পূবালী ব্যাংক বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও প্রধান বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। যার কার্যক্রম দেশের ব্যাকিং এবং অর্থনৈতিক খাতে বিশেষ অবদান রেখে আসছে। ১৯৫৯ সালে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক নামে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনতার পর জাতীয়করণ হয়ে পূবালী নামে পরিচিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে পুনরায় বেসরকারি খাতে ফিরে আসে।
পুবালী ব্যাংকের অগ্রযাত্রার ইতিহাস বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পদযাত্রার সাথে বিশেষ ভাবে মিশে আছে। বর্তমানে সময়ের সাথে সাথে পূবালী ব্যাংক ব্রাঞ্চ নেটওয়ার্ক, কোর ব্যাংকিং সেবা ও কর্পোরেট গ্রাহকপোর্টফোলিও বিস্তৃত করেছে, যা এটিকে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ব্যাংকটিতে রয়েছে কর্পোরেট ব্যাংকিং, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, খুচরা গ্রাহক সেবা এবং ইসলামী ব্যাংকিং সেবা। এছাড়া ব্যাংকটি ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন ব্যাংকিং ও কর্পোরেট ফাইন্যান্সিং-এও তারা সক্রিয় অবদান রেখে চলেছে।
বর্তমান ব্যবস্থাপনায় মোহাম্মদ আলী এমডি ও সিইও হিসেবে ব্যাংকটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার ব্যবস্থাপনায় পুঁজিবাজারে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কর্পোরেট সামাজিক দায়িত্ব কার্যক্রমে জোর দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির বার্ষিক রিপোর্ট ও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরে ডিপোজিট ও অ্যাসেট বৃদ্ধির পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যানিং ও শাখা সম্প্রসারণে লক্ষণীয় অগ্রগতি দেখা গেছে। সম্প্রতি পুবালী ব্যাংকের সিইও এবং এমডি মোহাম্মদ আলী আসেন সাংবাদিক রাজু আলীমের পরিচালনায় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় টক শো ‘টু দ্য পয়েন্ট’-এ। ব্যাংকটির বর্তমান কার্যক্রম এবং অবস্থান ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থতি সম্পর্কে কথা বলেন।
পূবালী ব্যাংকের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ব্যাংকিং গভর্নেন্সের বিষয়ে তিনি কথা বলেন। তিনি বলেন, পূবালী ব্যাংকের সাফল্যের মূলমন্ত্র হলো শক্তিশালী ও গুড গভর্নেন্স। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জানান, তাদের পরিচালনা পর্ষদ কোন অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। এমনকি ঋণ অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও পরিচালকদের কোন প্রভাব থাকে না, যা ম্যানেজমেন্টকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়।
পূবালী ব্যাংকের ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। অন্য কিছু ব্যাংকে যেখানে চেয়ারম্যানের নির্দেশে ঋণ দেওয়া হয়, সেখানে পূবালী ব্যাংকে প্রতিটি ঋণ প্রস্তাবের মূল্যায়ন শুরু হয় শাখা পর্যায় থেকে। শাখা ব্যবস্থাপক নিজে প্রস্তাবটি যাচাই করেন এবং স্থান পরিদর্শন করেন। কারণ তিনি জানেন যে, ঋণের মান খারাপ হলে তার ব্যক্তিগত কর্মজীবন এবং পদোন্নতি ঝুঁকির মুখে পড়বে। একটি প্রস্তাব শাখা থেকে অনুমোদনের পর তা আঞ্চলিক ব্যবস্থাপকের কাছে আসে। তিনি তার ক্রেডিট কমিটির দলকে নিয়ে এটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করেন, প্রয়োজনে সরেজমিনে পরিদর্শনও করেন। যদি ঋণটি বড় অঙ্কের হয়, তবে তা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কর্পোরেট উইং এবং ক্রেডিট কমিটির কাছে পাঠানো হয়। সেখানেও একাধিকবার যাচাই-বাছাই করা হয়। এই কঠোর এবং বহু-স্তরীয় যাচাই প্রক্রিয়ার কারণেই দুর্বল বা অস্তিত্বহীন কোন প্রতিষ্ঠান পূবালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে না।