সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ‘কেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং প্রধান উপদেষ্টার সংস্কারের সমর্থন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?’ তার ব্যাখ্যা দিয়েছে সরকার।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) কেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার-সমর্থন গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তার পক্ষে ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে।
ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সংক্রান্ত আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে কিছু মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের দাবি, একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের কাছ থেকে এমন সক্রিয় সমর্থন প্রত্যাশিত নয়।
এই উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখলেও, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকৃত ম্যান্ডেট এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে বিশ্লেষণ করলে এই সমালোচনার ভিত্তি দুর্বল বলেই প্রতীয়মান হয়।
বাংলাদেশ আজ একটি গভীর রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সময়ে নীরবতা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়; বরং তা নেতৃত্বের ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হবে।
সংস্কারই অন্তর্বর্তী সরকারের মূল ম্যান্ডেট
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেবল দৈনন্দিন রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম চালানো বা একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য গঠিত হয়নি। এটি জন্ম নিয়েছে দীর্ঘদিনের শাসন সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটে। এই সরকারের ঘোষিত ও বাস্তব ম্যান্ডেট হলো—রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা, গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন করা এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে একটি গ্রহণযোগ্য সংস্কার কাঠামো দাঁড় করানো।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত প্রায় দেড় বছর ধরে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণ প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক পরামর্শ প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভোটারদের সামনে যে সংস্কার প্যাকেজটি উপস্থাপিত হয়েছে, তা এই দীর্ঘ আলোচনারই ফল। এই প্রেক্ষাপটে সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া থেকে বিরত থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
ওকালতি ও গণতান্ত্রিক পছন্দ পরস্পরবিরোধী নয়
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারপ্রধানদের—তারা অন্তর্বর্তী হোন বা নির্বাচিত—গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রশ্নে নির্লিপ্ত থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। বরং জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়াই গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ।
গণভোট কোনো টেকনোক্র্যাটিক প্রক্রিয়া নয়; এটি সরাসরি জনমত যাচাইয়ের একটি মাধ্যম। ভোটাররা যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও অবস্থান পান, তখন তাদের সিদ্ধান্ত আরও সচেতন ও শক্তিশালী হয়।
গণতান্ত্রিক বৈধতার মূল প্রশ্ন হলো—ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারছেন কি না, বিরোধী কণ্ঠস্বর প্রচারের সুযোগ পাচ্ছে কিনা এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য কিনা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই শর্তগুলো অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
এই মুহূর্তে নেতৃত্বের গুরুত্ব
বাংলাদেশের সংস্কার গণভোট কোনো বিমূর্ত নীতিগত বিতর্ক নয়। এটি দীর্ঘদিনের বাস্তব শাসন ব্যর্থতার জবাব—দুর্বল প্রতিষ্ঠান, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনব্যবস্থা এবং রাজনীতিকরণে আক্রান্ত তদারকি সংস্থাগুলোর পরিণতি। এই প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার সংস্কার-সমর্থন ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতারই প্রকাশ।
যিনি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা চিহ্নিত করতে এবং সমাধানে ঐকমত্য গড়তে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর পক্ষে এই পর্যায়ে নীরবতা গ্রহণ করা বরং অসংগত ও অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করবে। সংস্কার থেকেই যার বৈধতা উৎসারিত, তার পক্ষে সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া পক্ষপাত নয়—এটি দায়িত্ব।
আন্তর্জাতিক নজির কী বলে
বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। আধুনিক ইতিহাসে বহু দেশে সরকারপ্রধানরা বড় ধরনের গণভোটে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন—যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট গণভোট, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা ভোট, ফ্রান্সে শার্ল দ্য গলের সাংবিধানিক পরিবর্তন কিংবা তুরস্ক ও কিরগিজস্তানের সাংবিধানিক সংস্কার—সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্বের প্রকাশ্য সমর্থনকে গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে দেখা হয়নি। বরং এটিকে রাজনৈতিক জবাবদিহিতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
গণভোটের বৈধতা নেতাদের নীরবতার ওপর নয়, জনগণের স্বাধীন পছন্দের ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো—এই সংস্কারের ফলাফলে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো নির্বাচনী বা রাজনৈতিক লাভ নেই। অধ্যাপক ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টাদের ভূমিকা সময়সীমাবদ্ধ। সংস্কার অনুমোদিত হোক বা প্রত্যাখ্যাত—চূড়ান্ত দায়িত্ব যাবে নির্বাচিত সরকারের হাতে। এতে অযৌক্তিক প্রভাবের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই সীমিত থাকে।
সরকারি প্রচারণা মানেই জবরদস্তি নয়
জেলা পর্যায়ে সংস্কার বিষয়ে ব্যাখ্যামূলক প্রচারণা নিয়েও উদ্বেগ উঠেছে। তবে এই উদ্যোগগুলোর মূল লক্ষ্য ভুল তথ্য দূর করা এবং নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ক্রান্তিকালীন পরিস্থিতিতে এমন তথ্যভিত্তিক সম্পৃক্ততা অস্বাভাবিক নয় এবং তা নিজেই জোরজবরদস্তি হয়ে ওঠে না। বরং রাষ্ট্রীয় কণ্ঠস্বরের উপস্থিতি নিশ্চিত করে যে জনগণ অজানা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য না হয়।
উপসংহার
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়, বরং দ্বিধা ও অস্পষ্টতা। অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কারের জন্য গঠিত, তা থেকে সরে এলে জনআস্থা ক্ষুণ্ন হবে এবং পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হবে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ‘হ্যাঁ’ ভোটের সমর্থন অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট, বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চা এবং ভোটারদের প্রতি স্বচ্ছতার নীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত জনগণের হাতেই। সেটিই গণতন্ত্রের মূল নিশ্চয়তা। নেতৃত্ব সেই সিদ্ধান্তকে প্রতিস্থাপন করে না—তা স্পষ্ট করে তোলে।









