ঘটন-অঘটনে শেষ হচ্ছে ২০২১ সাল। পুরো বছরে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাবনিকাশ হয়তো অনেকে গোপনে মেলানোর চেষ্টা করছেন! আগামী বছরের ভাবনা নিয়েও হয়তো কেউ আবার খসড়া খাতা খুলে বসেছেন! এর মধ্যে পেছনে ফিরে কেউ কেউ হয়তো খুঁজে চলেছেন, কী ছিল সারা বছরের আলোচনায়।
বই প্রেমী যারা, তারা নিশ্চয় মনে করার চেষ্টা করছেন- ২০২১ সালে কোন বইগুলো আলোচিত হয়েছিল? যদিও অন্যান্য বছরের তুলনায় গত বছর করোনার কারণে ‘একুশে বইমেলা’য় কিছুটা কম প্রকাশিত হয়েছে— তবে আশার কথা হলো সারা বছর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনরার বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সব বই কি আর আলোচিত হয়?
এ বছরের আলোচিত কিছু বইয়ের কথা থাকলো এখানে:
বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি
আকবর আলি খান
অর্থনীতির কঠিন বক্তব্যকে সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে বিকল্প নেই আকবর আলি খানের। এরআগে পরার্থপরতার অর্থনীতি, আজব ও জবর আজব অর্থনীতি এবং দারিদ্র্যের অর্থনীতি : অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ- সম্পর্কে তিনটি জনপ্রিয় বই লিখেছেন এই অর্থনীতিবিদ। এ বছর লিখেছেন ‘বাংলাদেশের বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি’। যথারীতি এই বইটিও ছিলো বেশ আলোচনায়। বাজেটের অর্থনীতি ও রাজনীতি জটিল বিষয় হওয়া সত্ত্বেও গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য এ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সুষ্ঠু ধারণার প্রয়োজন। সচিব হিসেবে তিনি ৯টি বাজেট প্রণয়ন করেছেন। এ ছাড়া বাজেট সম্পর্কে তিনি গবেষণা করেছেন। গবেষণার তথ্যসমূহ সাধারণ পাঠকের জন্য বৈঠকি মেজাজে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। আর এ কারণেই বইটি সাধারণ পাঠকের কাছেও সুখপাঠ্য হয়েছে।
রক্তে আঁকা ভোর
আনিসুল হক
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। তরুণ পাঠকদের মাঝেও তিনি ব্যাপক সমাদৃত। তার লেখা ‘মা’ উপন্যাসটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পাঠকপ্রিয়তা পাওয়া বইগুলোর একটি। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও যুদ্ধ দারুণভাবে তিনি লেখায় ফুটিয়ে তুলেন। তার ছয়খণ্ডের উপন্যাসধারা ’যারা ভোর এনেছিল’- এর ষষ্ঠ ও শেষ পর্ব ‘রক্তে আঁকা ভোর’। এতে ধরা আছে বাঙালির জাগরণের ইতিহাস। চলতি বছরে প্রকাশিত ‘রক্তে আঁকা ভোর’ নিয়েও যথারীতি আলোচনা ছিলো তুঙ্গে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সে সময়ের মানুষদের নিয়ে তার লেখা উপন্যাসধারার আগের পাঁচটি পর্ব হলো ‘যারা ভোর এনেছিল’, ‘উষার দুয়ারে’, ‘আলো-আঁধারের যাত্রী’, ‘এই পথে আলো জ্বেলে’ এবং ‘এখানে থেমো না’। দীর্ঘ নয় বছরের পরিশ্রমের ফসল এটি।
লাল সন্ত্রাস
মহিউদ্দিন আহমদ
চলতি বছরে প্রকাশিত সবচেয়ে আলোচিত বইগুলোর একটি ‘লাল সন্ত্রাস: সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি’। মহিউদ্দিন আহমদের লেখা বইটি প্রকাশের পর পরই বিভিন্ন মহলে হয়েছে তুমুল আলোচিত, বইটি নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। সত্তরের দশকের শুরুতে কয়েকটি বছর বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে প্রচণ্ড এক ঝড়ো হাওয়া। এ সময় অল্প কয়েকজন ব্যক্তি নানাভাবে এ দেশের তরুণদের মনোজগতে সাড়া জাগাতে পেরেছিলেন। তাদের একজন সিরাজ সিকদার। তার নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি ছিল ওই সময়ের এক আলোচিত চরিত্র। তরুণদের একটা বড় অংশ এই দলের সশস্ত্র ধারার রাজনীতিতে শামিল হয়েছিলেন। তারা কারও চোখে বিপ্লবী, কারও চোখে সন্ত্রাসী। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদ করতে হলে অনিবার্যভাবেই উঠে আসবে সিরাজ সিকদার এবং সর্বহারা পার্টির রাজনীতির প্রসঙ্গ। এ নিয়ে আছে অনেক আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক ও বিভ্রান্তি। এ বইয়ে উঠে এসেছে অন্তরঙ্গ বিবরণ, যা পাঠককে নিয়ে যাবে পাঁচ দশক পেছনে।