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান যে, এই নীতি ও সততার কারণে তারা অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও অপ্রয়োজনীয় ঋণ দিতে ‘না’ বলতে পেরেছেন। পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ দৃঢ়তার সাথে ‘গুড গভর্নেন্স’ নীতি অনুসরণ করে, এবং কোন ধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ রাখে না। এই ধারাবাহিকতা এবং নীতির প্রতি অবিচল থাকাই ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে।
লোন স্ক্যাম, অনিয়মে ব্যাংকারদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি বলেন, জেনারেলি আমরা সবাই জানি, মিডিয়াও জানে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জটিলতা অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্য হলেও এর গভীরে থাকে নানা স্তরে রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিচালনাগত চাপ। মেজর দেখবেন, যেসব ব্যাংক খারাপ হয়েছে, তাদের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানদের রাজনৈতিক ইনফ্লুয়েন্সও থাকে, আবার ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় শেয়ার হোল্ডিংয়ের মাধ্যমে তাদের প্রভাবও বিদ্যমান থাকে। এটি শুধু ম্যানেজমেন্টের ব্যর্থতার কারণে হয় না বরং একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বডি যখন কোনও ডিস্ট্রেসড সিচুয়েশনে সিএসআর বা কর্পোরেট সামাজিক দায়িত্বে হস্তক্ষেপ চায়, তখন ব্যাংকের ফার্ম বিলিভ থাকতে হবে যে সেই অনুদান বা অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হবে। উদাহরণস্বরূপ, যেখানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা অন্যান্য সরকারি সংস্থা কোনও প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকে, সেখানে টাকা দেওয়ার পরও তার বাস্তব প্রভাব সরাসরি ব্যাংকের মাথাপিছু দায়িত্বে আসে না।
যখন একটি লোন প্রপোজাল আসে, তখন তা শুধুমাত্র একটি স্তরের অনুমোদনের মাধ্যমে নয়, বরং সমস্ত স্তরে যাচাই-বাছাই হয়। ব্রাঞ্চে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইভ্যালুয়েশন, রিজনাল ম্যানেজারের পর্যবেক্ষণ এবং হেড অফিসের চূড়ান্ত অনুমোদন—এই প্রতিটি ধাপই নিশ্চিত করে যে প্রপোজালটি যথাযথভাবে যাচাই হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবও প্রায়শই কাজ করে। ম্যানেজমেন্ট কখনও রেজিস্ট করতে চাইলে ক্রেডিট কমিটি বা ব্রাঞ্চও অনুরূপভাবে সম্মত হয়। এমন পরিস্থিতিতে কর্মকর্তাদের উপর প্রেশার থাকে, এবং তারা নথিপত্র সঠিকভাবে যাচাই করলেও প্রভাবের ছায়া থেকে মুক্ত থাকে না।
আমরা লক্ষ্য করেছি, অনেক সময় কর্মকর্তারা স্বতঃসিদ্ধ সাহসিকতা প্রদর্শন করতে পারলেও সামগ্রিক প্রভাব বা ভেতরের লেয়ারগুলো তাদের কাজকে সীমিত করে। ইনফ্লুয়েন্সিং গ্রুপগুলো ম্যানেজমেন্টে একটি আলাদা লেয়ার তৈরি করে, যা কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। এমডি বা অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রায়শই অনুমোদন দেন, কিন্তু দেখা যায় যে এই লেয়ারের নিচের স্তরগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং প্রভাবশালী সিদ্ধান্তগুলিকে বাস্তবায়িত করে। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শুধু নীতি বা বিধি নয়, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্তর ভিত্তিক কাঠামোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে এই জটিলতা সমাধান করতে হলে কেবল প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়া নয়, বরং মানবিক এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার সমন্বয় প্রয়োজন।
