রাজধানীর উত্তরা এলাকায় র্যাবের সদস্য পরিচয়ে ভয় দেখিয়ে ডিএল ফিলিং স্টেশনের ১ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ডাকাতির ঘটনায় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ও উত্তরা ক্রাইম বিভাগ।
গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে চারটি ৭.৬৫ মি.মি. পিস্তল, ছয়টি ম্যাগাজিন, ২১ রাউন্ড গুলি, লুণ্ঠিত ১২ লাখ টাকা, র্যাবের ভুয়া পরিচয়পত্র, ভেস্ট, ক্যাপ, ওয়াকিটকি, হাতকড়া, বিভিন্ন নম্বর প্লেট ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।
আজ শনিবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম।
ব্যাংকে নেওয়ার পথে পথরোধ
গত ৯ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ডিএল ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার আব্দুল করিমসহ চারজন বিক্রয়লব্ধ ১ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা দিতে যাচ্ছিলেন। ব্যাংক বন্ধ থাকায় কয়েক দিন ধরে ফিলিং স্টেশনে বিপুল পরিমাণ টাকা জমেছিল বলে জানায় ডিবি।
টাকা নিয়ে তারা বিমানবন্দর থানাধীন ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের ক্রাউন প্লাজার কাছে বিআরটি লেনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা একদল ডাকাত তাদের পথরোধ করে। অস্ত্র ও চাপাতি দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের পাশাপাশি তাদের ওপর হামলা করে টাকা লুট করে পালিয়ে যায়।
ডিবিপ্রধান জানান, কয়েক দিনের জমা টাকা সম্পর্কে তথ্য পেয়েই চক্রটি পরিকল্পিতভাবে সময় ও স্থান নির্বাচন করে।
র্যাবের পরিচয়ে ডাকাতি
ঘটনার অন্যতম চাঞ্চল্যকর দিক হলো, ডাকাতরা সাধারণ অপরাধীর পরিচয়ে নয়, র্যাবের সদস্য সেজে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে র্যাব লেখা ভেস্ট, ক্যাপ, মনোগ্রামযুক্ত ভুয়া পরিচয়পত্র, ওয়াকিটকি ও হাতকড়া উদ্ধারের পর বিষয়টি সামনে আসে।
গোয়েন্দা পুলিশের ধারণা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে সহজে মানুষকে থামিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখানোই ছিল চক্রটির অন্যতম কৌশল।
একে একে গ্রেপ্তার পাঁচজন
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে ইলিয়াস শিকদার ও জাফরকে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয়। ইলিয়াসের বন্দর এলাকার ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে তিনটি র্যাব ভেস্ট, দুটি ক্যাপ, চারটি ভুয়া পরিচয়পত্র, তিনটি ওয়াকিটকি, চার জোড়া হাতকড়া, দুটি নম্বর প্লেট, দুটি পিস্তল, তিনটি ম্যাগাজিন ও ছয় রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
পরে মাতুয়াইল থেকে রবিউল ইসলাম ওরফে রুবেল এবং যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড় থেকে মিন্টু রাড়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়। রুবেলের বাসা থেকে উদ্ধার হয় লুণ্ঠিত তিন লাখ টাকা। মিন্টুর বাসা থেকে চারটি র্যাব ভেস্ট, চারটি ভুয়া পরিচয়পত্র, ওয়াকিটকি, হাতকড়া, দুটি পিস্তল, তিনটি ম্যাগাজিন ও ১৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
সবশেষে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পোস্তগোলা থেকে সাগর বাড়ৈকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয় আরও নয় লাখ টাকা। সব মিলিয়ে উদ্ধার হয়েছে ১২ লাখ টাকা।
মাস্টারমাইন্ড এখনো পলাতক
ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ডাকাতির টাকা সদস্যদের মধ্যে আনুপাতিক হারে ভাগ করা হয়েছিল। সাগর তার ভাগে নয় লাখ টাকা পেয়েছিল। তবে খরচ করার আগেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি বলেন, “আমরা এই ঘটনার সম্পূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটন করেছি, ঘটনার সঙ্গে আরো প্রায় ৬-৭ জন আছে এবং আরো টাকা উদ্ধার করতে বাকি। সিসি ক্যামেরায় আমরা ৮ জনকে দেখেছি, তারা বলেছে আরও দুইজন ছিল।”
এ ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ড এখনো পলাতক। ভুক্তভোগীর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত পূর্বপরিচয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, পেশাদার অপরাধী হিসেবে সে পুরো ঘটনাটি সংগঠিত করেছে।
গ্রেপ্তার পাঁচজনই পেশাদার অপরাধী বলে জানিয়েছে ডিবি। সাগর বাড়ৈয়ের বিরুদ্ধে অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে। পলাতক মাস্টারমাইন্ডের বিরুদ্ধেও ২০টির বেশি মামলা থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
ডিবিপ্রধান বলেন, উদ্ধার হওয়া অস্ত্র পুলিশের চুরি বা লুট হওয়া নয়; এগুলো অবৈধভাবে সংগৃহীত। এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য—মাস্টারমাইন্ডকে গ্রেপ্তার, লুণ্ঠিত অবশিষ্ট টাকা উদ্ধার এবং পাম্পের টাকা পরিবহনের তথ্য চক্রটি কীভাবে পেয়েছিল তা বের করা।
এক প্রশ্নের জবাবে ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল বলেন, “মূল হোতা যে এটা অর্গানাইজ করেছে, সে এখনো পলাতক রয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে তিনজন একবারে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। আমরা এখনো প্রতিষ্ঠানের কারো জড়িত থাকার বিষয় পাইনি। যে মূলহোতা তাকে ধরা হলে আরো বিস্তারিত জানা যাবে।”
এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তার ও অবশিষ্ট টাকা উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।








