‘মেঘমল্লার’-খ্যাত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা জাহিদুর রহিম অঞ্জন—যিনি এ বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভারতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার প্রস্থান–পরবর্তী প্রথম জন্মদিন ছিলো বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর)। দিনটি তাই হয়ে উঠল স্মৃতিতে, শোকে, প্রেমে ও শিল্পে বোনা এক নিবিড় আয়োজন!
অঞ্জনের জন্মদিন ঘিরে তার দাম্পত্যসঙ্গী, খ্যাতিমান সাহিত্যিক শাহীন আখতার কলাকেন্দ্রে আয়োজন করেন ছয় দিনব্যাপী চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও ভিডিও ইনস্টলেশন এর। যে আয়োজনের নাম দেন —‘শব্দে-নৈঃশব্দে অঞ্জন’। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় হয় সেই আয়োজনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন!
শিল্পী ও সহযাত্রীদের কণ্ঠে এদিন অঞ্জন যেন আবার ফিরে আসেন কলাকেন্দ্রের ছোট্ট উঠোনে! উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শাহীন আখতার ছাড়াও তাকে নিয়ে কথা বলেন লেখক, গবেষক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি মুফিদুল হক, চলচ্চিত্র নির্মাতা মানজেরী হাসিন মুরাদ এবং কলাকেন্দ্রের পরিচালক ও শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য, নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম, আকরাম খান, ফৌজিয়া খান, রাজিবুল হোসেনসহ অঞ্জনের বহু বন্ধু, সহকর্মী, ছাত্র ও ভক্ত।
অতিথিরা জানান, অঞ্জন নেই; কিন্তু শব্দে, নৈঃশব্দ্যে, রঙে-আলোয়, সিনেমার ফ্রেমে এবং মানুষের স্মৃতিতে— তিনি যেন এখনও উপস্থিত। মৃত্যুর পর তার প্রথম জন্মদিনে সেই উপস্থিতিরই উজ্জ্বল ও মমতাপূর্ণ পুনরাবর্তন হয়ে উঠল কলাকেন্দ্রের এই আয়োজন।
জন্মদিনের সন্ধ্যায় কলাকেন্দ্রে দর্শক সমাগম ছিলো বেশ। চলচ্চিত্র ও সাহিত্য-সম্পৃক্ত অনেকেই ঘুরে ঘুরে দেখেছেন অঞ্জনের ব্যক্তিগত নোটবই, তার স্কেচ, রাফ খাতা, দেয়ালে টাঙানো আলোকচিত্র— যা স্পর্শ করে তার সৃজনপ্রক্রিয়ার নীরবতম স্তর।
চারদিকে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন প্রজেকশনে বিকেল থেকে দেখানো হয় অঞ্জনের চলচ্চিত্র নির্মাণের বিটিএস ফুটেজ- তার কাজের একান্ত শ্রম, হাসি, ক্লান্তি, আলো-আঁধারির ভেতর দিয়ে তৈরি হওয়া সিনেমার জগৎ।
এক কক্ষে বসে দর্শক উপভোগ করেছেন তার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মেঘমল্লার’, অন্য কক্ষে চলেছে তার পুনাফিল্ম-ইনস্টিটিউট-জীবনের উল্লেখযোগ্য স্বল্পদৈর্ঘ্য কাজ ‘মর্নিং’।
শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান জানান, শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় অঞ্জনকে নিয়ে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে অংশ নেবেন ঢালি আল মামুন, এন রাশেদ চৌধুরী, তরুণ ঘোষ, সাজ্জাদুর রহিম পান্থ, আকরাম খান ও জুয়েইরিযাহ মউ। পাশাপাশি প্রদর্শনী ও ভিডিও ইনস্টলেশন চলবে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত, প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা।
অঞ্জনের জীবন ও কর্মের দিকে ফিরে দেখা
১৯৬৪ সালের ২৭ নভেম্বর খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন চলচ্চিত্র আন্দোলন কর্মী, নির্মাতা ও শিক্ষক জাহিদুর রহিম অঞ্জন। ভাষাসৈনিক, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী মিজানুর রহিম এবং রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মা–র সাংস্কৃতিক পরিবেশেই তার বেড়ে ওঠা। পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়াকালীন তিনি নির্মাণ করেন আন্তন চেখভের গল্প অবলম্বনে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মর্নিং’, যা পরবর্তী অনেক ব্যাচে ডিপ্লোমা চলচ্চিত্রের রেফারেন্স হিসেবে পড়ানো হয়।
২০১৪ সালে তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মেঘমল্লার’ জায়গা পায় টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ডিসকভারি বিভাগে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘রেইনকোট’ অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটির জন্য তিনি অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের একাধিক বিভাগে সম্মাননা।
তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘চাঁদের আমাবস্যা’, যা মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।