আন্ডারগ্রাউন্ড
মাসরুর আরেফিন
এই সময়ের অন্যতম লেখক, অনুবাদ মাসরুর আরেফিন। তার লেখা প্রথম উপন্যাস ‘আগস্ট আবছায়া’ বাংলা সাহিত্যে গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম আলোচিত সৃষ্টি। চলতি বছরে একাধিক বই প্রকাশিত হলেও আলোচনায় ছিলো তার লেখা তৃতীয় উপন্যাস ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’। এ উপন্যাসে তিনি জানতে চাইছেন কারা চালায় এ পৃথিবী, কীভাবে তা চালায় তারা এবং কেন তা ওভাবেই চালায়, আর কেন ঠিক নির্দিষ্ট ওই একভাবে ‘সিস্টেম’-টা চলে বলেই টিকে থাকে রাষ্ট্রব্যবস্থা? কী সেই ‘সিস্টেম’? এখানে ছাব্বিশ বছর পরে এক ভাই তার হারিয়ে যাওয়া বড় ভাইকে খুঁজছে দূর এক দেশের লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া এই কালে। দুই বন্ধু হিসাব মেলাতে চাইছে শৈশবের বরিশালে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর এক অন্যায়ের সঙ্গে পরের এক নৃশংস সাম্প্রদায়িক খুনের।
সন্দেহ
মাহবুব মোর্শেদ
সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাসাহিত্যিক মাহবুব মোর্শেদ। তার লেখা প্রথম গল্পের বই ‘ব্যক্তিগত বসন্তদিন’ তুমুল পাঠকপ্রিয়তা পায়। এরপর ‘দেহ’ নামে আরেকটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত হয়েছে তার তৃতীয় গল্পের বই ‘সন্দেহ’। সমকালীন মানবিক সম্পর্কগুলোর নানামুখী জটিলতা, সংশয়, সন্দেহ ও দ্বিধা নিয়ে লেখা নয়টি বাছাই করা গল্প এ বইয়ে সংকলিত হয়েছে। যা পাঠককে মুগ্ধ করে।
হুমায়ূন আহমেদ: পাঠপদ্ধতি ও তাৎপর্য
মোহাম্মদ আজম
চলতি বছরের আলোচিত বইগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বই বলা যায় মোহাম্মদ আজমের লেখা ‘হুমায়ূন আহমেদ: পাঠপদ্ধতি ও তাৎপর্য’। সন্দেহাতীত ভাবেই হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। তার সাহিত্য পড়তে মানুষ ভালোবাসেন, ভীষণ আনন্দ পান। কিন্তু বড় মুখ করে তা অন্যের কাছে বলতে সংকোচ করেন। ‘মূলধারা’র সাহিত্যপাঠেও হুমায়ূনকে নিয়ে খুব বেশি উচ্চবাচ্য নেই। ফলে একটা সংকট আঁচ করা যায়। হুমায়ূনের অত্যন্ত স্বতন্ত্র সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য এর প্রধান কারণ। আর সাহিত্য পাঠজনিত জাতীয় দীনতাও তার জন্য কম দায়ী নয়। এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করে ‘হুমায়ূন আহমেদ: পাঠপদ্ধতি ও তাৎপর্য’ বইটি লিখেছেন আজম। বইয়ের মোট নয়টি অধ্যায়ে সে বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। সংযুক্তি হিসেবে রয়েছে প্রাসঙ্গিক আরও তিনটি প্রবন্ধ। আড়াই শ পৃষ্ঠার এই বইয়ে হুমায়ূনকে দেখার সম্ভাব্য সব ক’টি চোখই যাচাই-বাছাই করেছেন মোহাম্মদ আজম।
মানুষের মাংসের রেস্তোরাঁ
মোজাফ্ফর হোসেন
প্রতিশ্রুতিশীল লেখক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে নিজের পোক্ত করেছেন মোজাফ্ফর হোসেন। চলতি বছরে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার গল্পের বই ‘মানুষের মাংসের রেস্তোরাঁ’। একুশটি গল্প নিয়ে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থটির প্রায় সবকটি গল্পে সমাজের নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা এবং নৃশংসতার নানা চিত্র কখনো তীব্র শ্লেষে, কখনো রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। বইটিতে লেখক মোজাফ্ফর হোসেন সমাজের সেইসব অন্ধকারের ভেতর আলো ফেলেছেন যেটা প্রায় সকলেই অবগত অথচ কারো কিছুই বলার ক্ষমতা বা সাহস নেই। কেননা ডিজিটাল সুরক্ষা আইন! যে আইনের ফাঁদে ফেলে নিরীহকেও অপরাধী হিসেবে জেলে ঢোকানো যায়। বাক-স্বাধীনতা নিয়ে এই বইয়েও চমৎকার একটি গল্প আছে। সমকালীন নানা প্রসঙ্গ প্রতিটি গল্পকে আরো প্রাণবন্ত করেছে।








