গাজা সিটির ওপর ইসরায়েলের নতুন সামরিক অভিযানের প্রাথমিক ধাপ শুরু হয়েছে। এই অভিযানের অংশ হিসেবে, ইসরায়েল দশ হাজারের বেশি রিজার্ভ সেনা ডেকে পাঠাচ্ছে। আরও ২০ হাজার সেনা সদস্যের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু গাজা সিটিকে হামাসের শেষ ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং এই এলাকা দখলের নির্দেশ দিয়েছেন।
আজ (২১ আগস্ট) বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সিএনএন জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। মানবিক সংকট ও দুর্ভিক্ষ আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া, গাজায় থাকা বাকি জিম্মিদের জীবনও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সেনাবাহিনীর ক্লান্তি ও মনোবল হ্রাস
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন জানান, সেনাবাহিনী ইতিমধ্যেই গাজা সিটির উপকণ্ঠে অবস্থান নিয়েছে। তবে এই অভিযানের সময়সীমা ৫ মাস থেকে কমিয়ে দ্রুত শেষ করতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নির্দেশ দিয়েছেন। দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের যুদ্ধ চলাকালে সেনাদের মধ্যে ক্লান্তি ও মানসিক চাপ বেড়েছে।
আইডিএফ চিফ অফ স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জেমির সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, সেনাদের মধ্যে বার্নআউট ও মনোবল হ্রাস পাচ্ছে। তবে এই উদ্বেগকে উপেক্ষা করেই সরকার নতুন অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ সেনা আগের চেয়ে কম উৎসাহী, যেখানে মাত্র ১৩ শতাংশ সেনার মনোবল বেড়েছে। এর মধ্যেই দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন বাড়ছে।
অতি-ধর্মীয়দের বিতর্ক
যুদ্ধ চালিয়ে যেতে রিজার্ভ বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে আইডিএফকে। তবে অনেক সেনা ইতিমধ্যে একাধিকবার ডাকা হয়েছে, এবং তারা ফিরে যেতে অনিচ্ছুক। এই অবস্থায় সেনাবাহিনী অতি-ধর্মীয় ইহুদি পুরুষদের বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানালেও, সাধারণ ধর্মীয় সম্প্রদায় ব্যাপকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা সরকারের কাছে পূর্ণ ছাড় দাবি করছে, যা দেশটিতে নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
জিম্মিদের জীবন হুমকির মুখে
গাজায় ইতিমধ্যে চারবার মোতায়েন হওয়া রিজার্ভ সেনা আফশালোম জোহার সাল বলেন, এই সিদ্ধান্ত জিম্মিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের সমান। তিনি এবং তার ইউনিটের সদস্যরা আর গাজা সিটিতে ফিরে যেতে রাজি নন।
সাবেক আইডিএফ প্রধান ড্যান হালুটজ বলেন, আমি বিশ্বাস করি অনেক রিজার্ভ সেনা আর ফিরবে না,” উল্লেখ করে যে যুদ্ধের আর কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নেই।
মানবিক সংকটের ভয়াবহতা
এই মুহূর্তে গাজা সিটিতে প্রায় ১০ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ অবস্থান করছে। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, গত ছয় মাসে শিশু অপুষ্টির হার তিনগুণ বেড়েছে এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু এখন অপুষ্টিতে ভুগছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার প্রধান ফিলিপ লাজারিনি বলেন, এটি একটি মানবসৃষ্ট, প্রতিরোধযোগ্য দুর্ভিক্ষ। যদিও নেতানিয়াহুর সরকার দাবি করে, গাজায় ‘দুর্ভিক্ষ’ চলছে না।
২২ মাস আগে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর শুরু হওয়া যুদ্ধের এখনও কোনো শেষ নেই। নেতানিয়াহুর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধের ‘তীব্রতম ধাপ’ অনেক আগেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে যুদ্ধের ভয়াবহতা আরও বেড়েছে, এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী মানবসম্পদের সংকট, মনোবলের ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।