ফুটবল ম্যাচ, কম্বল দেওয়া, শীতবস্ত্র বিতরণ এ ধরণের সিএসআর এর বিষয়ে তিনি মোহাম্মদ আলী বলেন, কস্ট বেনিফিট এনালাইসিস আপনাকে করতে হবে। আমরা সবসময় ট্রেড করি। যেমন ধরুন, সিলেটে যখন বন্যা হয়েছে, আমরা তো এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পাঁচ কোটি টাকা দিয়েছি। এখন আমাদের বিশ্বাস যে এটি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হবে। তারপর ধরুন, এর পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার আসবে, কেউ যদি এরকম একটি সংকটময় মানবিক পরিস্থিতিতে আমাদের কাছে সাহায্য চায়, তবে আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। ট্রাস্টের জায়গা এটা। আর ফুটবলের ক্ষেত্রে যেটা বললেন, সেখানে যে ইস্যুটা তোলা হয়েছে যে ব্যাংকাররা কাজ করতে করতে ক্লান্ত। টুর্নামেন্ট একটা বিনোদন। এটার ইতিবাচক দিকও আছে। আমরা তো দেখেছি খেলাটা ঠিকমতোই হয়েছে, ট্রফি হয়েছে, খরচ হয়েছে। এই টাকাটার হয়ত আরও ভালো ব্যবহার হতে পারত, কিন্তু এখন ধরেন একটা জায়গা থেকে সিএসআরের জন্য অনুরোধ এল, একটা ব্যাংক হয়তো প্রতিরোধ করল। সে চিন্তা করতে পারে যে সরকারের থেকে তার সমর্থন কমে যেতে পারে। যদি সরকার আমার বিরুদ্ধে যায়, সেখানে দেখা যাবে যে আপনি ৫০ লাখ বা ২০ লাখ টাকা দিয়েছেন, এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি প্রভাব পড়বে আপনার প্রতিষ্ঠানের ওপর। সেই ক্ষেত্রে বুদ্ধিমানের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
সম্প্রতি পাঁচটি ব্যাংককে একত্রিত করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনেকেই আছেন চাকরি হারানোর শঙ্কায়। একই সাথে একটি ব্যাংকে হামলার ঘটনাও দেখা যায়। এই বিষয়গুলো সম্পর্কে পূবালী ব্যাংকের এমডি বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতি নিয়েছে তাতে হয়তো সহজেই চাকরি যাবে না, কিন্তু একটা সময় তো দিতে হবে। কিন্তু তাই বলে তো একই পদে তিনজন-চারজন থাকতে পারবে না। এখন পাঁচটা ব্যাংকে এইচআর হেড পাঁচটা আছে। হয়তো প্রাথমিকভাবে বলবে, ঠিক আছে, আপনি এই পাঁচটা ব্যাংক দেখেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো একজন এইচআর হেডই হবে। অর্থাৎ, কিছু কিছু পদ আছে, যেখানে এটা হবে। আপনি একই জায়গায় ধরেন তিনটি শাখা আছে। সেগুলোকে এক করলে তো এতগুলো কর্মকর্তা একটা জায়গায় থাকতে পারবে না। সাধারণত এটা হবে, সময় বলবে যে আপনার অন্য চাকরির জন্য দেখা উচিত। কিছু কিছু ব্যাংক, যেমন ৯৭ শতাংশ খারাপ শুনেছি আমরা, সেগুলো তো আসলে পুনরুদ্ধার হবে না। যারা একটু ভালো আছে, তাদের সাথে যদি এক করে দেওয়া যায়, তাহলে গড়টা একটু কমে আসবে।
নতুন করে টাকা ইনজেক্ট করার বিষয়ে তিনি বলেনে, এখানে অনেকগুলো বিষয় কাজ করে, কারণ আপনি যত ফান্ড ইনজেক্ট করলেন, গ্রাহকরা সেই টাকা তুলে ভালো ব্যাংকে চলে আসল। তাহলে সবসময় কিন্তু আপনি একটি সমস্যার মধ্যে থাকবেন। আমরা লক্ষ্য করেছি যে যখনই কোন প্রণোদনা বা কোন টাকা এই দুর্বল ব্যাংকগুলো দিয়েছে, পরক্ষণেই আমরা দেখছি কিছু কিছু ব্যাংক, যেমন পূবালী, ব্র্যাক বা সিটি, তাদের আমানত বেড়ে যাচ্ছে। তার মানে আমরা তখন সাথে সাথে বুঝতে পারছি যে এই টাকাটা আমাদের কাছে চলে আসছে।
