১৫ বছরের ছোটকাকু, এবার দুই দিনের উৎসব
কৃষির দুর্নীতিতেও ‘ছোটকাকু’র গোয়েন্দাগিরি চান শাইখ সিরাজ

শিশু-কিশোরদের প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ‘ছোটকাকু’। বইয়ের পাতা পেরিয়ে ১৫ বছর ধরে টেলিভিশনের পর্দাতেও দর্শকদের আনন্দ দিয়ে আসছে চরিত্রটি। এবার ছোটকাকুকে ঘিরেই আয়োজন করা হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘ছোটকাকু উৎসব ২০২৬’। উৎসবের আয়োজন নিয়ে শনিবার দুপুরে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়েছে সংবাদ সম্মেলন ‘সাংবাদিক সমীপে ছোটকাকু উৎসব’।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ছোটকাকুর স্রষ্টা ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, গুণী অভিনেতা, নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী আফজাল হোসেন, অভিনেতা ও নাট্য নির্দেশক তারিক আনাম খানসহ ছোটকাকুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকে।
আগামী ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আলোকি, গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোডে অনুষ্ঠিত হবে ‘ছোটকাকু উৎসব ২০২৬’। দুই দিনের আয়োজনে থাকছে মজাদার প্রতিযোগিতা, পুরস্কার, আড্ডা, আলোচনা ও বিনোদনমূলক নানা অনুষ্ঠান।
আয়োজনটি নিয়ে ‘ছোটকাকু উৎসব’-এর অন্যতম আয়োজক সানাউল আরেফিন বলেন, “বাচ্চাদের কথা বিবেচনা করে আমরা দুই দিনের পুরো আয়োজনটি রেখেছি। তারা যেন খুব সুন্দর কিছু নিয়ে ঘরে ফিরতে পারে।”
ছোটকাকুর ১৫ বছরের টেলিভিশন যাত্রার কথা তুলে ধরে তারিক আনাম খান বলেন, “১৫ বছর ধরে ‘ছোটকাকু’ নাটক হিসেবে প্রচার হচ্ছে, এটা অবশ্যই অনেক দারুণ খবর। দুই দিনব্যাপী ‘ছোটকাকু উৎসব’ নিয়ে যে আয়োজন রাখা হয়েছে, সেখানে সবাই শিশু-কিশোরদের নিয়ে আসুন, তাদের এই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করুন।”
বইয়ের পাতার ছোটকাকুকে পর্দায় প্রাণ দিয়েছেন গুণী অভিনেতা আফজাল হোসেন। ১৫ বছর ধরে চরিত্রটির সঙ্গে তার পথচলা। সংবাদ সম্মেলনে ছোটকাকুর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “ছোটকাকু চরিত্রে আমি ১৫ বছর ধরে অভিনয় করেছি, আর আমি অভিনয় করি চল্লিশ বছর ধরে। ছোটকাকু চরিত্রে যখন অভিনয় শুরু করি, তখন অভিনয় থেকে আমি প্রায় বাইরে চলে গেছি। আমাকে অভিনয় আর তখন আকর্ষণ করছিল না।”
তিনি বলেন, “আমরা বলেছি যে সবাই ছোটদের সাহিত্য করতে করতে বড় হয়েছি, মনে হয়েছে আমাদের এই পর্যায়ে এসে ছোটদের জন্য আমরা কিছুই করছি না। সেই দায় থেকেই ১৫ বছর ধরে ‘ছোটকাকু’ করে চলেছি।”
‘ছোটকাকু উৎসব’ নিয়ে আফজাল হোসেন বলেন, জীবনে আনন্দ ও উৎসব প্রয়োজন। সেই আনন্দ ও উৎসাহ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই এই আয়োজন।
তার ভাষায়, “আমাদের জীবনে শুধু আছে অনুযোগ, অভিযোগ আর দোষ ধরা। কিন্তু ভালোও যে আছে, সে কথাটাও তো আয়োজন করে বলতে হবে। প্রশংসা করার মতো কাজ যে দেশে হয়, সেটাও তো বলতে হবে। তার জন্যই আমাদের ছোটকাকু উৎসব।”
এসময় ১৫ বছর ধরে ‘ছোটকাকু’তে অভিনয় করা শিল্পীদের নিয়ে একটি গান তৈরির কথাও জানান আফজাল হোসেন। পরে সেই গানটি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অতিথিদের সামনে প্রদর্শন করা হয়।
