এক বছরেরও বেশি সময় হয়ে গেল দেশের সাবেক তারকা গোলকিপার মহসীনের কোন খোঁজখবর নেই। গত বছরের আগস্টে সেই যে সবার অলক্ষ্যে রাজধানীর মৌচাকের বাসা থেকে বেরিয়ে গেছেন আর ফিরে আসেননি। তিনি বেঁচে আছেন, না মরে গেছেন তা কেউ জানেন না।
পরিবারের সদস্য, স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী, পুলিশ সবাই খুঁজছেন, কিন্তু কোথাও সন্ধান মিলছে না। আর এ কারণেই এক বিষাদময় যন্ত্রণায় ডুবে আছে মহসীনের পুরো পরিবার। বৃদ্ধা মা ফজিলাতুন্নেছা আর ভাইবোন চোখের জল ও দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে খেই হারিয়ে ফেলেছেন। মহসীনের বৃদ্ধ মা অশ্রুসিক্ত চোখে এখনও প্রিয় সন্তানের পথপানে চেয়ে আছেন। মহসীন ফিরে আসবে এই আশা ও বিশ্বাস তিনি এখনও বুকে ধরে আছেন। প্রতিদিন তিনি অসংখ্যবার ছেলের জন্য দোয়া-দরুদ পড়েন। অব্যক্ত বেদনা নিয়ে দরজার দিকে চেয়ে থাকেন ছেলে মহসীনের জন্য। মহসীনের ফিরে আসার সেরকম কোন সুখবরের আভাস কোথাও নেই। মহসীনের ছোট ভাই কোহিনুর ইসলাম পিন্টুর কাছ থেকে জানা গেছে রাজধানী ও আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা, হাসপাতাল, মর্গ, কারাগার অনেক জায়গাতে তারা খুঁজে চলেছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন হদিস পাননি।
সর্বশেষ গত বছরের ২৬ আগস্ট সকালে সবার অলক্ষ্যে মৌচাকের বাসা থেকে বের হন মহসীন। স্মৃতিভ্রষ্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে এর আগেও তিনি ২০২৪ সালে একবার বাসা থেকে বের হয়ে চলে গিয়েছিলেন। সেবার তাকে দ্রুতই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। সে সময়েই চিকিৎসকরা জানান মানসিক সমস্যার কারণে তার স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে।
স্মৃতিভ্রমের কারণে তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন। সে সময়ই সাবেক এই তারকা ফুটবলারের চিকিৎসার উদ্যোগ নেন সোনালী অতীত ক্লাবের সতীর্থ সাবেক ফুটবলাররা। সাবেক ফুটবলার আব্দুল গাফফার, ইমতিয়াজ সুলতান জনি, রুম্মান বিন ওয়ালি সাব্বিরসহ আরও অনেকেই মহসীনকে সুস্থ করতে উদ্যোগী হন। মহসীনের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে বিসিবিও আর্থিক সহায়তা দিতে এগিয়ে আসে। চিকিৎসার জন্য নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
মহসীনকে চিকিৎসার জন্য পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একসময় মহসীনকে সোনালী অতীত ক্লাবেও নিয়ে যাওয়া হয়। ক্লাব ও মাঠের পরিচিত মুখ দেখে সে সময় মহসীনের মাঝে কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। মহসীনের পরিবার ভেবেছিল ধীরে ধীরে হয়ত এভাবেই সে সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে আসবে। মহসীন আগের মতোই আবার পরিবার, আড্ডায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। কিন্তু বিধিবাম। তা আর হয়নি। সাবেক এই জনপ্রিয় ফুটবলার এখন নিখোঁজ, কোথাও তার সন্ধান নেই। পরিবারের পক্ষ থেকে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী এবং রমনা থানাতে ডায়েরি করা হয়েছে। পোস্টারিং, মাইকিং করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও সারাদেশে খোঁজাখুঁজি চলছে। মহসীনের দেখা আর মিলছে না।
