তবে এর সঙ্গে ভুল তথ্য, ডিপফেক, পক্ষপাত, গোপনীয়তা লঙ্ঘন, কপিরাইট সমস্যা এবং সাংবাদিকের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন বাংলা ডেটাসেটের ঘাটতি, সরকারি তথ্যের অগোছালো ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ জনবলের সংকট রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তার মতে, সাংবাদিকতায় এআইকে মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়, সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। এআই দিয়ে তৈরি বা প্রক্রিয়াজাত কোনো তথ্য প্রকাশের আগে মানব সাংবাদিক ও সম্পাদকের যাচাই নিশ্চিত করতে হবে।
আলোচনায় উঠে আসে ডিপফেক ও কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি-ভিডিওর প্রসঙ্গও। এআইয়ের সহজলভ্যতার কারণে এখন অল্প সময়ের মধ্যে বাস্তবের মতো দেখতে ছবি, ভিডিও কিংবা কণ্ঠ তৈরি করা সম্ভব। ফলে কোনটি সত্য এবং কোনটি কৃত্রিমতা শনাক্ত করা সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ ভুল ছবি, মিথ্যা উদ্ধৃতি কিংবা কৃত্রিম ভিডিও সংবাদ হিসেবে প্রচার হলে শুধু একটি সংবাদই ভুল হবে না, পাঠক-দর্শকের গণমাধ্যমের ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ কারণে এআই ব্যবহারের পাশাপাশি সাংবাদিকের নিজস্ব অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই এবং উৎস যাচাইয়ের দক্ষতা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন আলোচকরা।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশেও গণমাধ্যমে এআই ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। সংবাদ লেখা, অনুবাদ, ট্রান্সক্রিপশন, শিরোনাম তৈরি, আর্কাইভ থেকে তথ্য খোঁজা এবং কনটেন্ট সম্পাদনার মতো কাজে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও, ফটোকার্ড ও কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে সাংবাদিকদের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতার পাশাপাশি এআই-সৃষ্ট কনটেন্ট শনাক্ত ও যাচাই করার দক্ষতাও প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
আলোচনায় বক্তারা মনে করেন, এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। কোথায় এআই ব্যবহার করা যাবে, কোথায় যাবে না, এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট কীভাবে চিহ্নিত করা হবে এবং প্রকাশের আগে কী ধরনের যাচাই করতে হবে এসব বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার।
বিশেষ করে ব্যক্তিগত তথ্য, গোপনীয় নথি, অপ্রকাশিত সংবাদ উপকরণ এবং সংবেদনশীল তথ্য এআই টুলে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।
আলোচনা সভার মূল বক্তব্য ছিল প্রযুক্তির অগ্রগতি থামানো যাবে না। এআই সাংবাদিকতার কাজকে দ্রুত ও সহজ করতে পারে, আবার ভুল তথ্য ও কৃত্রিম কনটেন্টের মাধ্যমে নতুন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
তাই সাংবাদিকতায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ওপর অন্ধ নির্ভরতার বদলে মানুষের বিচারবোধ, অনুসন্ধানী দক্ষতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতাকে সামনে রাখার ওপর জোর দেন বক্তারা।
প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অতিথিরাও আলোচনায় অংশ নেন। তারা সাংবাদিকতায় এআই ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
চ্যানেল আইয়ের ২৮ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় অংশ নেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মো. সাইফুল আলম চৌধুরী, ড. মো. মোসাদ্দেক খান, ইউল্যাবের ড. এম সুমন রহমান, বিইউপির সহকারী অধ্যাপক মালিহা তাবাসসুম, রয়টার্সের সাম জাহান, ডেইলি ওয়াদার ইয়াশাব ওসামা রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে আলোচনায় উঠে আসে একটি বিষয় এআই সাংবাদিকতার কাজের ধরন বদলাবে, কিন্তু সংবাদ সত্য কি না, তার চূড়ান্ত যাচাইয়ের দায়িত্ব এখনো মানুষেরই।