‘ছোটকাকু উৎসব’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ফরিদুর রেজা সাগরের অন্যতম সৃষ্টি ছোটকাকুর প্রশংসা করেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ। তিনি ছোটকাকুর স্রষ্টা ফরিদুর রেজা সাগর এবং পর্দায় ছোটকাকুকে রূপ দেওয়া আফজাল হোসেনকে উদ্দেশ করে বলেন, ছোটকাকুর গল্পে এবার কৃষিক্ষেত্রের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ও তুলে ধরা যেতে পারে।
তিনি বলেন, “তোমরা ছোটকাকুর গোয়েন্দা কাহিনীতে পর্দায় অনেক কিছু তুলে ধরেছো, কৃষিখাতে যে কত ধরনের দুর্নীতি আছে—সেই গোয়েন্দাটা এবার একটু দেখাও। সার ছিটিয়ে ফসল মেরে ফেলে, নিজেদের ভেতরে দ্বন্দ্বের কারণে কলা গাছ কেটে ফেলে। এগুলোর ভেতরে তো গোয়েন্দা কাহিনীর গল্প আসতে পারে।”
শাইখ সিরাজ আরও বলেন, ছোটকাকুর আবেদন এখন শুধু শহরের শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, প্রান্তিক অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে।
তিনি বলেন, “ছোটকাকুর কথা প্রান্তিক অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে। বিশেষ করে আমি যখন কৃষকের ঈদ আনন্দ করতে যাই, সেখানে অসংখ্য দর্শক থাকে, তার মধ্যে ছোট ছোট কিছু দর্শক থাকে। তাদেরও খেলা থাকে। আমি প্রায়শই সাগরের কাছ থেকে শিশুদের জন্য ছোটকাকুর যে স্কুল ব্যাগ, সেগুলো শিশুদের সেগমেন্টের জন্য নিয়ে যাই। তখন দেখি, ছোটকাকুর এই ব্যাগের জন্য কাড়াকাড়ি লেগে যায়। তার মানে বোঝাই যায়, তৃণমূল পর্যন্ত ছোটকাকু নাটকটির আবেদন তৈরি হয়েছে।”
সবশেষে কথা বলেন ছোটকাকুর স্রষ্টা ফরিদুর রেজা সাগর। নিজের জীবনের দুই ব্যক্তির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমার সত্যিই একজন ছোটকাকু ছিলেন ড. ফজলুল আলম। আর ছোটকাকু মূলত যার প্রেরণায় লেখা হয়েছে, তিনি আমীরুল ইসলাম। সম্প্রতি তিনি প্রয়াত হয়েছেন। দুজনেই আমাদের ছেড়ে গেছেন, কিন্তু ছোটকাকু চরিত্রটা রয়ে গেছে।”
ছোটকাকু সৃষ্টির শুরুর সময়ের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “ছোটকাকু প্রথম লেখা শুরু হয় ২০০৪ সালে। তখনই আমরা ‘কক্সবাজারে কাকাতুয়া’ লেখার মধ্য দিয়ে পরিকল্পনা করেছিলাম বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় আমরা ছোটকাকুকে নিয়ে যাবো, তাকে কখনোই আমরা বিদেশে নেবো না।”
ফরিদুর রেজা সাগর জানান, এখন পর্যন্ত ছোটকাকুর ৪৮টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টি বইয়ের গল্পে বাংলাদেশের ৪৫টি জেলা উঠে এসেছে। বাকি তিনটি বইয়ে জেলার বাইরের গল্প ছিল।
বইয়ের পাতা থেকে ছোটকাকুকে সাধারণ মানুষের কাছে, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে আফজাল হোসেনের অবদানের কথাও স্মরণ করেন তিনি। এ সময় ছোটকাকুকে পর্দায় রূপ দেওয়ার জন্য আফজাল হোসেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান ছোটকাকুর স্রষ্টা।
গল্প, রহস্য, বিনোদনের পাশাপাশি সাহসিকতা, আত্মবিশ্বাস, পর্যবেক্ষণশক্তি ও অন্যকে সাহায্য করার ইতিবাচক বার্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে রয়েছে ‘ছোটকাকু’। এবার সেই চরিত্রকে ঘিরেই দুই দিনের উৎসব- যেখানে শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি অংশ নিতে পারবে পুরো পরিবার। সবাইকে এসময় ছোটকাকু উৎসবে অংশ নেয়ারও আহ্বান জানান অতিথিরা।