এই পাঁচ ব্যাংকের বর্তমান কর্মীদের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিটি বোর্ড এখন সচেতন। প্রতিটি ম্যানেজমেন্ট সচেতন যে কিভাবে খরচ কমানো যায়। অর্থাৎ, কিভাবে মানবসম্পদ দিয়ে ব্যবসা করা যায়, অনেক বড় ব্যবসা করা যায়। এবং যেহেতু সব ডিজিটাল হয়ে যাবে, তাই অন্য ব্যাংকের কাউকে এটি গ্রহণ করা খুব কঠিন হবে। যেমন দেখুন, শাখার লেনদেন তো দিন দিন কমে যাচ্ছে। বেশিরভাগ লেনদেন যদি সব বাইরে দিয়ে চলে যায়, তবে মানবসম্পদও কম লাগবে। এটার যদি আমি খুব ভালো একটা পরিসংখ্যান দিই আপনাদেরকে, ধরেন যখন ৫০ বছর পূর্তি আমাদের হয়, তখন আমাদের মোট সম্পদ ছিল সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। তখন আমাদের সাড়ে নয় হাজার লোক ছিল। আর এখন, এই ১৬ বছর পরে এখন আমাদের ব্যালেন্স সিট হচ্ছে এক ট্রিলিয়ন টাকার কোম্পানি। এখন আমার গত এক বছরে ব্যালেন্স সিটের আকার বেড়েছে ১৫,০০০ কোটি টাকা। তাহলে আমার ৫০ বছরে জমা হয়েছিল মাত্র তিন হাজার কোটি টাকা, আর এখন এক বছরে জমা হচ্ছে ১৫,০০০ কোটি টাকা। এটা শুধু ব্যাংকগুলো অপেক্ষা করছে যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ধরেন এটা ডিজিটালি কিভাবে গ্রহণ করে। যদি ডিজিটালভাবে গ্রহণ করা শুরু করে, টেন্ডারে অংশগ্রহণের সময় ডিজিটাল ব্যাংক গ্যারান্টি, ডিজিটাল পে অর্ডার এগুলো শুরু করে, আমাদের এখানকার কাজের পরিবেশ, মানবসম্পদ ভিন্ন হয়ে যাবে।
একজন ব্যাংকারের সিইও পর্যন্ত যাত্রার প্রসঙ্গে বলেন, এটার জন্য সুযোগ লাগে, সক্ষমতা লাগে এবং কাজ করার জন্য একটি ড্রাইভ লাগে। এবং একটি টার্নিং পয়েন্ট লাগে। কারণ আমি যখন সিটিও (চিফ টেকনোলজি অফিসার) হিসেবে সিটিও ফোরামের মধ্যে আমি সেক্রেটারি জেনারেল ছিলাম। সিটিও হিসেবে কাজ করছি এবং মার্কেটে একটি সুনামও তৈরি হয়েছিল। এখানে যখন আমি অনলাইন করলাম, আমরা চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে নিজস্ব সফটওয়্যার দিয়ে করলাম। এটাই যদি আসলে চালিয়ে যেতাম, তবে কিন্তু সিটিওই থাকতাম। ২০১১ সালে একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট এল, যখন আমার এমডি বললেন যে আপনি যেহেতু সফটওয়্যার তৈরি করেছেন, আপনি শাখার কার্যক্রম দেখা শুরু করেন। তখন আমি হয়তো বলতে পারতাম যে স্যার আমি সিটিও থাকতেই পছন্দ করি, আমি এখন শাখার অপারেশন দেখব না। যদি এটা বলতাম, তবে হয়তো আমি একই অবস্থানে থাকতাম। যখন আমাকে ট্রেজারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আমি ট্রেজারি করেছি। যখন সিআরও (চিফ রিস্ক অফিসার) করা হয়েছে সিটিও-এর পাশাপাশি, তখন করেছি। তারপর আমি ক্রেডিট কমিটির চেয়ারম্যান ছিলাম—অর্থাৎ, চিফ বিজনেস অফিসার যাকে বলে—তার সাথে এই কাজগুলো করতে হয়েছে। এই ক্ষেত্রে যখনই যে দায়িত্বগুলো এসেছে, ম্যানেজমেন্ট কনফিডেন্স ফিল করে, তখন আমি বলব যে সাফল্যের একটি বড় শর্ত হচ্ছে কখনো ‘না’ বলা উচিত নয়। তাই আমি সকল সিটিও-কে বলব, যেহেতু টেকনোলজিক্যালি আমরা জানি এবং বর্তমান সময়টাই প্রযুক্তির সময়, তাই ব্যাংকিং-এর বিজনেস অপারেশনের সাথে জড়িত হওয়াটাও জরুরি এবং এটা যখনই সুযোগ আসবে, তার আগ্রহটা সে যদি দেখাতে পারে, তাহলেই সে শেষ পর্যন্ত উপরের ধাপে যাবে।
পূবালী ব্যাংকের আজকে সাফল্য যাত্রা, শীর্ষ অবস্থানে আসা পেছনের গল্পটিও আলোচনায় তুলে ধরেন মোহাম্মদ আলী, বলেন যখন এই ব্যাংকটা হয় ১৯৫৯ সালে, তখন তো পাকিস্তানি ব্যাংক এবং ভারতীয় ব্যাংক এদেশে ছিল এবং ধারণাই ছিল না যে বাঙালিরা ব্যবসা করতে পারে এবং কোনো পাকিস্তানি ব্যাংক তখন বাঙালিদেরকে ঋণ দিত না। এই একটি মহৎ উদ্দেশ্যে এটির যাত্রা শুরু যে, না, আমরা আমাদের দেশীয় লোককে ঋণ দেব। ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু হয়। এরপর তো স্বাধীনতা এল, এটি শেষ পর্যন্ত পূবালী ব্যাংকে নতুন করে নামকরণ করা হলো, সরকারি হয়ে গেল। হঠাৎ করে সরকারি হয়ে গেলেই যে ঘটনাটা ঘটে, আপনারা তো দেখছেন যে ব্যাংকগুলো খারাপ হতে থাকে, তাই সেই সময় সরকারি অন্যান্য ব্যাংকগুলো ভালোই ছিল, আমি পরিসংখ্যানে যেটা দেখেছি। সবাই আমার ধারণা পূবালী ব্যাংকের প্রতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এই করে ১৯৮৪ সালে তো আমরা যখন বেসরকারি হয়, তখন এর সমস্যা ছিল, ব্যাংক তখন ৫৪ শতাংশ ক্লাসিফায়েড লোন ছিল।
