মৃত্যুবরণ করেছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ (বীর উত্তম)। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট ও বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্সের একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার। জিয়াউদ্দিন আহমেদের আরেকটি পরিচয়, তিনি ছিলেন দেশে আলোচিত সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির সামরিক উপদেষ্টা বা পার্টির সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ -ব্রিগেড ভিত্তিক ইতিহাস, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: দশম খণ্ড এবং বিশিষ্ট লেখক-ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমদের ‘লালসন্ত্রাস: সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি’ বইগুলোতে কর্নেল জিয়াউদ্দিনের মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী নানা কথা উঠে এসেছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্নেল জিয়াউদ্দিন
মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর পদমর্যাদার জিয়াউদ্দিন ছিলেন প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক। তিনি সেসময় কর্মরত ছিলেন পাকিস্তানের রাওয়ালপিণ্ডিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টারে। মুক্তিযুদ্ধের খবর শুনে তিনি যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২৬ জুলাই মেজর আবু তাহের (পরবর্তীতে কর্নেল), মেজর মঞ্জুর (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) ও ক্যাপ্টেন পাটোয়ারীর সঙ্গে গোপনে শিয়ালকোট হয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন মেজর জিয়াউদ্দিন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকা সামরিক কর্মকর্তারাসহ দলটি ২৭ জুলাই থেকে ৭ আগস্টের মধ্যে ভারতে পৌঁছান। এরপর তাকে জেড ফোর্সের অধীনে থাকা প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
১৯৭২ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কর্নেল তাহেরের ‘এবুটাবাদ থেকে দ্ববীগড়’ নামে একটি লেখায় পাকিস্তান থেকে ৩ জনের পালিয়ে আসার লোমহর্ষক বর্ণনা রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে মৌলভীবাজার জেলার ‘কামালপুর যুদ্ধ’ বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী কর্তৃক পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিপক্ষে সংঘটিত হওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। সেইযুদ্ধে কর্নেল জিয়াউদ্দিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মৌলভীবাজার, সিলেটের বিভিন্ন চাবাগানসহ ওইসব জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে জিয়াউদ্দিনের বীরত্বগাঁথা এখনও আলোচিত।
স্বাধীনতা-পরবর্তী জিয়াউদ্দিনের যাত্রা
স্বাধীনতার পর তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং ঢাকা সেনানিবাসের ৪৬তম ব্রিগেডের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিগেডের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কর্নেল জিয়াউদ্দিন বিমান বাহিনীর সৈন্য বিদ্রোহ দমন করেন এবং যুদ্ধোত্তর সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে অস্থায়ী ব্যাটল স্কুল পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফরে এলে কর্নেল জিয়াউদ্দিন তাকে গার্ড অব অনার দেন।
১৯৭২ সালের আগস্টে সাপ্তাহিক ‘হলিডে’ পত্রিকায় ‘হিডেন প্রাইজ’ নামে তাঁর একটা লেখা ছাপা হলে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন, যেখানে তিনি মুজিব সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণ ও ভারতের সাথে গোপন চুক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমালোচনা করেন। ওই প্রবন্ধের কারণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের অসন্তুষ্টি এবং পরে সেনাবাহিনীর চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন।

সেনাবাহিনী ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ইংরেজিতে একটা খোলা চিঠি দিয়েছিলেন বিদ্রোহ করার জন্য। এরপরে আত্মগোপনে চলে গিয়ে শুরু হয় তার বিদ্রোহী ও বিপ্লবী জীবন।
সর্বহারা পার্টিতে কর্নেল জিয়াউদ্দিন
১৯৭৪ সালে কর্নেল জিয়াউদ্দিন আত্মগোপনে গিয়ে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টিতে যোগ দেন এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বামপন্থী আন্দোলনে যুক্ত হন। ওই সময় সিরাজ সিকদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তাকে দেখা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে গড়ে তোলেন ঘাঁটি। সর্বহারা পার্টির নানা সশস্ত্র প্রশিক্ষণ তার হাত ধরেই হয়েছে বলে জানা যায়। সর্বহারা পার্টিতে তার নাম ছিল ‘সফিউল আলম’।
নানা ঘটনার পরে সিরাজ সিকদার নিহত হলে সর্বহারা পার্টি দুই ভাগ হয়। পার্টির এক অংশের নাম হয় পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি (সবিপ) এবং আরেক অংশের নাম হয় পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি (অপক)। সবিপ মানে ‘সর্বোচ্চ বিপ্লবী পরিষদ’ এবং অপক মানে ‘অস্থায়ী পরিচালনা কমিটি’। কর্নেল জিয়াউদ্দিন তখন অপক অংশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ‘মাওসেতুঙ চিন্তাধারার বিপক্ষে’ নামের আলোচিত পুস্তিকা রয়েছে তার।
সাধারণ ক্ষমার আওতায় আবারও স্বাভাবিক জীবনে
দীর্ঘ দিন আত্মগোপনে থেকে তিনি ১৯৮৯ সালে সর্বহারা পার্টি ত্যাগ করে একটি সাধারণ ক্ষমার আওতায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে ততকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কর্নেল জিয়াউদ্দিনকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন। সরাসরি রাজনীতিতে আবারও যোগদানের নানা সুযোগ থাকলেও তিনি তা করেননি। তবে নানাসময় রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে স্পষ্টভাষী অবস্থান নিয়েছিলেন।
১৯৯৬ সাল থেকে উনি অবসর জীবন যাপন করছিলেন, পাশাপাশি একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল পরিচালনা করছিলেন। কর্নেল জিয়াউদ্দিনের পরিবারের সূত্রে ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমদের একটি ফেসবুক পোস্টে জানা গেছে, কর্নেল জিয়াউদ্দিন দুটি জবানবন্দি লিখে গেছেন। একটিতে তাঁর জীবনের কথা, আর অন্যটি রয়েছে সর্বহারা পার্টিকে নিয়ে নানা বিষয়।
মৃত্যুর আগে শেষের অনেকগুলো বছর কর্নেল জিয়াউদ্দিন অসুস্থ ছিলেন, স্মৃতিশক্তি অনেকটাই হারিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সাহসী এই বীরসেনা। জীবনের নিয়মে চট্টগ্রামের এক হাসপাতালে ০৫ আগষ্ট ২০২৫ ইন্তেকাল করেন কক্সবাজার জেলার চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়নের পহরচান্দা গ্রামে ১৯৩৯ সালের ২২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করা জিয়াউদ্দিন। চকরিয়ার নিজ গ্রামেই শেষ নিদ্রায় শায়িত হয়েছেন আদর্শবাদী যোদ্ধা, রাষ্ট্রের চরিত্র ও অভ্যন্তরীণ ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নে আপসহীন বিপ্লবী বীরসেনা কর্নেল জিয়াউদ্দিন।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









