বাংলাদেশের শীর্ষ পাঁচ সয়াবিন প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান আগামী এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সয়াবিন ও সয়াবিন মিল আমদানির অঙ্গীকার করেছে। এ বিষয়ে পাঁচ প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউ.এস. সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিল (USSEC)–এর সঙ্গে অভিপ্রায়পত্র (Letter of Intent–LOI) স্বাক্ষর করেছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, সিটি গ্রুপ, ডেল্টা অ্যাগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, মাহবুব গ্রুপ এবং কেজিএস গ্রুপ।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত অভিপ্রায়পত্র স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের জন্য নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য আফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন, অ্যাগ্রিকালচার অ্যাটাচে এরিন কভার্ট, USSEC-এর আঞ্চলিক নির্বাহী পরিচালক কেভিন এম. রোপকে, এবং ইউসেক বাংলাদেশ টিম লিড খাবিবুর রহমান কাঞ্চন।

খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রোটিন খাতে নতুন অধ্যায়
চুক্তির পর মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল চ্যানেল আইকে বলেন, “ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির অনেকটা পূরণ হবে এর মাধ্যমে । এটি বাংলাদেশের ক্রাশিং শিল্পের জন্যও একটি বড় মাইলফলক। যত বেশি সয় ক্রাশ করা যাবে, তত বেশি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এটি পোলট্রি, ফিড ও ভোজ্যতেল শিল্পের প্রবৃদ্ধি বাড়াবে।”
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন USSEC-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জিম সাটার। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সয় ভ্যালুচেইন এ চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সয়ের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত খুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন এখন বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।”

আমদানিতে মান ও স্বচ্ছতা বড় কারণ
মেঘনা গ্রুপের পরিচালক তানজিমা বিনতে মোস্তফা বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছি তাদের পণ্যের মান, পরিবহনব্যবস্থা ও স্বচ্ছ নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যের কারণে। এই চুক্তি খাদ্যদ্রব্যের দাম স্থিতিশীল রাখা ও কৃষিশিল্পকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে সয়াবিন আমদানিতে শুল্ককাঠামো কিছুটা প্রতিবন্ধক। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এ কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা দরকার।”
সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান বলেন, “আমরা সব সময় টেকসই ও গুণগত খাদ্য সরবরাহে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমানের সয়াবিন ব্যবহারে প্রোটিন খাত আরও শক্তিশালী হবে।”

বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেও ভূমিকা
ডেল্টা অ্যাগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের মান সব সময়ই অন্যদের চেয়ে ভালো। আমরা চাইলে এলপিজি, অপরিশোধিত তেল ও সয়াবিন আমদানির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে পারি।”
বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে শিল্পখাতের এই উদ্যোগ ঘাটতি কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি ট্রেসি জ্যাকবসন বলেন, “আমরা এখন এমন এক অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিকে যাচ্ছি, যেখানে কৃষি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। গত বছর দুই দেশের মধ্যে ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলারের বাণিজ্য হয়েছে, যা এ বছর এক বিলিয়ন ছাড়াতে পারে।”
এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও মজবুত এবং অগ্রগতির নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে চ্যানেল আইকে বলেন ইউসেকের মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক কেভিন রোপকে ।

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিনের চাহিদা বাড়ছে দ্রুত
ইউসেক বাংলাদেশ লিড খাবিবুর রহমান কাঞ্চন ইউসেকের অক্টোবর ২০২৫ এর বাজার প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের সয়াবিন ক্রাশিং ৯.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২.৪ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছাবে। পোলট্রি ও মৎস্যখাতে খাদ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ায় এ প্রবৃদ্ধি ঘটছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সয়াবিন চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি নির্ভর, যার বড় অংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশটি ৭৮ কোটি ডলারের ১৭ লাখ ৩৫ হাজার টন সয়াবিন আমদানি করেছে, যার মধ্যে ৩৫ কোটি ডলার মূল্যের সয়াবিন এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
টেকসই উৎপাদনের দিকেও নজর
চুক্তিতে টেকসই উৎস থেকে সংগ্রহ ও পরিবেশগত প্রভাব কমানোর দিকেও জোর দেওয়া হয়েছে। মার্কিন সয়াবিন Soy Sustainability Assurance Protocol (SSAP) অনুসারে উৎপাদিত, যা পরিবেশবান্ধব ও সমাজমুখী উৎপাদন নিশ্চিত করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন উদ্যোগ সয়াবিন বাণিজ্যের সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে, পাশাপাশি এটি হতে পারে বাংলাদেশের প্রোটিন খাত ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক কৌশলগত পদক্ষেপ, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৃষিশিল্প ও বাণিজ্য সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।