এই বেসরকারি খাতে যখন আমরা সেই সময়ের যে জিরো টলারেন্সটা দেখেছি—অর্থাৎ, কোনো বিচ্যুতি ঘটলে—এবং এটা যে কর্মকর্তাটি সুবিধা পেয়েছে, তার জন্য নয়। মানে ব্যাংকের মুনাফা দেখাতে গিয়েও যদি কোনো ধরনের বিচ্যুতি করেছে, তারও চাকরি চলে গেছে। এরকম হয়েছে। এই জিরো টলারেন্সের মধ্যে ছিল। যখন কর্মকর্তারা এই জিরো টলারেন্স বুঝতে পেরেছে, তখনই এটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
আরও কিছু জিনিস আছে—সেটা হলো মাইন্ডসেট। আপনি তো একটি দীর্ঘ সময় সরকারি ব্যাংকে ছিলেন। তো আপনার গ্রাহককেন্দ্রিক মাইন্ডসেট তৈরি করা। এটার জন্য কিন্তু আমরা আতিথেয়তা পরিষেবা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক এনেছি, যাতে সে পরিষেবা-মুখী মানসিকতায় গড়ে ওঠে। এরপর একজন গ্রাহককে ধরে রাখতে গেলে আপনার প্রযুক্তিগত উন্নয়ন লাগে। এরা ম্যানুয়ালি কাজ করত। সেই কারণে টেকনোলজিকে এদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দিয়ে ধরানো। তারপর সক্ষমতা বাড়ানো, বিভিন্ন বিষয়ের। তারপর কমপ্লায়েন্সের বিষয়। এরপর এই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয় এবং গ্রাহককে যেন দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায়। আপনি একজন গ্রাহককে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে দেখবেন এবং তিন-চারটি সংস্থা দিয়ে দেখবেন। কিন্তু আপনাকে আবার সাত-আট দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিয়ে দিতে হবে। তাই এই যে দ্রুত সাড়া দেওয়া, সেটা এই জায়গাগুলোতে আপনাকে কাজ করতে হবে। এই ধারাবাহিকতায় আমরা কাজ করতে গিয়ে এই বিভিন্ন সময় আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনা কখনো করেছি পাঁচ বছরের, কখনো করেছি তিন বছরের, কখনো আমরা এক বছরের জন্য করেছি, কখনো পরিস্থিতির সাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য, তিন মাসের জন্য করেছি।
ব্যাংকার এবং বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের বিষয়ে মোহাম্মদ আলী বলেন, আমি আমার কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করছি যেন মানুষের মৌলিক যে পাঁচটি চাহিদা আছে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং চিকিৎসা। এই পাঁচটি খাত অনেক বড়। এই পাঁচটি খাতের মধ্যে আমি আমার ব্যাংককে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছি থাকা। আর একটি হলো যে আমার পরবর্তী প্রজন্মকে আমার বাসযোগ্য করে যেতে হবে। এই পাঁচটি খাতে আমি কাজ করব। এই পাঁচটি খাতের ক্ষেত্রে পরিবেশের কোনো যদি ঝুঁকি থাকে, কাজ করব না। যে জায়গাগুলোতে পরিবেশের ঝুঁকি কম থাকবে, সেখানে কাজ করব। আর গ্রাহকদের ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হচ্ছে যে আপনারা শুধু প্রলোভনে প্রলুব্ধ হবেন না। গ্রাহকের দায়িত্ব হলো যে আপনারা ভালো ব্যাংক দেখে, টেকসই ব্যাংক দেখে, আপনাদের তো টাকা জমা রাখতেই হবে, সেই জায়গায় রাখাটাই ভালো। এবং সেখানে আপনারা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন যে কারা আপনার টাকা সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে।