আশির দশকে ফুটবলের সোনালী সময়ে তুখোড় গোলকিপার সান্টু, পিন্টু, মঈন, সুহাসদের পর সত্যিই বারপোস্টের নিচে অদ্ভুত এক মাদকতা তৈরি করেছিলেন মহসীন। চেহারা, স্টাইল আর বুদ্ধিদীপ্ত গোলকিপিংয়ের কারণে তারকা হয়ে উঠেছিলেন তিনি দ্রুতই। শারীরিক উচ্চতা কম হলেও ফ্লাই করে অপরূপ এক দক্ষতা ও সৌন্দর্যে তিনি বল গ্রিপে নিতে পারতেন। আবার ওয়ান টু ওয়ানে দ্রুত উপরে উঠে এসে বার আগলে নিজ দলকে গোল থেকে রক্ষা করার অসাধারণ কৌশল জানতেন তিনি। মহসীন দীর্ঘদিন খেলেছেন দেশের সেরা দুই দল মোহামেডান এবং আবাহনীতে। খেলেছেন সাড়াজাগানো মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদেও। এ কারণেই মহসীন এ দেশের ফুটবলমোদীদের হৃদয়ে লেখা এক নাম।
ফুটবল জীবনে তার উত্থানপর্ব ছিল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব থেকেই। যদিও প্রথম বিভাগে ক্লাব ফুটবলের শুরুটা ছিল তার আবাহনী ক্রীড়া চক্রের হয়েই। মহসীনকে শুরুতে প্রথম বিভাগ লিগে খেলার সুযোগ করে দেন সেই সময়ের অন্যতম তারকা ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন চুন্নু। সেই সময়ের স্মৃতি মনে করে তিনি জানান, ’৭৯ সালের কথা। নরসিংদীর জনতা জুট মিলের মাঠে ঢাকা থেকে একটা টুর্নামেন্টে খেলতে যান তারা।
প্রতিদ্বন্দ্বী দুদল জনতা জুট মিল এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে। ফুটবলার চুন্নু বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষে খেলার জন্য যান। অন্যদিকে জনতা জুট মিলে এনায়েত, মঞ্জু, নান্নুসহ সেই সময়ের তুখোড় সব তারকা ফুটবলার অংশ নেন। চুন্নুর সাথে জনতা জুট মিলের পক্ষে আরও খেলতে নামেন প্রথম বিভাগে খেলা নুরুল্লাহ, আলীম, পেয়ার আলী, আমিনুলসহ অন্যরা। চুন্নু জানান, খেলা দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়। সেই খেলায় ঢাকা থেকে যাওয়া তারকা সমৃদ্ধ জনতা জুট মিলকে বাংলাদেশ রেলওয়ে দল পরাজিত করে। এই জয়ে যিনি বড় ভূমিকা রাখেন তিনি ছোটখাটো গড়নের এক গোলরক্ষক মহসীন।
গোলবারে অতন্দ্রপ্রহরী হিসেবে প্রতিপক্ষের সব আক্রমণ রুখে দেন। গোলপোস্টে মহসীনের চমকপ্রদ কিপিং দেখে তাকে আবাহনীতে অনুশীলনের অফার দেন আশরাফ উদ্দীন চুন্নু। তার হাত ধরেই সে সময়কার আবাহনীর কোচ সাদেক তারকা সমৃদ্ধ আবাহনীতে মহসীনকে দলে অনুশীলনের সুযোগ দেন। গোলরক্ষক মঈন পুরো ফিট থাকার কারণে আবাহনী একাদশে মহসীনকে বসেই থাকতে হয়। কখনও একটু আধটু খেলার সুযোগ পেলেও তিনি পরিপূর্ণভাবে নিজেকে মেলে ধরতে নতুন কোন দলের অনুসন্ধান করতে থাকেন।
’৮২ সালে আবাহনীর কাউকে না জানিয়েই মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেন মহসীন এবং গোলরক্ষক মোশাররফ বাদলের জায়গা তিনি দখল করে নেন। মোহামেডানে নিয়মিত হন। তবে তার তারকাখ্যাতি আসে মূলত আবাহনী ও মোহামেডানের ম্যাচ ঘিরে। ১৯৮২ সালের ১৫মে ফেডারেশন কাপের ফাইনালে আবাহনী ও মোহামেডানের মধ্যকার ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হলে দুদলকে যুগ্ম-চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এদিন মোহামেডানের পক্ষে দারুণ ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রদর্শন করেন গোলরক্ষক মহসীন।
