দক্ষিণ গাজার নাসের হাসপাতালে মারাত্মক অসুস্থ ও ক্ষুধার্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে দুর্বলতার কারণে চিকিৎসক অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। এসময় চিকিৎসক নিজেও ক্ষুধার্ত ছিলেন বলে জানা যায়।
শনিবার (২৬ জুলাই) সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
এই প্রতিবেদনে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) দক্ষিণ গাজার নাসের হাসপাতালের চিকিৎসক মোহাম্মদ সাকের ওয়ার্ডে কাজ করার সময় অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এসময় তিনি এতটাই ক্ষুধার্ত ছিলেন যে, মারাত্মক অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা করার সময় তিনি মাঝে মাঝে সোজা থাকতেও হিমশিম খাচ্ছিলেন।

তিনি বলেন, “আমার সহকর্মী ডাক্তাররা আমি পড়ে যাওয়ার আগে আমাকে ধরে ফেলেন এবং তারা আমাকে আইভি তরল এবং চিনি দিয়েছিলেন। একজন বিদেশী ডাক্তার ছিলেন যার কাছে ট্যাঙ্গো জুসের প্যাকেট ছিল, যা আমার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। আমি তাৎক্ষণিকভাবে তা পান করেছিলাম।”
ডা. সাকের বলেন, “আমি ডায়াবেটিস রোগী নই, আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম। এখানে কোন চিনি নেই, কোন খাবার নেই।”
গাজার ক্ষুধা সংকট যত গভীর হচ্ছে, গুরুতর অপুষ্টিতে ভোগা জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যারা চেষ্টা করছেন, তাদের রোগীদের সাথে তারাও কষ্ট পাচ্ছেন।
ডা. সাকের বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কর্মক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে পড়া তার সহকর্মীদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্ষুধা ও ক্লান্তিতে বিভিন্ন বিভাগের ডাক্তার ও নার্সরা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
ডা. ফাদেল নাইম একজন সার্জন এবং স্ট্রিপের উত্তরে অবস্থিত আল-আহলি আল-আরাবি হাসপাতালের পরিচালক। তিনি জানান, তার অনেক সহকর্মীও ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছেন, যার মধ্যে এই সপ্তাহে অস্ত্রোপচারের সময় দুজন মারা গেছেন।
তিনি বলেন, “যেহেতু আমি হাসপাতালের পরিচালক, তাই আমার কাজগুলোর মধ্যে একটি হল কর্মীদের জন্য খাবার সংগ্রহ করা। আমরা পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছি না। আমরা যদি দিনে একবেলা খাবার খাই, তাহলে আমরা ভাগ্যবান। বেশিরভাগ মানুষ হাসপাতালে ২৪/৭ ঘন্টা কাজ করছে। এভাবে চালিয়ে যাওয়া খুব কঠিন।”
এই দুই ডাক্তারের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য অনুযায়ী এই সপ্তাহের শুরুতে ১০০ টিরও বেশি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা যা বলেছিল তার সাথে মিলে যায়। তারা সতর্ক করেছিল, “তাদের নিজস্ব সহকর্মী এবং অংশীদারদের তাদের চোখের সামনে নিঃশেষ হতে দেখছেন।”
ডা. সাকের নাসের হাসপাতালের নার্সিং ডিরেক্টর। সেখানকার অন্যান্য চিকিৎসকদের মতো তিনি প্রতিদিন মাত্র এক প্লেট ভাত খেতে পান বলে জানা যায়।
তিনি বলেন, “আমরা শারীরিকভাবে ক্লান্ত এবং আমাদেরও একইভাবে ক্লান্ত রোগীদের চিকিৎসা করতে হয়। এখানে ক্লান্ত মানুষ অন্যান্য ক্লান্ত মানুষের চিকিৎসা করে, ক্ষুধার্তরা ক্ষুধার্তদের চিকিৎসা করে, দুর্বলরা দুর্বলদের চিকিৎসা করে।”
নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সের আল-তাহরির শিশু ও প্রসূতিবিদ্যা হাসপাতালের পরিচালক ডা. আহমেদ আল-ফাররা বলেন, ক্ষুধা সকল ডাক্তারের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলেছে।
তিনি বলেন, “তাদের বেশিরভাগই এখন বিষন্নতা, সাধারণ দুর্বলতা, মনোযোগ দিতে অক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাসে ভুগছেন। তাদের শক্তির মাত্রা অত্যন্ত কম। আগের মতো আর কিছুই নেই। তাদের বেশিরভাগই জীবনের প্রতি তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।”
তিনি বলেন, হাসপাতালের রান্নাঘরে খাবার ফুরিয়ে গেছে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক রান্নাঘর যা আগে ডাক্তার, নার্স এবং রোগীদের পরিবারকে খাওয়াত তাও বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, “হাসপাতালের ভেতরে কর্মরত সকলেই খাবার ছাড়াই আছেন। ডাক্তার এবং নার্সরা খালি পেটে ২৪ ঘন্টা কাজ করছেন।”
এদিকে ডা. সাকের যে হাসপাতালে কাজ করেন, সে ওয়ার্ডটি এত অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের পরিপূর্ণ যে, তাদের দেখতে আর মানুষের মতো মনে হয় না।তাদের মুখ, মেরুদণ্ড এবং পাঁজরের হাড়গুলি তাদের ত্বকের নিচ থেকে বেরিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে। তাদের অঙ্গগুলো খুব একটা নড়াচড়া করে না।

শুক্রবার (২৫ জুলাই) ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায় তাদের অনেকেই কাঁদছেন, কিন্তু কেউ কেউ এত দুর্বল যে তারা আর কান্না করতেও সক্ষম নন। তারা কেবল তাদের খাটে বা মেঝেতে রাখা গদিতে শুয়ে আছেন এবং তাদের চারপাশের পৃথিবী পর্যবেক্ষণ করছেন। অনেকের পেট ফুলে গেছে, যা অপুষ্টির স্পষ্ট লক্ষণ।
যে মায়েরা তাদের শিশুদের খাওয়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন তারা নিজেরাও রোগা। তারাও ক্লান্ত এবং আতঙ্কিত।
ইয়াসমিন আবু সুলতান নামে এক মা, তার মেয়ে মোনাকে সিরিঞ্জ দিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলেন।

চিকিৎসক বলেন, “তার ফল দরকার। আমাদের তাকে শাকসবজি খাওয়াতে হবে কিন্তু কিছুই নেই। মায়েরা আগে বুকের দুধ খাওয়াতেন। আমরা ফর্মুলার উপর নির্ভর করতাম না। এখন বেশিরভাগ মায়েরা খাবারের অভাবে ফর্মুলার উপর নির্ভর করেন। খাবার ছাড়া মহিলাদের পক্ষে বুকের দুধ খাওয়ানো অসম্ভব।”