তবে তিনি বড় বেশি দ্যুতি ছড়ান দুমাস পরেই। আগস্টেই প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগের প্রথম পর্বের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হয় মোহামেডান এবং আবাহনী। মোহামেডানের গোলপোস্টে মহসীন অন্যদিকে আবাহনীর গোলপোস্টে মোতালেব অতন্দ্রপ্রহরী হিসেবে মাঠে নামেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত জয়ী হন মহসীন। এই ম্যাচে আবাহনী মোহামেডানের কাছে বাদল রায়ের করা গোলে পরাজিত হয়। ম্যাচের মূল উত্তেজনাটা ছড়িয়ে দেন গোলরক্ষক মহসীন। প্রথমার্ধে বাদল রায়ের করা গোলে এগিয়ে যায় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। দ্বিতীয়ার্ধে মোহামেডানের অলক আবাহনীর চুন্নুকে ফাউল করলে আবাহনী পেনাল্টি লাভ করলে গোল পরিশোধের অনবদ্য এক সুযোগ তৈরি হয়। দেশের সেরা তারকা ফুটবলার সালাহউদ্দিনের নেওয়া পেনাল্টি কিক বাঁ-দিকে ঝাঁপিয়ে রক্ষা করেন গোলরক্ষক মহসীন। সেদিনই মহসীনের নাম ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
একসময় প্রিয় মোহামেডান ছেড়ে আবাহনীতে ফের যোগ দেন মহসীন। দীর্ঘদিন আবাহনীতেই কাটান তিনি। মোহামেডানের বিপক্ষে বেশিরভাগ ম্যাচেই আবাহনীকে জয়ী করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মোহামেডান-আবাহনীর মোহ ছেড়ে সর্বশেষ জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্ট ভেঙে তিনি যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র দলে।
ক্লাবের বাইরে ১৯৮২ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত টানা জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন মহসীন। ক্লাব এবং জাতীয় দল সবখানেই তিনি বরাবরই আস্থার স্বাক্ষর রেখেছেন। এ কারণেই আশির দশকে তারকা গোলকিপার হিসেবে খ্যাতি, যশ তিনিই পেয়েছিলেন। মাঠে সবসময়ই দেখা যেতে ডিফেন্স পরাস্ত হলেও মহসীনের উপর পূর্ণ আস্থা রাখতেন টিমের সতীর্থ এবং সমর্থকেরা। ক্লাব ও দেশের পক্ষে এই বিশ্বাসের প্রতিদান তিনি মাঠে দিয়েছেন বহু বহুবার।
মহসীনদের পৈত্রিক বাড়ি মানিকগঞ্জে। বাবা মোসলেহউদ্দিন বাংলাদেশ রেলওয়েতে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে শাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতেই তার বেড়ে ওঠা। ছয় ভাইবোনের সংসারে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার বড় বোনের নাম সাঈদা। অন্য ভাইবোনেরা হলেন নার্গিস, পিন্টু, হাসনা ও সুজানা। ফুটবল জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর মহসীন ১৯৯৮ সালে কানাডাতে চলে যান। ওখানে গিয়ে বিবাহবন্ধনেও আবদ্ধ হন। সংসার সুখের না হওয়ায় থিতু হতে পারেননি। অগত্যা ২০১৪ সালে শেষবারের মতো দেশে ফিরে এসে মায়ের কাছেই ঠাঁই নেন।
মহসীন কোথায় কেমন আছেন কেউ জানেন না। পুলিশের কাছেও কোন তথ্য নেই। মহসীন ফিরে এলে এটি হবে পরিবারের জন্য সবচেয়ে আনন্দময় ঘটনা। তবে হারিয়ে যাওয়া সাবেক এই তারকা ফুটবলারের প্রতি সামান্যতম দায়িত্ব প্রদর্শন করেনি বাফুফে। বাংলাদেশের ফুটবলকে আলোকিত করতে মহসীনের ভূমিকা থাকলেও বাফুফের কর্মকর্তারা তা ভুলে গেছেন। আর তাইতো অফিসিয়ালি বাফুফে একটুও যোগাযোগ করেনি এই পরিবারের সাথে। এমনকি নতুন সভাপতিও একবারের জন্য ফোন বা যোগাযোগ করেননি মহসীনের মায়ের সাথে। অথচ এটুকু প্রাপ্য ছিল মহসীনের মায়ের। সাবেক এই তারকা ফুটবলার ফিরে আসুক- এই কামনা করি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









